ইলিয়াস আলীর সন্ধ্যান এখনও মেলেনি ॥ দুই দিনের হরতালে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ধাওয়া পাল্টাধাওয়া অগ্নিসংযোগ ২ জনের প্রাণহানী

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর সন্ধ্যান এখনও পাওয়া যায়নি । এদিকে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ, নিহত-আহত ও আটক হওয়ার মধ্য দিয়ে গত দুইদিন সারাদেশে পালিত হয়েছে বিএনপির ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে বিএনপির ডাকা দ্বিতীয় দিনের হরতালে পুলিশসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনী ছিল কঠোর অবস্থানে। হরতালের আগের দিন ও প্রথম দিনের হরতালে ২ জন নিহত হয়েছে।

সিলেট ছাড়া অন্য কোথাও বড় ধরনের কোন গোলযোগের ঘটনা না ঘটলেও পিকেটারদের হামলায় সাভারে আবদুর রশিদ নামে এক গাড়িচালক নিহত হয়েছেন। পুলিশের বাধায় নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে রাস্তায় বের হতে পারেননি। আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর কঠোর নজরদারি এড়িয়ে মহানগরীর বিভিন্ন অলিগলিতে খণ্ড খণ্ড মিছিল করেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ১৫-২০টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান পিকেটাররা। ঢাকার বাইরেও অনেক জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ফকিরাপুলে একটি সিএনজিসহ সারাদেশে বেশ কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর লাঠিচার্জে রাজশাহীতে সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনুসহ সারাদেশে কয়েকশ’ নেতা-কর্মী আহন হয়েছেন। কুষ্টিয়া থেকে মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন, ঢাকার ওয়ারি থেকে কাজী আবুল বাশারসহ দুই শতাধিক নেতা-কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। ঈশ্বরদীতে দুই জন সাংবাদিক আহত হয়েছে। তারা হলেন সাপ্তাহিক হ্যালো ঈশ্বরদীর সুমার খান ও সাবেক প্রেসক্লাব সেক্রেটারী দৈনিক দিনকাল প্রতিনিধি ফজলুর রহমান। দোকান-পাট বন্ধ ছিল। অফিস-আদালত ঢিলেঢালাভাবে চলেছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের বেশির ভাগ শরিককে রাজপথে দেখা যায়নি। যদিও হরতালে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে মাঠে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা। তবে জোটের শরিক লেবার পার্টি মতিঝিলের ইডেন মসজিদ গলি থেকে সংগঠনের চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের করার চেষ্টা চালালে পুলিশি বাধায় তা পণ্ড হয়ে যায়। এ ছাড়া ন্যাপ মিছিলের চেষ্টা করে। হরতালে নির্দিষ্ট স্পটে কেন্দ্রীয় নেতাদের বেশির ভাগকেই দেখা যায়নি। তবে বিগত হরতালের চেয়ে মহানগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা কিছুটা সক্রিয় ছিলেন। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় তারা খণ্ড খণ্ড মিছিল করেন। রোববার ২২ এপ্রিল সকাল থেকেই বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অলিগলির সামনে অবস্থান নেয় পুলিশ ও র‌্যাব। বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করতেও দেখা যায়। হরতালের কারণে রাজধানীর রাস্তাঘাট ছিল ফাঁকা। অল্পসংখ্যক লোকাল বাস চলতে দেখা গেছে। ভিআইপিসহ বেশির ভাগ সড়কই ছিল রিকশার দখলে। আতংক থাকায় সাধারণ মানুষও জরুরি কাজ ছাড়া বের হননি। শপিং মলসহ দোকানপাট ছিল বন্ধ। রাজধানী থেকে দূরপাল্লার কোন বাস ছেড়ে যায়নি। তবে ট্রেন, লঞ্চ ও বিমান চলাচল ছিল স্বাভাবিক। সরকারি অফিস-আদালতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ছিল কম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকলেও কোন পরীক্ষা ও ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়নি। এদিকে রোববারের হরতালেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা রাজপথ দখলে রাখেন। পুলিশের পাহারায় বিভিন্ন স্থানে তারা হরতালবিরোধী মিছিল করেন।

কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল অবরুদ্ধ

বিগত হরতালের মতোই অবরুদ্ধ ছিল নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। শনিবার রাত থেকেই পুলিশ পুরো অফিস নিয়ন্ত্রণে নেয়। আশপাশের অলিগলির সামনে র‌্যাব-পুলিশ অবস্থান নেয়। দলীয় কোন নেতাকেই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। পথচারীরা তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। তল্লাশির নামে তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আশপাশের সরকারি-বেসরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হয়রানির শিকার হন। পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে পুলিশ। সাংবাদিকরাও পুলিশের হয়রানি থেকে রক্ষা পাননি। এদিকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন নেতা সকাল থেকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করার চেষ্টা চালালে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, পুলিশ ও সরকারদলীয় ক্যাডাররা হরতাল পালনে বাধা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে সরকার একটি যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করছে। কিছুক্ষণ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতে অবস্থানের পর তারা অফিসের ভেতরে অবস্থান করেন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, রিজভী আহমেদ, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক নাজিমউদ্দিন আলম, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, আবেদ রেজা, আশরাফ হোসেন, বেলাল আহমেদসহ হাতে গোনা কয়েকজন নেতা সারা দিন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থান করেন।

