The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

নাদিয়া মুরাদ নামে আইএসের এক যৌনদাসীর গল্প!

পুরুষদের হত্যা করার পর আইএস জঙ্গিরা নাদিয়া এবং অন্য নারীদের একটি বাসে করে মসুল শহরে নিয়ে যায়

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ নারীদের নিয়ে গিয়ে যৌনদাসী বানানোর ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠী (আইএস) সৃষ্টির পর থেকেই এমন অনেকগুলো ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে। আজ রয়েছে নাদিয়া মুরাদ নামে আইএসের এক যৌনদাসীর গল্প!

নাদিয়া মুরাদ নামে আইএসের এক যৌনদাসীর গল্প! 1

ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় ছোট্ট গ্রাম কোচোতে পরিবারের সঙ্গেই থাকতেন নাদিয়া মুরাদ নামে জনৈকা তরুণী। দরিদ্র ওই গ্রামের মানুষের চাহিদা ছিল কম বলে সবাই সুখী ছিলেন। ওই দারিদ্র্যের মধ্যেই পড়াশোনা চালাচ্ছিলেন নাদিয়া। ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠী (আইএস) ২০১৪ সালে ঢুকে পড়ে ওই গ্রামে। একদিন অস্ত্রের মুখে গ্রামের সবাইকে একটি স্কুলে ঢোকানো হয়। পুরুষদের আলাদা করে স্কুলের বাইরে দাঁড় করানো হয়। তারপরেই মুহুর্মুহু গুলিতে নাদিয়ার ৬ ভাইসহ পুরুষদের হত্যা করা হয়।

পুরুষদের হত্যা করার পর আইএস জঙ্গিরা নাদিয়া এবং অন্য নারীদের একটি বাসে করে মসুল শহরে নিয়ে যায়। সেখানে কম বয়সী মেয়েদের যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি করা হয়। বিক্রি হন ইয়াজিদি তরুণী নাদিয়া নিজেও। আইএসের যৌনদাসী হিসেবে বেশ কিছুদিন থাকার পর একদিন তিনি পালিয়ে আসেন।

সম্প্রতি ব্রিটিশ অনলাইন দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি লন্ডনে এক সাক্ষাৎকারে নিজেই এই লোমহর্ষক কাহিনী তুলে ধরেছেন নাদিয়া মুরাদ। তার বয়স বর্তমানে ২৪। ‘দ্য লাস্ট গার্ল’ শিরোনামে নাদিয়ার একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। ওই বইয়ে এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনাও রয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, আইএসের কাছ থেকে পালিয়ে এসে নাদিয়া মুরাদ জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত হয়েছেন। মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী আমাল ক্লুনির সঙ্গে আইএস জঙ্গিদের হাতে বন্দী ইয়াজিদি নারী এবং যারা পালিয়ে এসেছেন, তাদের নিয়ে বর্তমানে কাজ করছেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে নাদিয়া মুরাদ বলেছেন, ‘এই ঘটনা আমি ইচ্ছাকৃতভাবে বলেছি, তা নয়। বরং কাওকে না কাওকে লোমহর্ষক এই ঘটনা বলতেই হতো।’

নাদিয়া মুরাদ নামে আইএসের এক যৌনদাসীর গল্প! 2

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৪ সালে আইএস জঙ্গিরা ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এই এলাকায় ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। আইএসের জঙ্গিরা ওই এলাকায় নারীসহ হাজার হাজার মানুষকে অপহরণ এবং হত্যা করে। যেসব তরুণী এবং নারীদের তারা অপহরণ করে, তাদের যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি এবং ব্যবহার করতো জঙ্গিরা।

নাদিয়া মুরাদ বলেন, ‘আমার এই বই প্রকাশের মূল লক্ষ্য হলো গোটা বিশ্ব জানানো, ইয়াজিদি নারীদের সঙ্গে আইএস কী করে। নারীরা কীভাবে নির্যাতন সহ্য করেন সেটি জানানো।’

নাদিয়া বলেন, ‘আমাদের গ্রামের সবাই গরিব। তবে এতেই সবাই সন্তুষ্ট ছিলেন এবং সুখীও ছিলেন। ২০১৪ সালে আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়ে আইএস। তারা অন্য পুরুষদের সঙ্গে আমার ৬ ভাইকে গুলি করে হত্যা করে। পরে আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশী নারীদের সঙ্গে আমাকেও বাসে করে মসুল শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। বাসে যাওয়ার সময় আইএসের জঙ্গিরা নারীদের শ্লীলতাহানি এবং যৌন হয়রানি করে।’

আইএসের হাত থেকে পালিয়ে আসা এই তরুণী আরও বলেন, বাস থেকে নামিয়ে যৌনদাসী হিসেবে তাদেরকে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। এক ব্যক্তি দেখেশুনে তিনজন নারীকে পছন্দ করে। পরে মার্কিন ডলার দিয়ে তাদেরকে কিনে নিয়ে যায়। এক ব্যক্তি নাদিয়ার পেটে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেয়। এর অর্থ হলো নাদিয়াকে কেনার জন্য পছন্দ করেছে ওই ব্যক্তি। পরে ওই ব্যক্তি তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়।

