দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ রয়েছে উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করেছে

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ অবেশেষে দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করেছে।

গতকাল ৩০ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতু নির্মাণে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে বিশ্বব্যাংক। সেতু তৈরির জন্য ঠিকাদার বাছাই ও পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক তাদের চুক্তি বাতিল করল। এর আগের দিন ২৯ জুন পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয় বিশ্বব্যাংক।

এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক এক বিবৃতিতে বলেছে, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাংক কখনোই অন্ধ হয়ে থাকতে পারে না, থাকা উচিতও নয় এবং থাকবেও না। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির যে তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে বলা হয়েছিল। তারা ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণও দেয়। দুর্নীতির এই অভিযোগ পূর্ণাঙ্গভাবে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বিশ্বব্যাংক ভেবেছিল, বাংলাদেশ সরকার বিষয়টির প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এই প্রকল্পে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির ‘বিশ্বাসযোগ্য’ প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি করে বিশ্বব্যাংক বিবৃতিতে আরও বলেছে, দুই দফা তদন্তের মাধ্যমে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির কথা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়। তারা এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতেও সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অসন্তুষ্টির কথা উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংক জানায়, তারা এ ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে ও সরকারি প্রতিক্রিয়া জানার জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল শিগগিরই ঢাকা পাঠাবে।

পদ্মা সেতুর চুক্তি বাতিলের বিষয়ে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মন্তব্য করেছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত দুর্ভাগ্যজনক ও রহস্যজনক। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই বিশ্বব্যাংকের চুক্তি বাতিল আমাদের কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। তিনি বলেন, ওই প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণের আগেই চুক্তি বাতিল করা যুক্তিসঙ্গত নয়। অর্থমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তার এপিএস সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, আজ ১ জুলাই মন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন। অপরদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ সরকার আমলে নেয়নি। সরকার দুর্নীতির অভিযোগ আমলে না নিয়ে উল্টো বিশ্বব্যাংকের ওপর দোষ চাপিয়েছে। এ ধরনের আচরণের জন্যই বিশ্বব্যাংক তাদের চুক্তি বাতিল করেছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. বিনয় সেন বলেছেন, বিশ্বব্যাংক যখন দুর্নীতির অভিযোগ আনে, তখন বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় এনে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু যে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল, সেই মন্ত্রীকে আবার অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হল। এ কারণে আজকের এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান ও মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, চুক্তি বাতিল হলেও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ এখনও রয়েছে। দু’জনই মনে করেন, বিশ্বব্যাংকের মতো দাতা সংস্থাগুলোর অর্থায়নে সেতু নির্মাণে ব্যয় কম হবে। তারা মনে করেন, যদি এখনও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করা যায়, তাহলে অন্য যে কোন ব্যবস্থার চেয়ে ভালো হবে। মালয়েশিয়ার অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে আকবর আলি খান ও মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের মতে, এতে ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। যার দায় দেশের মানুষ ও সরকারকে বহন করতে হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণে বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তে কোন মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছেন, এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য না জানা পর্যন্ত আমি কোন মন্তব্য করব না।

উল্লেখ্য, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১১ সালের এপ্রিলে সরকারের সঙ্গে ঋণচুক্তি অনুযায়ী, সেতু তৈরিতে সম্ভাব্য মোট খরচ ২৯০ কোটি ডলারের মধ্যে ১২০ কোটি ডলার অর্থায়ন করার কথা বিশ্বব্যাংকের। এছাড়া এ প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৬১ কোটি, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ৪০ কোটি এবং ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ১৪ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার কথা। বাকি অর্থ বাংলাদেশ সরকারের জোগান দেয়ার কথা। ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণে এর আগে বিশ্বব্যাংকসহ ৫টি ঋণদাতা সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে সরকার।

কিন্তু সেতুর জন্য ঠিকাদার নিয়োগ ও পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে গত বছরের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন স্থগিত করলে বহু প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু প্রকল্প আটকে যায়। বিশ্বব্যাংক সরকারের কাছে লিখিতভাবে দুর্নীতির অভিযোগ আনে। তবে খোদ অর্থমন্ত্রীও গেল বছরের অক্টোবরে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়ে মন্তব্য করে বলেছিলেন, দুর্নীতির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থ সাহায্য বন্ধ রাখবে। সে সময় তিনি আরও বলেছিলেন, বিশ্বব্যাংকের কাছে এ প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে তারা তাকে জানিয়েছে। দুর্নীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি কথা বলবেন বলেও জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে কি বলেছেন বা সরকার কি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে বিষয়টি আর খোলাসা হয়নি। উল্টো সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের টানাপোড়েন চলাকালীন আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির এক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে আর বিশ্বব্যাংকের মুখাপেক্ষী থাকতে চাচ্ছে না সরকার। ২০১১ সালের ৩ ডিসেম্বর তিনি বলেছিলেন, এ সেতু নির্মাণের দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা টোল আদায়ের মাধ্যমে সেতু নির্মাণের টাকা তুলে নেবে। গেল বছরের ১০ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী আবারও পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেন, দাতা সংস্থার অর্থায়ন ছাড়াই পিপিপির অধীনে সেতু নির্মাণ করা হবে। দাতা সংস্থার অর্থের জন্য আর অপেক্ষা করা হবে না বলেও তিনি বলেন। বিশ্বব্যাংক প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থ ছাড়ই করল না, তাহলে সেখানে দুর্নীতি হল কিভাবে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংককে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে, পদ্মা সেতুতে কোথায় কখন কত টাকার দুর্নীতি হয়েছে। তবে এতে বিশ্বব্যাংক তার অবস্থান থেকে সরেনি। তারা বারবারই সরকারকে তাগাদা দিয়ে আসছিল। খবর একটি দৈনিকের।

