গ্যাস সংযোগে আদালতের বাধা নেই কিন্তু..

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ সরকারি সিদ্ধান্ত ছাড়া নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রাখতে আদালতের দেওয়া আদেশ গতকাল ১৬ এপ্রিল প্রত্যাহার করেছেন হাইকোর্ট। এক আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি জাফর আহমেদের বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এ আদেশের ফলে দীর্ঘ প্রায় ৩ বছর পর নতুন গ্যাস সংযোগের অনুমতি মিলল। কিন্তু পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যানের টিভি চ্যানেলগুলোতে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী বোঝা যায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলেও জ্বালানি উপদেষ্টার ইচ্ছা না হলে সংযোগ চালু হচ্ছে না!
Gas Chula

আবেদনকারী আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে জমা আছে বলে একাধিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর প্রেক্ষিতে এ আবেদন করার ফলে বিজ্ঞ হাইকোর্টের আদেশে নতুন গ্যাস সংযোগে আইনি আর কোনো বাধা থাকল না। জানা যায়, বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ২১ জুলাই শিল্প ও বাণিজ্যিক এবং ২০১০ সালের ১৩ জুলাই আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়। গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকার সুবাদে তিতাসের অসাধু কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যোগসাজশে সরকারের সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করে অবৈধভাবে টাকার বিনিময়ে গ্যাস সংযোগ দিতে থাকে। এতে তারা শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও সরকার পাইনি কিছুই। এ অবৈধ সংযোগের ভিড়ে বৈধভাবে সংযোগ নেওয়া ব্যক্তিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ এনে ২০১২ সালের ৮ নভেম্বর জনস্বার্থে এক রিট আবেদন করে। রিট আবেদনটি দায়ের করেছিলেন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেট এখলাছ উদ্দিন ভূইয়া ও মাহবুবুল ইসলাম। এ রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সরকারি সিদ্ধান্ত ছাড়া গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন।

পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ২০১০ সালে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ সরকার বন্ধ করে দেওয়ার পর ৫৭ হাজার ৪১৪টি চুলায় অবৈধ প্রক্রিয়ায় নতুন সংযোগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় সমান-সংখ্যক চোরাই সংযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। সম্প্রতি পেট্রোবাংলা নতুন গ্যাস সংযোগ উন্মুক্ত করার প্রস্তবানায় এসব অবৈধ সংযোগের সংখ্যা কত, তাতে কি পরিমাণ গ্যাসের চাহিদা বাড়বে উল্লেখসহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে ফের মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে প্রস্তাবটি।

এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি গত ২৭ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো আবাসিক খাতে গ্যাস-সংযোগ চালুর সুপারিশ করে। তার পরিপ্রেক্ষিতে ওই দিনই পেট্রোবাংলা একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। মন্ত্রণালয় থেকে ওই প্রস্তাবে বর্তমানে অবৈধ গ্রাহক-সংখ্যা কত, নতুন সংযোগ দেওয়া হলে কি পরিমাণ গ্যাসের প্রয়োজনসহ বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব চেয়ে প্রস্তাবটি পেট্রোবাংলার কাছে ফেরৎ পাঠায় মন্ত্রণালয়। অবশেষে প্রশ্নের জবাব দিয়েই গত ১১ এপ্রিল পেট্রোবাংলা ফের প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

পেট্রোবাংলা তার প্রস্তাবে বলেছে, বর্তমানে দেশের ৫টি বিতরণ কোম্পানির অধীনে বৈধ আবাসিক গ্যাস গ্রাহকের সংখ্যা ২৩ লাখ ৫ হাজার ২৩১। অবৈধ মিলিয়ে এ সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। সে অনুযায়ী, বৈধ আবাসিক সংযোগে দৈনিক গ্যাস ব্যবহার হয় ২৪ কোটি ৪৮ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ মোট উৎপাদিত গ্যাসের ১২ শতাংশ ব্যবহার হয় আবাসিকে। যদিও বর্তমানে আবাসিক সংযোগেই গ্যাসের চাহিদা সাড়ে ২৭ কোটি ঘনফুট। ২০১০ সালের ১৩ জুলাই আবাসিক খাতে নতুন সংযোগ বন্ধ করার সময় আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার এবং বর্তমানে সংযোগ উন্মুক্ত করা হলে প্রায় দেড় লাখ নতুন আবেদন পড়বে। এতে প্রায় ৩ লাখ গ্রাহককে নতুন সংযোগ দিতে হবে। এজন্য প্রতিদিন শুধু আবাসিকেই গ্যাস ব্যবহূত হবে ৩০ কোটি ঘনফুট। পেট্রোবাংলার যুক্তি হচ্ছে, বিতরণ কোম্পানিগুলোর দৈনিক নতুন সংযোগ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে ৩০০টির মতো। ফলে সংযোগ উন্মুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই দৈনিক গ্যাসের চাহিদা আড়াই কোটি ঘনফুট বাড়বে না। সব গ্রাহককে সংযোগ দিতে সময় লাগবে প্রায় ২ বছর। এ অবস্থায় পর্যায়ক্রমে গ্যাসের চাহিদাও বাড়বে। ফলে কোনো সমস্যা হবে না।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুর বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ২ লাখ অবৈধ গ্যাস-সংযোগ রয়েছে। এতে দৈনিক ১৮ লাখ টাকার গ্যাস চুরি হচ্ছে। বর্তমানে যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে, তার ৭০ শতাংশই এখন অবৈধ সংযোগ দিয়ে চলছে। ফলে নতুন করে সংযোগ দিলে বাড়তি ৩০ শতাংশ গ্যাসের আওতায় আসবে। এতে ৮ মিলিয়ন গ্যাস প্রয়োজন পড়বে। তাছাড়া অবৈধ সংযোগ আইডেন্টিফাই করা যাচ্ছে না। ফলে নতুন সংযোগ দিয়ে সব গ্রাহককে বৈধ করতে পারলে সরকার ৫০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পেত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবৈধ সংযোগ ধরার চেষ্টা চলছে। ধরা পড়লে এর হোতাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

গতকাল আদালতের রায়ের পর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকদের বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রী দফতরে ফাইল পাঠিয়েছি। কিন্তু শোনা যাচ্ছে বিষয়টি জ্বালানি উপদেষ্টা দেখবেন। অপরদিকে একটি টিভি চ্যানেলের কাছে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেছেন, আবাসিক গ্যাস সংযোগের বিষয়ে এই মুহূর্তে আমরা কোন সিদ্ধান্তে যাচ্ছি না।

যেহেতু আবাসিক ক্ষেত্রে সংযোগ না দেওয়ায় দেশের জনগণ দীর্ঘদিন যাবত সমস্যায় রয়েছেন। তাই জনগণ আশা করে আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

Advertisements
Loading...