The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি আত্মহত্যা ঠেকাতে সাহায্য করবে!

ট্রি হোল রেসকিউ টিমের সদস্যদের আরও অনেক সাফল্যের কাহিনী

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ এবার এমন এক প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে যে প্রযুক্তির মাধ্যমে আত্মহত্যা ঠেকাতে সাহায্য করবে দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত এই প্রযুক্তিটি!

দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি আত্মহত্যা ঠেকাতে সাহায্য করবে! 1

ট্রি হোল রেসকিউ টিমের সদস্যদের আরও অনেক সাফল্যের কাহিনীর মধ্যে এটিও একটি। চীনের ২১ বছর বয়সি এক শিক্ষার্থী লি ফ্যান দেশটির টুইটার-সদৃশ প্ল্যাটফরম উইবোতে বিশদ মেসেজ পোস্ট করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। সেটি ছিল ভ্যালেন্টাইন্স ডের ঠিক পরদিন।

সে লিখেছিলো যে ‘আমি আর পারছি না, আমি সবকিছু ছেড়ে দিচ্ছি।’ এর কিছুক্ষণ পরই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মূলত সে ঋণগ্রস্ত ছিল। তার মায়ের সঙ্গে বিবাদ চলছিল ও চরম বিষণ্নতায় ভুগছিল সে। তার বিশ্ববিদ্যালয় নানজিং হতে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে আমস্টারডামের একটি কম্পিউটারে চলমান এক প্রোগ্রামের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয় চীনের এই শিক্ষার্থীর পোস্টটি।

ওই কম্পিউটার প্রোগ্রামটি মেসেজটিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে চীনের বিভিন্ন এলাকায় থাকা স্বেচ্ছাসেবকদের নজরে নিয়ে আসে যাতে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন। যখন তারা এতো দূর হতে লিখে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হলো না তখন স্থানীয় পুলিশের কাছে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে দেয় এবং তখন তারা এসে তাকে বাঁচায়। শুনতে নিশ্চয়ই এটা খুব বিস্ময়কর কিংবা অসাধারণ শোনালেও ট্রি হোল রেসকিউ টিমের সদস্যদের আরও অনেক সাফল্যের কাহিনীর মধ্যে এটিও একটি।

এই উদ্যোগের প্রধান ব্যক্তিটি হলেন হুয়াং ঝিশেং, যিনি হলেন ফ্রি ইউনিভার্সিটি আমস্টারডামের একজন শীর্ষ আর্টিফিশাল ইন্টেলিজেন্স (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) গবেষক। গত ১৮ মাস ধরে চীন জুড়ে ৬০০ স্বেচ্ছাসেবক তার এই প্রোগ্রাম ব্যবহার করে আসছে, যারা বলছে, প্রায় ৭০০-র কাছাকাছি মানুষকে তারা ইতিমধ্যেই বাঁচিয়েছে।

বৃটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি নিউজকে মিস্টার হুয়াং বলছিলেন যে, ‘এক সেকেন্ডও যদি আপনি ইতস্তত করেন, তাহলে অনেক প্রাণ শেষ হয়ে যাবে। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০ জনকে আমরা প্রাণে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছি।’

২০১৮ সালের ২৯ এপ্রিল প্রথম রেসকিউ অপারেশন চালানো হয়। চীনের উত্তরাঞ্চলীয় শ্যানডং প্রদেশের ২২ বছর বয়সি আরেক তরুণী তাও ইয়ো। সে উইবোতে লিখেছিল যে দুই দিন পরে নিজেকে শেষ করে ফেলার পরিকল্পনা করেছিল। চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সের স্বেচ্ছাসেবক পেং লিং নামে এক ব্যক্তি ও আরও কয়েক জন এই বিষয়টিতে বিচলিত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন।

এই বিষয়ে মিজ পেং সংবাদ মাধ্যমটিকে বলেন, ‘তারা আগের এক পোস্ট হতে ওই শিক্ষার্থীর একজন বন্ধুর ফোন নম্বর পান এবং কলেজ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়ে দেন। আমি ঘুমানোর আগে তাকে মেসেজ করার চেষ্টাও করি, তাকে বলি যে আমি তাকে তুলতে পারবো। তার উইচ্যাট মেসেজ গ্রুপের একজন বন্ধু হিসেবে সে আমাকে যুক্তও করে এবং ধীরে ধীরে সে শান্ত হয়। তখন থেকে তার দিকে আমি নজর রাখতাম যেমন সে ঠিকঠাক খাচ্ছে কি না। আমরা সপ্তাহে একবার ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাকে একগুচ্ছ করে ফুলও কিনে দিতাম।’ এই সাফল্যের পর এই উদ্ধার দলের সদস্যরা একজন পুরুষকে উদ্ধার করেন যিনি একটি ব্রিজ হতে লাফিয়ে পড়তে চেয়েছিল। একজন নারীকে বাঁচায় যে কি না যৌন হেনস্থার শিকার হওয়ার পর নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন।