এদিকে সরকার ২০১৩ সালের মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ করে তা যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণাও দিয়েছিল। সরকারের ঘোষণা ছিল, ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হবে। কিন্তু পরে তা পিছিয়ে আবারও বলা হয়, ২০১১ সালের জানুয়ারির মধ্যে কাজ শুরু হবে। কিন্তু সেই কথা কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। অথচ অর্থমন্ত্রী বেশ কয়েকবার বলেছেন, পদ্মা সেতু নিয়ে কোন দুর্নীতি হয়নি। একই সঙ্গে তিনি এও বলেছিলেন, সেতুর কাজ শেষ করতে না পারলেও শুরুটা করে দিয়ে যাবেন। কিন্তু সেই শুরু আদৌ কবে হবে, তা নিয়েই এখন আশংকা দেখা দিয়েছে। এ পর্যায়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মালয়েশিয়া সরকার পদ্মা সেতু প্রকল্পে পূর্ণ অর্থায়নসহ সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মালয়েশিয়া সফর করেন। তার সফরকালে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে পদ্মা সেতু নির্মাণে সমঝোতা স্মারক সই হয়। তবে সেতু নির্মাণে মালয়েশিয়া সরকার লাভ ও বিনিয়োগ তুলে নেয়াসহ ৭টি শর্ত জুড়ে দেয়। নির্মাণের পর ৫০ বছর এ সেতু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এবং মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে একটি খসড়া প্রস্তাব দেয়া হয়। ওই প্রস্তাব সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যোগাযোগমন্ত্রী। অপরদিকে মালয়েশিয়া ছাড়াও পদ্মা সেতু নির্মাণে চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা এখন পর্যন্ত কোন প্রস্তাব দেয়নি।

এদিকে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে এসএনসি লাভালিনকে পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের এক মন্ত্রীসহ সরকারি ও বেসরকারি বেশ কয়েকজন লোকের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবিরও অভিযোগ আনে। তারা বিষয়টি লিখিতভাবে দুদককে জানিয়ে তদন্তের অনুরোধ করে। দুদক থেকে এ নিয়ে তদন্ত শুরু হলে প্রভাবশালীরা নড়েচড়ে বসেন। দুদকও পড়ে বিপাকে। দুদক অফিসিয়ালি বিবৃতি দিয়ে বলেছে, বিশ্বব্যাংক তাদের কাছে যে চিঠি দিয়েছে, তাতে বেশ কয়েকজনের নাম রয়েছে। ওই অভিযোগের কপি দুদককেও সরবরাহ করে তদন্তের জন্য বলা হয়। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের সূত্র ধরে দুদক পদ্মা সেতুর দুর্নীতির তদন্ত শুরু করে গত বছরের অক্টোবরে। কিন্তু সেতুর জন্য ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগের সপক্ষে কোন ধরনের কাগজপত্র, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তথ্যাদি না পাওয়ার কথা বলে দুদক এই তদন্ত শেষ করে। একই সঙ্গে বিষয়টি নথিভুক্ত করে। এতে তদন্তের এই অংশ থেকে রেহাই পান দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ও বর্তমানে তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। তবে প্রকল্পের জন্য পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির তদন্ত এখনও অব্যাহত রয়েছে। এই তদন্তের অংশ হিসেবে মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনসহ অন্তত এক ডজন হাইপ্রোফাইলকে জিজ্ঞাসাবাদের তালিকা করে দুদক। দুদকের উপ-পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলির নেতৃত্বে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়টি তদন্ত করছে। তবে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে সেতুর অর্থায়নের বিষয়ে চুক্তি বাতিলের পর দুদকের তদন্ত চলবে নাকি থেমে যাবে- সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট হওয়া যায়নি।

বিশ্বব্যাংকের অনুরোধে কানাডিয়ান পুলিশ কানাডায় এসএনসি লাভালিনের কার্যালয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি তল্লাশি চালিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র জব্দ, এসএনসি লাভালিনের কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেনসহ ২ জনকে গ্রেফতার করে। তাদের বিরুদ্ধে কানাডিয়ান আদালতে বিচার চলছে।

এতসব ঘটনা ঘটলেও সরকার বিষয়টিকে এতোটা গুরুত্ব না দেওয়ার জন্যই এমন একটি ঘটনার উদ্ভব ঘটেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন, বিশ্বব্যাংক কিংবা বিদেশী কোন দাতা সংস্থা ছাড়া এতবড় প্রকল্প সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...