গত ৩ বছরে কিছুই উন্নতি হয়নি ॥ লোডশেডিং বাড়ছেই

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ ক্ষমতায় আসার সময় আওয়ামীলীগ বলেছিল, আমরা ক্ষমতায় গেলে বিদ্যুতের উন্নতি ঘটাবো। বিদ্যুতের কোন সমস্যা থাকবে না। শুধু এই কথা নয়, ক্ষমতায় এসেও বলেছিল আমাদের অন্তত ২/৩ বছর সময় দেওয়া লাগবে। আমরা বিদ্যুতের কোন লোড শেডিং রাখবো না। কিন্তু বাস্তবে কোন উন্নতি ঘটেনি। বরং আরও অবনতি ঘটেছে। যদিও গত মাসে একটি নতুন পাওয়ার স্টেশন উৎপাদন শুরু করেছে। তারপরও গত তিন বছরে পুরাতন যে সব পাওয়ার উৎপাদন কেন্দ্র ছিল তার অনেকগুলোই অকেজো হয়ে গেছে। যে কারণে খোদ রাজধানীতেই প্রতিদিন দিনে অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা এবং রাতে কয়েক ঘণ্টা করে লোডশেডিং-এর দুর্বিসহ জীবন যাপন করতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে। এর থেকে কারও মুক্তি নাই। একমাত্র ভিভিআইপি এলাকা বা মিন্টো রোডের মন্ত্রী পাড়া ছাড়া রাজধানী তথা দেশবাসীকে বিদ্যুতের এহেন কারসাজির শিকার হতে হচ্ছে।

২৪ ঘণ্টায় ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত লোডশেডিং
গত দু’মাসে শীত থাকায় লোডশেডিং ছিল না বললেই চলে। আবার আসার সঙ্গে সঙ্গে শহরে-গ্রামে সমানতালে লোডশেডিং শুরু হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিবারই ঘণ্টা খানেকের জন্য লোডশেডিং হচ্ছে। কোন কোন স্থানে আবার একবার বিদ্যুৎ গেলে দু’তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশোডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা ‘উৎপাদন বেড়েছে’, ‘পরিস্থিতির আগের তুলনায় উন্নতি হয়েছে’, ‘আগামী বছর লোডশেডিং থাকবে না’- এমন প্রচারণা চালালেও এগুলো এখন মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি ৮ মার্চ জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় সংসদ সদস্যরা বিদ্যুতের লোডশেডিং নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, বিদ্যুতে এ পর্যন্ত ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়ার পরও কেন পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি তা জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে।

দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের কোন হিসাব নেই
সংশ্লিষ্টরা বলেন, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের পর মহাজোট সরকার যখন দায়িত্ব নেয় তখন বিদ্যুতের উৎপাদন ছিল সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট। ওই সময় জ্বালানি সংকটে ৫শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হতো। মহাজোট সরকার গত তিন বছরে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করেছে বলে দাবি করছে। এ হিসাবে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা ৭ হাজার মেগাওয়াট। জ্বালানি সংকটে এক হাজার মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। কিন্তু বর্তমানে গড়ে সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। বাকি দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের কোন হিসাব নেই।

রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এখন গলার কাঁটা
জনৈক বিশ্লেষকের বরাত দিয়ে দৈনিক যুগান্তর বলেছে, যে পরিমাণ বিদ্যুতের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না, সে পরিমাণ বিদ্যুৎ নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে। এ দুর্নীতি ঢাকতে সরকার বিশেষ বিধান বা আইনও করেছে। বিদ্যুৎ খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার ক্ষমতায় আসার পরই রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশেষ আইনের মাধ্যমে টেন্ডার ছাড়া যেসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে, সেগুলোই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেন্টালে বেশি মনোযোগী হলেও বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে রহস্যজনকভাবে নীরবতা পালন করেছে সরকার। তারা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হওয়ায় এগুলোর ওপর নজরদারির কোন ব্যবস্থা না থাকায় নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। আর এ কারণে কেন্দ্রগুলো স্থাপনের পর থেকেই ক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারেনি। বরং কোন কোন কেন্দ্র অতিরিক্ত জ্বালানি তেল ব্যবহার করে খুবই অল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের নামে প্রকৃতপক্ষে শত শত কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। আর এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে লুটপাটের অংশীদার হয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা। তারা বলেন, সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতি জনগণকে ঢাকঢোল পিটিয়ে সরবরাহ করেছে। এ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হওয়ার কথা। কিন্তু এর ফলও হয়েছে উল্টো। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান এএসএম আলমগীর কবির লোডশেডিং এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি হবে না জানিয়ে এ প্রসঙ্গে বলেন, ১৫ মাসে নতুন সংযোগ দেয়া হয়েছে ১৫ লাখ। এছাড়া এখন সেচ মৌসুম চলছে। সেচে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে ১৪শ’ থেকে ১৫শ’ মেগাওয়াট। ফলে এ মুহূর্তে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে লোডশেডিং হচ্ছে। রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টগুলো পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে তৈরি- এমন বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ৪টি কেন্দ্র পুরনো মেশিনে তৈরি। এদের আমরা জরিমানাও করেছি। এছাড়া গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণেও এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। তিনি গ্রাহকদের সাশ্রয়ী মনোভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের আহ্বান জানান।

