জেনে নিন পৃথিবী হঠাৎ থেমে গেলে কি ঘটতে পারে

পৃথিবী নিজেকে কেন্দ্র করে ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ৬৭৫ কিলোমিটার বেগে ঘুরছে

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ পৃথিবী নিজেকে কেন্দ্র করে ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ৬৭৫ কিলোমিটার বেগে ঘুরছে। এই ঘুর্ণনের উপর নির্ভর করেই পৃথিবীর সমস্ত কার্যক্রম সম্পাদিত হচ্ছে। অর্থাৎ আহ্নিক গতি এবং বার্ষিক গতি। পৃথিবীর ঘূর্ণন থেমে যাওয়া নিয়ে মানুষের মনে হাজারো কল্পনা- জল্পনা বাসা বেধেছে। তাহলে চলুন পৃথিবী যদি হঠাৎ স্থির হয়ে যায় তাহলে যে সমস্ত বিষয় ঘটতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছেন তার কিছু জেনে নেওয়া যাক।

পৃথিবী নিজেকে কেন্দ্র করে ঘণ্টাপ্রতি প্রায় ১ হাজার ৬৭৫ কিলোমিটার স্পীডে ঘুরছে। তবে এই গতি সব জায়গায় সমান নয়। কেবল মাত্র যারা বিষুব রেখাতে বসবাস করে তারায় এর সর্বোচ্চ গতি পাবে। এখন আপনি যদি একেবারে বিষুব রেখাতে থাকেন তবে এই ঘূর্ননের সর্বোচ্চ গতিটা পাবেন। আমরা বাংলাদেশিরা বিষুব রেখাতে বাস করি। তাই এর সর্বোচ্চ গতিতে রয়েছি। আবার যদি কোনো একটা মেরু অঞ্চলের দিকে যেতে থাকেন তবে এই গতি কমে যেতে থাকবে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, আপনি যদি পৃথিবী থেকে একটা লাফ দিয়ে এক ফিট পরিমাণ উপরে উঠেন, তবে তো পৃথিবী আপনাকে ফেলে রেখেই এক সেকেন্ডে ১ হাজার ২০৭ ফিট চলে যাবে। কারণ পৃথিবী প্রতি সেকেন্ডে নিজেকে কেন্দ্র করে এই গতিতেই ঘুরছে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। যেখানে লাফ দিয়েছেন আবার সেখানেই পড়েছেন। তাহলে কেন লাফ দেওয়ায় দুরে চলে যাচ্ছেন না?

এর কারণ হচ্ছে পৃথিবী শুধু নিজেই ঘুরছে না তার উপরে থাকা সব কিছুকে নিয়েই ঘুরছে। মানে আপনি যখন বাতাসে লাফ দেন পৃথিবীর সাথে আপনিও ঘুরতে থাকেন। সেটা আপনি যেখানেই থাকেন না কেন। পৃথিবী আপনাকে যে আকর্ষণটা দিয়ে ধরে রাখছে এই আকর্ষণের জন্যই এসব কিছু হচ্ছে।

এখন আসা যাক পৃথিবী থেমে যাওয়ার ব্যাপারে। মনে করুন আপনি একটা বাসে উঠলেন যা ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে চলছে। হঠাৎ করে বাসটা রাস্তার পাশে একটা আস্ত গাছের সাথে ধাক্কা লেগে তৎক্ষণাৎ থেমে গেল। তাহলে বাসের যাত্রীদের ,কি অবস্থা হতে পারে বুঝতেই পারছেন। সবাই এত জোরে সামনের দিকে ছিটকে যাবে যে কেউই বেঁচে থাকার মত থাকবে না।

সামান্য.১০০ কিলোমিটার স্পীডের একটা বাস যদি হঠাৎ থেমে গেলে এত ভয়ানক হতে পারে তবে ঘণ্টায় ১ হাজার ৬৭৫ কিমি স্পীডে চলা পৃথিবীর ঘূর্ণন থেমে গেলে কি হতে পারে তা নিশ্চয় এতোক্ষণে অনুধাবন করে ফেলেছেন।

পৃথিবী থেমে গেলে প্রথম মুহূর্তেই পৃথিবীর পৃষ্ঠতলে থাকা সবকিছু একই সাথে উড়তে শুরু করবে ঠিক পশ্চিম দিকে যেভাবে বাসের যাত্রীরা সামনের দিকে ছিটকে যাবে। সমস্ত প্রাণি, বিশাল সব বিল্ডিং,, কল কারখানা এমনকি পাহাড় পর্বতগুলোও মাটি থেকে উপরে গিয়ে অর্থাৎ পৃথিবীর উপরিস্থলের সমস্ত কিছু উড়তে শুরু করবে। একই সঙ্গে সেই উড়ে যাওয়ার স্পিড হবে ঘণ্টায় প্রায় ১০০০ কিলোমিটারের কম নয়। কোনো কিছুই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন না। কারণ ওই বাসের মত পুরো পৃথিবীতে হঠাৎ করে যে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা লাগবে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে তা সামলাতে পারবেন না কিছুই।

