বাংলাদেশী গবেষকের উদ্ভাবিত প্রথম ওষুধ ‘ন্যাসভ্যাক’

দুই বাংলাদেশী গবেষক বিশেষ কৃতিত্ব দেখালেন। তাদের উদ্ভাবিত প্রথম ওষুধ হিসেবে রেজিস্ট্রেশন পেতে চলেছে ‘ন্যাসভ্যাক’

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ এবার চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবদান রাখলেন বাংলাদেশী দুই বিজ্ঞানী। বাংলাদেশী দুই গবেষকের উদ্ভাবিত প্রথম ওষুধ ‘ন্যাসভ্যাক’ ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির অনুমোদন পেলেই তা বাজারে আসবে।

এবার দুই বাংলাদেশী গবেষক বিশেষ কৃতিত্ব দেখালেন। তাদের উদ্ভাবিত প্রথম ওষুধ হিসেবে রেজিস্ট্রেশন পেতে চলেছে ‘ন্যাসভ্যাক’। বাংলাদেশের এই দুই গবেষক হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে সংক্রমিত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় অধিকতর কার্যকর এই ওষুধ উদ্ভাবন করেছেন। ওষুধের রেসিপি ইতিমধ্যেই অনুমোদন হয়ে গেছে। বর্তমানে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির অনুমোদন পেলেই এটি বাজারজাত করবে দেশের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিকন।

জাপান প্রবাসী বাংলাদেশী লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর এই ওষুধটি উদ্ভাবনের জন্য মৌলিক গবেষণা সম্পন্ন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মামুন-আল-মাহতাব ওষুধের কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রধান পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন।

হেমাটোলজিস্টদের মতে, বর্তমানে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত মারাত্মক রোগীদের চিকিৎসায় যেসব ওষুধ ব্যবহৃত হয়ে থাকে সেগুলোর পূর্ণ কোর্সের খরচ পড়ে সাড়ে ৪ লাখ হতে ৫ লাখ টাকা। কিউবায় উৎপাদিত ন্যাসভ্যাক ব্যবহার করলে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়। তবে দেশে ন্যাসভ্যাক উৎপাদন করা হলে এর দাম পড়বে মাত্র ২ লাখ টাকার মতো। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে, এটির নিবন্ধন পাওয়া গেলে সিভিয়ার হেপাটাইটিস-বি রোগীদের চিকিৎসা খরচ অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসবে। নিবন্ধন নিয়ে দেশের একটি কোম্পানি বিকন এটি উৎপাদন করবে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ডা. মামুন-আল-মাহতাব বলেছেন, এই ওষুধের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত শতকরা ৫০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল মিলেছে। লিভারের প্রদাহে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সায় আরোগ্য লাভের হার এক্ষেত্রে শতভাগ।

অধ্যাপক ডা. মামুন-আল-মাহতাব জানান, ‘ন্যাসভ্যাক’ অদূর ভবিষতে ক্যান্সার গবেষণাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি ক্রনিক ইনফেকশনের চিকিত্সাও বিশেষ কার্যকর।

২৫ বছর ধরে হেপাটাইটিস বি চিকিৎসায় নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন অধ্যাপক ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর। তাঁর গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য হলো, হেপাটাইটিস বি’র বিরুদ্ধে মানুষের নিজের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে বাড়িয়ে দিয়ে ভাইরাসটকে নিয়ন্ত্রণ করা। এই উদ্দেশ্যে ডা. আকবর প্রথমে ইঁদুরের ওপর গবেষণা চালান। পরে জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে হেপাটাইটিস বি রোগীদের ওপর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে আরও গবেষণার জন্য ডা. মাহতাব বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার হেপাটাইটিস ‘বি’ রোগীর ডেটাবেস তৈরি করেন।

তাঁরা জানিয়েছেন, ২০০৯ সালে বাংলাদেশে ১৮ জন ক্রনিক হেপাটাইটিস ‘বি’ রোগীর ওপর ‘ন্যাসভ্যাক’-এর প্রথম এবং দ্বিতীয় দফা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালিত হয়। এতে আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়ায় ২০১১ সালে পুনরায় ১৫১ জন রোগীর ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচারিত হয়। জানা যায়, তৃতীয় দফায় এই ১৫১ জন ক্রনিক হেপাটাইটিস ‘বি’ রোগীকে দুই দলে ভাগ করে তাদেরকে যথাক্রমে ‘ন্যাসভ্যাক’ এবং পেগাইলেটেড ইন্টারফেরনের মাধ্যমে চিকিত্সা করা হয়। ওই ট্রায়ালটিতে সর্বমোট ৭৫ জন রোগীকে মোট ১৫ বার ‘ন্যাসভ্যাক’ ও অন্য ৭৬ জন রোগীকে মোট ৪৮ বার পেগাইলেটেড ইন্টারফেরন ওষুধটি প্রয়োগ করা হয়।

ডা. মামুন-আল-মাহতাব বলেছেন, ‘এই পরীক্ষায় দেখা যায় যে ন্যাসভ্যাক পেগাইলেটেড ইন্টারফেরন-এর চেয়ে অধিক কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।’ তিনি বলেন, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে এর চূড়ান্ত পর্যায়ের ট্রায়ালও দেওয়া হয়েছে।

ডা. মামুন-আল-মাহতাব আরও বলেন, কিউবার ওষুধ প্রশাসন ইতিমধ্যে ন্যাসভ্যাককে অনুমোদনও দিয়েছে। সেইসঙ্গে বেলারুশ, ইকুয়েডর, নিকারাগুয়া এবং এঙ্গোলাতেও হেপাটাইটিস বি’র চিকিত্সায় ‘ন্যাসভ্যাক’ ব্যবহারের অনুমতি মিলেছে।

বর্তমানে বিশ্বে হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণ হতে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ করে তোলার মতো কোনো ওষুধ নেই। চিকিত্সকরা এই রোগের চিকিত্সার জন্য প্রচলিত চিকিত্সা পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। যাতে করে এসব রোগী ধীরে ধীরে সংক্রমণ হতে আরোগ্য লাভ করে ও লিভার সিরোসিস কিংবা লিভার ক্যান্সারের মতো রোগে আক্রান্ত না হয়।

সংবাদ মাধ্যমকে ডা. মাহতাব আরও বলেছেন, এমনকি এই ধরনের চিকিৎসাও দীর্ঘদিন কোনো রোগীর ওপর প্রয়োগ করলে তার নানা ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তবে ‘ন্যাসভ্যাক’-এর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এই ওষুধটি ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে অনেক বেশি কার্যকর। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় আরও প্রমাণিত হয়েছে যে, ‘ন্যাসভ্যাক’ কেবলমাত্র হেপাটাইটিস বি’র চিকিত্সার জন্যই কার্যকর তা নয়, যে কোনো ক্রনিক ইনফেকশনের জন্যও এটি বেশ কার্যকর।

উল্লেখ্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অন্তত ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ক্রনিক হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...