The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

ভ্রমণ: মধুসূদনের স্মৃতিবিজড়িত সাগরদাঁড়ি ঘুরে আসুন

ভ্রমণ মনকে করে প্রফুল্ল ও জ্ঞানের জগতকে করে আরও প্রসারিত

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ ভ্রমণ মানেই ঝর্ণা, সাগর, পাহাড়, বিশাল লেক, চা বাগান, হাওড় বা গহীন অরণ্যের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য। তবে ইতিহাসের অংশগুলোতে ঘুরতে গেলে মন্দ হয় না। মধুসূদনের স্মৃতিবিজড়িত সাগরদাঁড়ি ঘুরে আসুন।

ভ্রমণ: মধুসূদনের স্মৃতিবিজড়িত সাগরদাঁড়ি ঘুরে আসুন 1

এই চিত্তাকর্ষক দৃশ্যের সঙ্গে যদি যোগ হয় ঐতিহাসিক কোনো ব্যক্তির নাম, যেমন তার শৈশব কাটানো পথঘাট, বসতবাড়ি এবং তার কর্ম জীবনের নিদর্শন, তাহলে তো কথাই নেই। ভ্রমণটা হয়ে উঠে আরও চিত্তাকর্ষক। যা মনকে করে প্রফুল্ল ও জ্ঞানের জগতকে করে আরও প্রসারিত। মনের খোরাক ও জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে ভ্রমণটা তাই হতে পারে যশোরের কেশবপুরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে। যে গ্রামের নাম লেখা হয়েছে বইয়ের পাতায় পাতায়। যে স্থানে জন্মেছিলেন বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাগরদাঁড়ির কথা মনে করতেই প্রথমে আসে কপোতাক্ষ নদ। কারণ সরাসরি বঙ্গোপসাগরে সংযোগ থাকা এই নদের কূলেই কবির বাড়ি। বাবার সঙ্গে রাগ করে কবি দেশ ছাড়ার পর পুনরায় যে নদের ঘাটে এসে নৌকা তিনি ভিড়িয়েছিলেন, সেই নদ এই কপোতাক্ষ। নদের সেই স্মৃতিবিজড়িত ঘাট এখনও রয়েছে। তবে কবির স্মৃতিবিজড়িত নদের সেই প্রবাহ এখন নেই। নদের অধিকাংশই বর্তমানে মাছ চাষ প্রকল্প। দখলদারদের গ্রাসে নদ তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। তবে সরকারের বিশেষ উদ্যোগে সংরক্ষিত রয়েছে কবির বাড়ি। মধুসূদনকে ঘিরে এখানে নির্মিত হয়েছে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো, সাগদাঁড়ি পর্যটন কেন্দ্র, মধুসূদন মিউজিয়াম ইত্যাদি। এছাড়াও কপোতাক্ষের পাশে কবির স্মৃতি বিজড়িত কাঠবাদাম গাছ এবং বিদায় ঘাট পর্যটকদের আকর্ষণ করে চলেছে।

কথিত রয়েছে যে, ১৮৬৮ সালে কবি যখন সপরিবারে সাগরদাঁড়ি আসেন তখন ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে জ্ঞাতিরা তাকে বাড়িতেই উঠতে দেয়নি। তিনি এই কাঠ বাদাম গাছের নিচে তাঁবু খাটিয়ে ১৪ দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন, পরে বিফল মনে কপোতাক্ষের তীর ধরে হেঁটে হেঁটে বিদায় ঘাট হতে কোলকাতার উদ্দেশে বজরায় উঠেছিলেন। ১৯৬৫ সালের ২৬ অক্টোবর তদানীন্তন সরকার বাড়িটি পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। মধুসূদনের পরিবারের ব্যবহার্য কিছু আসবাব এবং অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে এই বাড়িতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মধুসূদন যাদুঘর। সেখানে স্থাপিত হয়েছে লাইব্রেরী। আগামীতে একটি মাইকেল গবেষণাগারও নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে গবেষণাগার নির্মাণের কাজটি এখনও সরকারের দাপ্তরিক পর্যায়ে রয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন সাগরদাঁড়ির তত্বাবধায়ক মহিদুল ইসলাম।

মহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, মাইকেলের সাগরদাঁড়ি ইতিহাসের অন্যতম একটি অধ্যায়। এখানে বছরের সবসময়ই দেশী-বিদেশী পর্যটকরা এসে থাকেন। পর্যটকদের থাকার জন্য এখানে রয়েছে একটি মোটেল। এখানে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। তবে এখানে পর্যটক নির্বিঘ্নে আসার জন্য রাস্তা-ঘাট আরও উন্নত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নজরে নিলে এখানে পর্যটক সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে। তাতে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। কারণ এটি প্রত্মতত্ত্ব অধিদফতরের অধীনে।