অনভিজ্ঞদের দেওয়ায় এই পরিস্থিতি
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ম. তামিম এ প্রসঙ্গে বলেন, একটা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৭ থেকে ৮টি কোম্পানি থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে এটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। অনভিজ্ঞরা বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে গেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কাজ দেয়া হয়েছে। ফলে এখন আমরা সমস্যা ফেস করছি। তিনি বলেন, সরকার বলছে ৩ হাজার মেগাওয়াট যোগ করেছে। এর মধ্যে পুরনো মেশিন হওয়ার কারণে এক হাজার মেগাওয়াট কম উৎপাদন হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত ছিল শুরুতেই বেইজ রোড পাওয়ার প্লান্টের দিকে যাওয়া।

যে কারণে লোডশেডিং বার বার
পিডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ৯ মার্চ সর্বোচ্চ উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল ৫ হাজার ৫শ’ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৪ হাজার ২৪৬ মেগাওয়াট। আর লোডশেডিং হয়েছে ২৩০ মেগাওয়াট। ওই কর্মকর্তারা বলেন, পিডিবির এ হিসাব ঠিক নেই। বিশেষ করে চাহিদা হিসাব কখনোই ঠিক লেখা হয় না। ফলে এ হিসেবে বিদ্যুতের প্রকৃত ঘাটতি বোঝা সম্ভব নয়। পিডিবির নিয়ন্ত্রণাধীন বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, পিডিবির ওই হিসাব, বিশেষ করে চাহিদার হিসাব কখনোই সঠিক ছিল না, এখনও নেই। দ্বিতীয়ত, ওই হিসাব সান্ধ্যকালীন সর্বোচ্চ চাহিদা ও সরবরাহের। বর্তমানে দিনের বেলা তেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে রাখা হচ্ছে। ফলে দিনের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় উৎপাদন সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমিত থাকে। কিন্তু গরম পড়তে শুরু করায় এ সময় চাহিদা হয় প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট। এ কারণে দিনের বেলায় সারাদেশে ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তেলচালিত কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখার কারণ হিসেবে সূত্রগুলো জানায়, একদিকে উচ্চমূল্যের তেলের ব্যবহার সীমিত রেখে বিদ্যুৎ খাতের লোকসান কমিয়ে রাখা এবং সব কেন্দ্রে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট এর কারণ। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না থাকায় সান্ধ্যকালীন সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। জানা গেছে, সারাদিনের লোডশেডিংয়ের পর সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুরু হয় সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ের নির্ধারিত লোডশেডিং। এসময় সবচেয়ে বেশি লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছে গ্রামাঞ্চল। এরপর রাত ১১টা থেকে সেচের জন্য গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ায় গভীর রাতে শহরে লোডশেডিং শুরু হয়। এখন পর্যন্ত গভীর রাতের এ লোডশেডিং দু’বারে সীমিত আছে। তবে সেচের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ যত বাড়বে, শহরাঞ্চলে গভীর রাতের লোডশেডিংও ততই বাড়বে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে
বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলের তিন বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। এর সত্যতা প্রধানমন্ত্রী নিজেও অনুধাবন করতে পেরেছেন। কারণ গত বছর তিনি একদিন বলেছিলেন, “গভীর রাতে যখন মিল, কল-কারখানা, অফিস-আদালত বন্ধ থাকে, তখনও লোডশেডিং হয়। তাহলে বুঝুন এখানে কোন ভুত চেপে বসেছে”। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। এছাড়া এ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীকে এ খাতের উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়। এ নিয়োগের পর উপদেষ্টাকে কেন্দ্র করেই মন্ত্রণালয়ের সব কার্যক্রম চলতে থাকে। এমনকি বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীও উপদেষ্টার সিদ্ধান্তের বাইরে যান না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি খাতের উন্নতি হলেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। এ বিবেচনায় উপদেষ্টা পুরো জ্বালানি খাতকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। জ্বালানি খাতে তার নির্দেশনা ছাড়া কোন কাজ হয় না। এমনকি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রশাসনে উপদেষ্টার পছন্দের লোকজনকে বসানো হয়েছে। এসব কর্মকর্তা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কোন সিদ্ধান্ত মানেন না। জ্বালানি বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের লুটপাটের সুযোগ করে দিচ্ছেন উপদেষ্টা নিজেই। এখনও গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকলেও বিশেষ কমিটির মাধ্যমে তিনি গোপনে গ্যাস সংযোগ দিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে, এ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে জাতীয় তেল গ্যাস রক্ষা কমিটি শুরু থেকেই দুর্নীতির অভিযোগ করলেও সরকারের এ বিষয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। কর্মকর্তারা জানান, তিনি এতটাই ভয়ংকর যে, কোন কর্মকর্তা তার কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বললেই ওএসডি হতে হয়। জ্বালানি উপদেষ্টার বিরুদ্ধে গভীর সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে কনোকো ফিলিপসকে কাজ দেয়ার বিপরীতে শত কোটি টাকা ঘুষ নেয়ারও অভিযোগ ওঠে।

Advertisements
Loading...