সংসদ ভবন এলাকা

স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার এমপির নেতৃত্বে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদ ভবন এলাকায় মিছিল করেন। মিছিলটি মানিক মিয়া এভিনিউর মূল সড়কে এলে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। ব্যারিকেড উপেক্ষা করে তারা মিছিল নিয়ে সামনে এগোতে থাকলে পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি হয়। মিছিল শেষে এক সমাবেশে ইলিয়াস আলীকে জীবিত ফেরত দেয়ার দাবি জানান তারা। এমকে আনোয়ার বলেন, এই যে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন এখানে কয়েকজন এমপি অথচ পুলিশ তার চেয়ে কয়েক গুণ। তিনি বলেন, প্রয়োজনে লাগাতার আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে। এ সময় আবুল খায়ের ভুঁইয়া, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, নিলোফার চৌধুরী মণি, রেহানা আক্তার রানু, সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়াসহ কয়েকজন সংসদস সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

মহাখালী

বিক্ষিপ্ত দু-একটি ঘটনা ছাড়া রাজধানীর মহাখালীতে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হরতাল পালিত হয়েছে। সকালের দিকে সড়কগুলো যানবাহনশূন্য থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সংখ্যায় কম হলেও দুপুরের পর অন্যান্য ছুটির দিনের মতোই যান চলাচল করতে দেখা যায়। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোন বাস ছাড়েনি। হোটেল-রেস্তোরাঁ খোলা থাকলেও অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। বেলা ১১টার দিকে মহাখালীর আমতলার মোড়ে জলখাবার হোটেলের সামনে একটি যাত্রীবাহী লেগুনায় পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পরে স্থানীয়রাই লেগুনাটির আগুন নিভিয়ে ফেলেন। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। তবে লেগুনায় আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘটনায় অফিসগামী মানুষ আতংকিত হয়ে পড়েন। এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন পথচারীরা। লেগুনায় আগুন দেয়ার অভিযোগে পুলিশ জুয়েল নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে।
আড়ংসহ এলাকার অধিকাংশ মার্কেট ও বড় দোকান বন্ধ ছিল। সারা দিনে এসব এলাকায় স্থানীয় বিএনপি কিংবা ১৮ দলীয় জোটের কোন শরিক দলের তৎপরতা দেখা যায়নি। তবে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীমের নেতৃত্বে শান্তিনগর থেকে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি শান্তিনগরের দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

ব্যাংক-বীমা

হরতালের প্রভাব পড়েছে ব্যাংক লেনদেনের ওপর । ব্যাংক-বীমা খোলা থাকলেও গ্রাহক উপস্থিতি ও লেনদেন কম হয়েছে। গ্রাহক উপস্থিতি না থাকায় কিছু কিছু ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টার বন্ধ রাখা হয়। জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ব্যাংকগুলোর লেনদেন হয়েছে একেবারে কম। অন্যান্য দিন ব্যাংকগুলোয় গ্রাহকের দীর্ঘ লাইন দেখা গেলেও গতকাল তা লক্ষ্য করা যায়নি। ব্যাংকে নারী গ্রাহকের উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ডাকা হরতালের কারণে রাজধানীর ব্যাংকপাড়ায় মানুষের কোন ভিড় কিংবা ব্যস্ততা ছিল না। এ দিন মতিঝিলে অন্য রকম এক চিত্র দেখা যায়। যারা মতিঝিলে এসেছিলেন তাদের মাঝে লক্ষ্য করা গেছে স্বস্তি।

আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর তৎপরতা

বিএনপির ডাকা রোববারের হরতালে আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। নিয়মিত টহলের বাইরে এবারের হরতালে পুলিশের ‘হোন্ডা টহল’ ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি থানা এলাকায় পুলিশ দিনভর দলবেঁধে ‘হোন্ডা টহল’ দিয়েছে। এর ফলে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ককটেলের বিস্ফোরণ ও দু-একটি যানবাহনে ভাংচুর ছাড়া বড় ধরনের অঘটন ঘটেনি- এমন দাবি পুলিশের।

হরতাল চলাকালে রাজধানীর আটটি জোনে ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালতি হয়। মতিঝিল, ওয়ারি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান, তেজগাঁও, রমনা এবং উত্তরা জোনে এসব ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হলেও প্রথম দিন কাওকে সাজা দেয়া হয়নি।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...