তিনি আরও জানান, মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িতে প্রতিবছর ১৫ হতে ২০ হাজার পর্যটক আসেন। এতে বার্ষিক ৬-৭ লাখ টাকার রাজস্ব আয় হয় সরকারের। তবে এটি একেবারেই আশানুরূপ নয়। যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ জনবল সংকটে আশানুরূপ দর্শনার্থী মিলছে না। তিনি জানান, এখানে একজন কাস্টডিয়ান, দুজন সাইট অ্যাটেন্ডেন্ট, ১ জন প্রহরী, ১ জন নৈশ প্রহরী, ৬ জন সাধারণ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন।

ভ্রমণ: মধুসূদনের স্মৃতিবিজড়িত সাগরদাঁড়ি ঘুরে আসুন 2

এক স্বপ্নের গ্রাম

যশোর শহর থেকে কেশবপুর হয়ে সাগরদাঁড়ি যাওয়ার পিচঢালা সরু পথ, দুই পাশে সারি সারি খেজুরগাছ, গাছের ফাঁক দিয়ে ডানে-বামে তাকালে দেখা যাবে খোলা মাঠ। সাগরদাঁড়ি গ্রামের বিখ্যাত দত্ত পরিবারের উঠোনে দাঁড়িয়ে যখন ভাববেন, এখানেই ১৮২৪ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনক মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তখনই আপনার মনে বইতে থাকবে আনন্দের হিল্লোল। মুহূর্তেই শরীরে সৃষ্টি হবে এক অন্য ধরণের শিহরণ। কারণ এই জমিদারবাড়িতে কাটে কবি মধুসূদনের শৈশব কাল। বর্তমানে বাড়িটির চার পাশে রয়েছে অসংখ্য আম-কাঁঠাল গাছসহ নানাবিধ বনোজ বৃক্ষরাজি দিয়ে পরিপূর্ণ। বৃক্ষের আবরণ ভেদ করে সূর্যের আলো এখানে নামতেই পারে না। একান্ত নিরিবিলি ছায়াময় এই পরিবেশে হরেক রকমের পাখির কলতানে মন কখন যে হারিয়ে যাবে তা বুঝে ওঠাও যাবে না। শানবাঁধা পুকুরের পাড় ঘেষে বিভিন্ন গুল্ম ও পাতাবাহারী ফুলের দৃশ্য বিমোহিত করতে পারে আপনাকে। কবির কাচারী ঘর এবং এর আশপাশের পাতাবাহারী ফুল গাছের সমাহার পরিবেশকে করেছে যেনো দৃষ্টিনন্দন। যেখানে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যেই কাটতে পারে দারুণ একটা সময়। ঘুরে ঘুরে দেখা যাবে কবির দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাসের সাক্ষী স্মৃতির চিহ্নগুলোও। তবে প্রতিবছর জানুয়ারীর শেষ সপ্তাহে যে মধুমেলা অয়োজন করা হয়ে থাকে। সে মেলা উপলক্ষ্যে সাগরদাঁড়িতে লোকসমাগম হয় অনেক অনেক বেশি। দর্শনার্থীর ভিড়ে কবির স্মৃতিবিজড়িত সব এলাকা ঘুরে দেখা সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে। তখন ভ্রমণটাও অসম্পূর্ণ বা অতৃপ্ত হবে। তাই একটু বেশি ঘুরতে বা দেখতে ভ্রমণটা অর্থপূর্ণ করতে মেলা ছাড়া বছরের অন্য সময়ে ভ্রমণটা হতে পারে সঠিক।

যাদুঘর ও জমিদারবাড়ি

জমিদারবাড়ির সামনেই রয়েছে কবি মধুসূদন দত্তের দু’টি আবক্ষ মূর্তি। এই বাড়ির ভেতরেই জাদুঘর। সেখানে মধুসূদনের পরিবারের ব্যবহৃত খাট, পালঙ্ক, আলনা ইত্যাদি গচ্ছিত করে রাখা হয়েছে। বাড়িটির চার পাশ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা রয়েছে। বাড়ির পশ্চিম পাশে বিশাল আকৃতির একটি পুকুর। পুকুরের যে ঘাটে বসে কবি মধুসূদন স্নান করতেন সেই পাকা ঘাটটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে।

কবিকে স্মরণ করতে তাঁর জন্মভূমি সাগরদাঁড়িতে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রতি বছর ২৫ জানুয়ারি হতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ৭ দিনব্যাপী বসে মধূমেলা।

সেই কাঠবাদাম গাছ

জমিদার বাড়ির ভেতরেই রয়েছে শানবাঁধা একটি পুকুর। পুকুরের দক্ষিণ পাশে রয়েছে কবির স্মৃতিবিজড়িত কাঠবাদাম গাছটি। কবি ছোটবেলায় এই গাছের গোড়ায় বসেই কবিতা লিখতেন। তবে এই কাঠবাদাম গাছটি এখন মৃতপ্রায়।