বেইজিং এর জনৈক মনোবিজ্ঞানী লি হং যিনি এই প্রোগ্রামের সঙ্গে এক বছর ধরে জড়িত রয়েছেন। তিনি বলেন যে, ‘উদ্ধারের জন্য প্রয়োজন ভাগ্য ও অভিজ্ঞতা দুটোই। সব হোটেলের অভ্যর্থনা-কর্মীরা সবাই বলতো তারা ওই নারীর সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তবে তাদের মধ্যে একজন এক মুহূর্তের জন্য ইতস্ততও করছিলেন । তখন আমরা ধরে নিলাম যে এটিই নিশ্চয়ই সেই হোটেল- সত্যিই তাই ছিল।’ তিনি স্মরণ করেন কীভাবে তিনি ও তার সহকর্মীরা চেং-ডুর ৮টি হোটেলে পরিদর্শন করেন, আত্মহননে চেষ্টাকারী একজন নারীকে খুঁজতে একটি রুমও বুকিং দিয়েছিলেন।

প্রযুক্তিটি কাজ করে যেভাবে

জানা যায়, জাভা-বেজড এই প্রোগ্রামটি উইবোতে কিছু ‘ট্রি হোলস’ মনিটর করে। সেখানে পোস্ট করা কিছু বার্তা বিশ্লেষণ করে থাকেন। একটি ‘ট্রি হোল’ হলো ইন্টারনেটে যেসব জায়গায় লোকজন অন্যদের পড়ার জন্য গোপনে পোস্ট করে থাকে তার একটি চীনা নাম। এই নামকরণে পেছনে রয়েছে আইরিশ একটি কাহিনী- যেখানে একজন ব্যক্তি তার সব গোপন কিছু একটি গাছের কাছে গিয়ে বলে দেন। জোও ফানের দেওয়া পোস্ট এর একটি উদাহরণ। ২৩ বছর বয়সি এই চীনা শিক্ষার্থী ২০১২ সালে আত্মহত্যার আগে উইবোতে একটি মেসেজ লিখে যান। তার মৃত্যুর পর ১০ হাজারের বেশি অন্যান্য ব্যবহারকারী তা পোস্টে মন্তব্যও করেন, তাদের নিজেদের নিজস্ব সমস্যাগুলো তুলেও ধরেন। এভাবে মূল মেসেজটি এক সময় একটি ট্রি হোল হিসেবে রূপ নেয়।

এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে এই ধরনের কোনো পোস্ট শনাক্ত করা হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে ১ হতে ১০ এর মধ্যে র্যাংক দেওয়া হয়ে থাকে। র্যাংকে নাইন কিংবা ৯ হলে বুঝতে হবে যে খুব শীঘ্রই আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো হবে। টেন কিংবা ১০ নম্বর র্যাংকিং মানেই হলো, ইতিমধ্যেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকরা সরাসরি পুলিশকে খবর দেন, সেই সঙ্গে ওই ব্যক্তির পরিবার, আত্মীয়-স্বজন কিংবা বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়। তবে যদি সেটি র্যাংকিং ছয়ের নিচে থাকে- তার অর্থ কেবল নেতিবাচক কথাবার্তা শনাক্ত করা হয়েছে- সেক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকরা সাধারণত হস্তক্ষেপ করেন না। এসব ঘটনায় সেইসব ইস্যুর মধ্যে একটি হলো বিষণ্নতা সম্পর্কে বয়ষ্ক আত্মীয়দের মনোভাব হলো, এটি মূলত ‘বড় কিছু’ না।

মিস্টার লি সংবাদ মাধ্যমকে আরও বলেন, ‘আমি জানি আমি যখন হাই স্কুলে ছিলাম, তখন আমার মধ্যেও বিষণ্নতার সমস্যা ছিল। তবে আমার মা আমাকে বলেছিলেন, এটি ‘একেবারেই অসম্ভব-এ সম্পর্কে আর কখনই তুমি কিছু ভাববে না।’ এই প্রোগ্রামেও একজন তরুণীর পোস্ট শনাক্ত হয়। যেখানে সে লিখেছে যে, ‘যখন নতুন বছর আসবে- তখন আমি নিজেকে হত্যা করবো।’ তবে যখন স্বেচ্ছাসেবকরা তার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তখন তিনি বলেন যে, ‘আমার মেয়ে এই মুহূর্তে খুব আনন্দিত ও ভালো আছে। আপনার কতো বড়ো সাহস বলছেন যে, সে আত্মহত্যার পরিকল্পনা করতেছে?’ এমনকি স্বেচ্ছাসেবকরা তার মেয়ের বিষণ্নতার বিষয়ে প্রমাণ তুলে ধরার পরও তার মা বিষয়টিকে মোটেও গুরুত্ব সহকারে নেয়নি। তথ্যসূত্র: বিবিসি

Loading...