প্রায় সাড়ে ৪ লাখ শরণার্থীর অর্ধেকই শিশু: এদের ভবিষ্যৎ কী?

আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর দেশটির সেনাবাহিনী যে নির্যাতন-নীপিড়ন চালিয়ে যাচ্ছে তাকে স্মরণকালের এক ভয়াবহতম হিসেবেই দেখা হচ্ছে

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ এ পর্যন্ত যে সংখ্যা রোহিঙ্গা বাংলাদেশের প্রবেশ করেছে অর্থাৎ প্রাথমিক হিসেবে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আর এসব শরণার্থীর অর্ধেকই হলো শিশু। তাদের মধ্যে আবার অনেকের বাবা-মা নেই বা হারিয়ে গেছে। এসব শিশুদের ভবিষ্যত কী হবে?

বার্মার আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর দেশটির সেনাবাহিনী যে নির্যাতন-নীপিড়ন চালিয়ে যাচ্ছে তাকে স্মরণকালের এক ভয়াবহতম হিসেবেই দেখা হচ্ছে। মানুষের উপর এমন নির্যাতন সচরাচর চোখে পড়ে না। কারণ ১৯৭১ এ পাক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেও বাঙালিরা সেদিন তার দাঁতভাঙ্গা জবাবও দিয়েছিল। বাঙালিরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। তাদের উপর হামলা করেছে তাদেরই সেনাবাহিনী ও নিজ দেশের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। যে কারণে তাদের পক্ষে কোনো রকম প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কিন্তু রোহিঙ্গাদের উপর হামলায় সবচেয়ে মানবাধিকার লংঘনের বিষয়টি হলো শিশুদের উপরও নির্যাতন চালানো হয়েছে। কোনো রকম বাছ বিচার করা হয়নি।

গত ২৫ আগস্ট হতে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এক হিসাবে দেখা গেছে ৪ লাখ ২৯ হাজার শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। এদের অর্ধেকই হলো শিশু। এইসব শিশুদের মধ্যে আবার ১১০০ শিশুর বাবা-মা নেই। কিংবা তারা বাবা-মাকে হারিয়ে ফেলেছে। আশ্রয় গ্রহণ করা রোহিঙ্গা শিশুদের প্রায় ৫৫ হাজার শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। ৬ হাজার ৭৭৫ শিশু মারাত্মক অপুষ্টির শিকার। এইসব শিশুদের দেখভালের ভার পড়েছে বাংলাদেশের উপর। বাংলাদেশ যে মানবিকতা দেখিয়েছে সেটি বিরল। বিশ্বে অভিভাসন বিষয়ের পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অনেক ধনী রাষ্ট্রও অনুপ্রবেশ করা অধিবাসীদের বিতাড়িত করেছে। তারা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ একটি গরীব রাষ্ট্র হওয়া সত্বেও মানবিকতা দেখিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো এতো শিশুদের লালন-পালন ও তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব নেবে কে? বাংলাদেশের উচিত বিশ্বের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতা নেওয়া। কারণ অপুষ্টির শিকার এইসব শিশুদের সঠিকভাবে চিকিৎসা সেবা দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি বিষয়।

শুধু মুসলমান নয়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য হতে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা সে দেশের কিছু হিন্দু পরিবারও আশ্রয় নিয়েছে উখিয়ার কুতুপালংয়ে। সেখানে মুরগির খামারের জন্য তৈরি একটি ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে এসব পরিবারের বিশেষ করে শিশুদের।

এমন কিছু শিশু রয়েছে যারা নিজের নামও ভালো করে বলতে পারে না। তাদের বাবা-মা কোথায় তাও তারা জানে না।
এমন পরিস্থিতি রয়েছে অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই। বাবা-মা হয়তো দেশটির সেনাবাহিনীর দেওয়া আগুনে পুড়ে গেছে। নতুবা কোথাও হারিয়ে গেছে। এক কথায় প্রায় অনিশ্চিত এদের ভবিষ্যত।

সংবাদ মাধ্যমে ফরিদ আলম নামে এক শিশুর দুর্গতি সম্পর্কে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সে নিজের নামটুকু শুধু জানে। সে তার বয়সও বলতে পারে না। দু-তিনটে দাঁত পড়ে সবেমাত্র নতুন করে গজাতে শুরু করেছে। তার হাঁটু পর্যন্ত কাদা। উষ্কখুষ্ক তার চুল। গায়ে বেখাপ্পা বড় একটি টি-শার্ট। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুর তোলাতুলি হতে পাহাড় ডিঙিয়ে জনস্রোতে মিশে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে সে। ওর বাবা-মা, একমাত্র বড় ভাই কেওই বেঁচে নেই।

ফরিদ আলম এক প্রশ্নের জবাবে বলে, কোরবানি ঈদের আগের কোনো একদিনের কথা। ‘মেলেটারি’রা তাদের গ্রামে ঢুকে ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিতে শুরু করে। তখন এলোপাতাড়ি গুলিও ছুড়তে থাকে। ফরিদ প্রাণভয়ে ছুটতে শুরু করে। ছুটতে ছুটতে একসময় তার সঙ্গে দেখা হয় গ্রামের অন্যান্য পরিচিত লোকজনের। তাদের কাছেই খবর পায় ওর বাবা মো. তৈয়ব, মা আয়েশা খাতুন এবং বড় ভাই কেওই বেঁচে নেই। জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। তখন থেকেই শুরু হয় ফরিদের অনিশ্চিত এক যাত্রা। একটা পর একটা পাহাড় ডিঙিয়ে, কখনও গাছ, লতা-পাতা খেয়ে, কখনও শিমের বিচি খেয়ে সে ১০ দিন কাটিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে এসে হাজির হয়। গ্রামের লোকজনের সঙ্গে এসে ওঠে হাকিমপাড়ায়। এখন সে কী করবে, কোথায় যাবে এমন এক প্রশ্নে ফরিদ বলে, সবাই যদি ফিরে যায়, সেও ফিরে যাবে। মা নেই, কোনো দিন আসবেনও না, তবু মায়ের জন্য কান্না পায় শিশুটির।

কক্সবাজারের উখিয়াস্থ থাইংখালীর হাকিমপাড়ার শরণার্থী শিবিরে ফরিদ আলমের মতো আরও অনেক শিশু রয়েছে। যাদের জীবনে ঘটে গেছে বেদনাদায়ক নানা ঘটনা। এসব ঘটনা আমাদের ব্যথিত করে।

বার্মার সেনাবাহিনী পৃথিবীর ইতিহাসে যে জঘণ্যতম ঘটনার সুত্রপাত করেছেন তা পৃথিবীতে যতো দিন মানুষ থাকবে ততোদিন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে ধিক্কার দেবে। মুসলমানদের উপর বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা যেভাবে হামলা করেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্মের নামে রাজনীতি করার এই প্রবণতা এক জঘণ্যতম নজীর হয়ে থাকবে।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...