এছাড়াও মানুষ সহ সমস্ত প্রাণি গুলি ছোড়ার ন্যায় উড়ে যাবে। সমস্ত প্রাণির অস্তিত্ব কিছুক্ষণের মধ্যে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কারণ হঠাৎ করে আপনি যদি ১ হাজার ২০০ ফিট প্রতি সেকেন্ডে ছিটকে গিয়ে উড়তে শুরু করেন তবে আপনার শরীরে প্রতিটি হার থেকে মাংস এবং শিরা উপশিরা আলাদা হয়ে যাবে এবং রক্ত নিচে পড়ে না গিয়ে বাতাসে ভাসতে থাকবে। এর কারণ হচ্ছে বাতাসের সাথে আপনার শরীরে যে ঘর্ষণ হবে এই মারাত্মক স্পীডে তা সহ্য করার মত ক্ষমতা আপনার শরীরের নেই।

আকাশে প্লেনে উড়তে থাকা এবং একেবারে উত্তর এবং দক্ষিণ মেরুতে থাকা লোকেরা প্রথম কয়েক সেকেন্ডের জন্য রক্ষা পেলেও কয়েক সেকেন্ড পর তারাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কারণ পৃথিবীর থেমে যাওয়া কয়েক সেকেন্ড পরেই শুরু হবে ভয়ানক ধুলোর মেঘ জমা। যা শুরু করবে ঝড় এবং প্রচণ্ড বজ্রপাতের ফলে মারাত্মক বিদ্যুতায়নের সৃস্টি হবে যার ফলে বিমানগুলো এক সেকেন্ড-এর মধ্যে ভস্ম হয়ে যাবে।

হঠাৎ করে থেমে যাওয়ার কারণে পৃথিবীতে প্রচণ্ড একটা ধাক্কার মত বাতাসের সৃষ্টি হবে। পারমাণবিক বোমা বিষ্ফোরণের প্রচণ্ড শক ওয়েভের মত অসম্ভব ভয়ানক একটা শক ওয়েভ মেরুগুলোতে গিয়ে ধাক্কা দেবে। এতে সেখানে বসবাসকারীরা একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।

২০০৪ সামান্য একটা ভুমিকম্পের কারণে শ্রীলঙ্কাতে ভয়ানক সুনামি হয়েছিল। কিন্তু পৃথিবী যখন এই মাত্রার একটা ঝাঁকি দেবে সাথে সাথে বিশাল সব ঢেউ এর সুনামি শুরু হবে। প্রথমে সেই সুনামি পুরো পৃথিবীর সকল স্থলভাগ ডুবিয়ে দিবে। তারপরে আস্তে আস্তে পানিগুলো মেরু অঞ্চলের দিকে যেতে থাকবে।

তার কারণ হল পৃথিবী পুরোপুরি গোল না। কিছুটা চ্যাপ্টা। যেহেতু পানির ধর্ম সমতল পৃষ্ঠ ধারণ করা তাই পানি সেটাই করবে। সে সেই কমলালেবুকে পারফেক্টলি গোল করে ফেলবে। ফলে ২৯ ভাগ ভূভাগকে ৯০ ভাগ ভূভাগে পরিণত করবে। পুরো পৃথিবী একেবারে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে। পুরো পৃথিবীর সমস্তস্থলভাগ এবং সমুদ্রসহ সবকিছুতে আগুন লেগে যাবে। এত ভয়ানক আগুন লাগবে যে সমুদ্রে পানি শুকিয়ে যাওয়া শুরু করবে। আর এই আগুনের জ্বালানি হবে অক্সিজেন।

এবার আসি সুর্যের কাছে। পৃথিবী হঠাৎ থেমে যাওয়ায় পৃথিবীর একদিকে স্থায়ীভাবে দিন হওয়া শুরু করবে আর এক দিকে স্থায়ীভাবে অন্ধকার হবে। একই স্থানে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কারণে পৃথিবীর কেন্দ্রে যে প্রচণ্ড উত্তপ্ত ধাতব কোরটি আছে যা পুরো পৃথিবীকে একটা আস্ত ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করে রেখেছে সেটিও থেমে যাবে। ম্যাগনেটিক ফিল্ড ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ফলে ওজন স্তরও থাকবে না। আর সূর্য পৃথিবী পৃষ্ঠকে এসব তেজস্ক্রিয় রশ্মি দ্বারা এতটাই গরম করে ফেলবে যে কোনো জীবিত মানুষকে পৃথিবীর ওই অর্ধেকভাগে দাঁড়া করালে কয়েক সেকেন্ড-এর মধ্যে তাদের মাথা পুড়ে গিয়ে মস্তিস্ক গলে যেতে থাকবে। যদিও তার আগেই মানুষ নিশ্চিহৃ হয়ে যাবে।

বাকি অর্ধেক পৃথিবী স্থায়ীভাবে রাত হওয়ায় খুব দ্রুত তাপমাত্রা কমে পুরোপুরি বরফ হয়ে যাবে। মানে একদিকে পুড়তে থাকবে আর একদিকে প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমিয়ে ফেলবে। ফলে পুড়ে এবং বরফে জমে পৃথিবীতে প্রাণির অস্তিত্ব এমনকি ব্যক্টেরিয়া পর্যন্ত নিঃশেষ হয়ে যাবে।

Advertisements
Loading...