কবির স্মৃতিবিজড়িত সেই বিদায় ঘাট

১৮৩০ সালে মধুসূদন সাগরদাঁড়ি ছেড়ে কোলকাতা খিদিরপুর চলে যান। তারপর শুরু হয় দীর্ঘ পথচলা। তবে ভোলেননি তাঁর জন্মস্থানের কথা, কপোতাক্ষ নদের কথাও। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে ১৮৬২ সালে কবি স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে নিয়ে নদী পথে বেড়াতে এসেছিলেন সাগরদাঁড়িতে। তবে মায়ের দেখা পাননি তিনি। দাম্ভিক পিতার ধর্ম ও কুসংস্কার নাস্তিক ছেলেকে মায়ের সঙ্গে দেখা করতেই দেয়নি। তখন কবি চলে যান মামার বাড়ি পাইকগাছার কাঠিপাড়া গ্রামে। মামা বংশধর ঘোষের বাড়ি তিনি আপ্যায়ন পান। সেখান থেকে তিনি মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য কপোতাক্ষ নদের পাড়ে তাঁবুতে কয়েক দিন অপেক্ষাও করেন। তবে দেখা না পেয়ে আবার কোলকাতায় চলে যান। এরপর তিনি আর দেশেই ফেরেননি। যে ঘাট থেকে তিনি এ শেষ বিদায় নিয়েছেন তা আজও ইতিহাসের বিচারে বিদায় ঘাট নামে পরিচিত। কবির এই স্মৃতিবিজড়িত বিদায় ঘাট সংস্কারের মাধ্যমে বর্তমানে আধুনিকায়ন করা হয়েছে।

যাবেন কীভাবে

ঢাকা হতে সড়ক, রেলপথ কিংবা আকাশপথে যাওয়া যায় যশোর। ঢাকার গাবতলী,কল্যাণপুর এবং কলাবাগান থেকে গ্রিনলাইন পরিবহন, ঈগল পরিবহন, সোহাগ পরিবহন, শ্যামলী পরিবহনের এসি-ননএসি বাস যশোর যায়। ভাড়া ৭০০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে।

ঢাকা কমলাপুর থেকে সপ্তাহে শনিবার ছাড়া প্রতিদিন ভোর ৬টা ২০ মিনিটে আন্ত:নগর সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেন এবং সোমবার ছাড়া রোজ সন্ধ্যা ৭টায় আন্ত:নগর ট্রেন চিত্রা এক্সপ্রেস যশোরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভাড়া শোভন ৩৫০টাকা, শোভন চেয়ার ৪২০টাকা, প্রথম শ্রেণী চেয়ার এর ভাড়া ৫৬০টাকা, প্রথম শ্রেণী বার্থ ৮৪০টাকা। স্নিগ্ধা শ্রেণীর (এসি চেয়ার) ৭০০টাকা, এসি বার্থ পড়বে ১২৬০ টাকা। তবে ট্রেনে যেতে চাইলে বেনাপোল এক্সপ্রেসে যেতে পারেন। এটি ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন ও এয়ারপোর্ট স্টেশন থেকে যাওয়া যায়। এটি ঢাকা থেকে সরাসরি ঈশ্বরদী, চুয়াডাঙ্গা ও যশোর হয়ে বেনাপোল যায়।

এছাড়াও ঢাকা হতে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স, রিজেন্ট এয়ারলাইন্স ও নভো এয়ারের বিমান নিয়মিত যশোর চলাচল করে থাকে। যশোর বাস টার্মিনাল থেকে বাসে করে যেতে হবে কেশবপুর। ভাড়া পড়বে ৩৫ টাকা। সেখান থেকে ব্যাটারী চালিত রিক্সায় যেতে হবে সাগরদাঁড়িতে। ভাড়া ৭০ থেকে ১০০ টাকার মতো।

সময়সূচী

এপ্রিল হতে সেপ্টেম্বর-প্রতিদিন সকাল ১০টা হতে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এবং অক্টোবর হতে মার্চ প্রতিদিন সকাল ৯টা হতে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে মধুপল্লী। শুক্রবার সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত বিরতি থাকে। মধূপল্লীর সাপ্তাহিক ছুটি রবিবার। এছাড়াও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিন বন্ধ থাকে।

থাকবেন কোথায়

সাগরদাঁড়িতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের একটি মোটেল রয়েছে। ভাড়া ৬০০ হতে ১২০০ টাকা। এছাড়াও একদিনেই ভ্রমণ শেষ করতে পারলে ৪৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে আসতে পারেন যশোর জেলা শহরে। এই শহরেই রয়েছে ছোট-বড় অনেকগুলো আবাসিক হোটেল। যেখানে রাতযাপনটা হতে পারে আপনার জন্য আরামদায়ক।

প্রবেশ টিকেট মূল্য

মধুপল্লীতে প্রবেশমূল্য দেশী পর্যটক ১০ টাকা ও বিদেশী পর্যটকদের জন্য ১০০ টাকা। এছাড়াও পার্কিংয়ের জন্য বাস ১০০ টাকা, মাইক্রোবাস এবং জ্বীপ ২০ টাকা, মোটর সাইকেল ১০ টাকা।

তথ্যসূত্র: একুশে টেলিভিশন

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
Loading...