নাদিয়া মুরাদ বলেন, ‘সব সময় এমন বেদনাদায়ক গল্প বলতে আমার ভালো লাগে না। সে কারণেই এসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ আমি বইতে লিখেছি।’ তিনি আরও বলেন, আইএস জঙ্গিরা ইয়াজিদি নারী, তরুণী এমনকি ৯ বছর বয়সী কন্যাশিশুকেও যৌন নির্যাতন করতে ছাড়ে না। তাদের অপহরণের শিকার এমন অনেক ইয়াজিদি নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, যৌনদাসী হিসেবে থাকার পর একদিন পালানোর চেষ্টা করেন নাদিয়া। তবে সেবার ধরা পড়েন। পালানোর চেষ্টা করার শাস্তি হিসেবে তিনি গণধর্ষণের শিকারও হয়েছিলেন।

নাদিয়া মুরাদ বলেন, ‘পালানোর চেষ্টা করে ধরা পড়ার পর গণধর্ষণের শিকার হয়েও আমি ভেঙে পড়িনি। কারণ হাজারো নারী আইএসের হাতের বন্দী রয়েছেন। এ ভাবনাই আমাকে সাহস যুগিয়েছিল।’

প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করা হয়, যৌন নির্যাতনের শিকার নাদিয়া আইএসের হাত হতে পালানোর জন্য তক্কেতক্কেই ছিলেন। একদিন দরজা বন্ধ না করেই নাদিয়াকে একা ঘরে রেখে বেরিয়ে যায় এক আইএস সদস্য। ব্যস, এই সুযোগেই ঘর হতে বেরিয়ে দেওয়াল টপকে আইএসের ডেরা হতে বেরিয়ে যান তিনি। কাপড়ে মুখ ঢেকে মসুলের অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটি বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে ওই বাড়ির সদস্যরা সাহায্য করেন তাকে। তারাই একজনের স্ত্রী সাজিয়ে নাদিয়াকে আইএসের এলাকা থেকে বের করে নিয়ে যান। এরপর ২০১৫ সালে জার্মানির শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় মেলে নাদিয়ার। সেখানে তার এক বোনও রয়েছেন। ওই বোনের স্বামীকে জঙ্গিরা হত্যা করেছে। জার্মানির স্টুটগার্টের একটি অ্যাপার্টমেন্টে বর্তমানে নাদিয়া তার বোনসহ থাকেন।

নাদিয়া বলেছেন, ‘এটি ঠিক সাহসের বিষয় নয়। আপনি যখন প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হতে থাকবেন, নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়াবেন, তখন এসব ভাবনাই আপনাকে টিকে থাকার উপায় বের করে দিবে।’

নাদিয়া আরও বলেছেন, ‘মসুলে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। তাদের মধ্যে ২ হাজার মেয়েকে অপহরণ করে আটকে রেখেছে জঙ্গিরা। মসুলে হাজারো পরিবার বাস করেন তবে কেওই সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। যারা সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন, তারা হাজার হাজার ডলার দাবি করেন।’ নাদিয়ার ভাবিকে উদ্ধারে ওই ভাবির পরিবার ২০ হাজার ডলার দিয়েছিল বলেও জানিয়েছেন নাদিয়া।

আইএসের হাত হতে পালিয়ে আসার পর একবার নিজ গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন নাদিয়া। তিনি সেখানে গিয়ে আর বাড়ি খুঁজে পাননি। পুরো বাড়ি, পুরো গ্রাম যেনো এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

‘দ্য লাস্ট গার্ল’ বইয়ের লেখক নাদিয়া মুরাদ বলেছেন, ‘আমাদের ধারণা ছিল যে, অন্য পুরুষ সদস্যদের মতোই আমাদের হত্যা করা হতে পারে। তবে আমাদের হত্যা করা হয়নি। তার বদলে ইউরোপ, সৌদি আরব ও তিউনিসিয়া হতে আসা জঙ্গিরা রোজ একের পর এক এসে আমাদের ধর্ষণ করে যেতো।’ তিনি আরও বলেছেন, তিনি একজন মেকআপ আর্টিস্ট হতে চান। তিনি নিজের একটা স্যালন খুলতে চান। নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চান। তিনি আইএসের হাত হতে পালিয়ে বেঁচে আসা তরুণী হিসেবে পরিচিতি পেতে চান না।

উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষ মানবাধিকারবিষয়ক পুরস্কার শাখারভ পুরস্কার-২০১৬ পেয়েছেন ইয়াজিদি নারী নাদিয়া মুরাদ এবং লামিয়া আজি বাশার। তারা দুজনই আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর যৌন দাসত্ব হতে মুক্তি পাওয়া নারী। সাবেক সোভিয়েত বিজ্ঞানী এবং ভিন্নমতাবলম্বী আন্দ্রেই শাখারভের স্মরণে প্রতিবছর এই পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের প্রসারে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ দেওয়া হয় এই পুরস্কার।

Loading...