প্রসঙ্গ গার্মেন্টসে আগুন ॥ আত্মীয়রা নিকটে থেকেও বেওয়ারিশ দাফন!

এম. এইচ. সোহেল ॥ নিকট আত্মীয়রা রয়েছে একেবারেই নিকটে, তাররপও লাশ বিভৎস্য হয়ে পড়ায় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে ‘বেওয়ারিশ লাশ’ হিসেবে দাফন করা হচ্ছে এমন ঘটনা কতটা বেদনা দায়ক একবার ভাবুন?

বেওয়ারিশ কখন হয়, যখন তার কোন আত্মীয় স্বজনকে পাওয়া না যায়। আর ঠিক তখন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মতো প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দেওয়া হয় লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে সৎকারের জন্য। আমাদের দেশে বিশেষ করে নিখোঁজ হওয়া লাশগুলোর ক্ষেত্রে এমনটা প্রায়ই চোখে পড়ে। কারণ নিখোঁজ হওয়ার পর লাশ গুম করে মেরে ফেলা হয়। এবং অতিরিক্ত সময় পার হওয়ার কারণে অনেক সময় লাশ চেনা যায় না। আবার চেনা গেলেও নিকট আত্মীয় কেওই আসেন না লাশ শনাক্ত করতে যে কারণে সেগুলো বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামকে দেওয়া হয় দাফনের জন্য। অথচ গত দুদিন আগে আশুলিয়ায় ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আত্মীয়-স্বজনরা লাশের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। অনেকেই এমনও বলেছেন, ‘অন্তত লাশটি আমাদের দেওয়া হোক’, কিন্তু জীবন্ত মানুষগুলো এমনভাবে পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন যে, তা শনাক্ত করা সম্ভব নয়। কি হৃদয় বিদারক কাহিনী। মানুষের জীবনে এমন কঠিন সময় যেনো আর কখনও না আসে।

আগুন লাগতে পারে এটি একটি দুর্ঘটনা এটি সবাই স্বীকার করবো। কিন্তু নীচে আগুন লাগার পর উপরে ৫ বা ৬ তালা বা ছাদে গিয়ে সবাই বাঁচতে পারতেন। কিন্তু সেখানে তালা দেওয়া ছিল বলে কেও সেখানে যেতে পারেন নি। আগুনের লেলিহান শিখা চোখের সামনে দেখেও নিজেদের কেও রক্ষা করতে পারেননি। কতটা বিভৎস্য সে দৃশ্য একবার কল্পনা করে দেখুন।

মালিকরা কেনো সতর্ক হচ্ছেন না?

প্রায় প্রতিবছর এমন ধরনের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু তারপরও গার্মেন্টস মালিকরা কেনো সতর্ক হচ্ছেন না? এমন প্রশ্ন এখন সবার মনে। আশুলিয়ার গার্মেন্টস কারখানায় আগুন লাগার পর এমন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পোশাক শিল্প মালিক সমিতির এক নেতা ঘোষণা দেন প্রতিজন মৃত ব্যক্তির জন্য এক লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আমরা সবাই জানি প্রতিটি ফ্যাক্টরিতে ইন্সুরেন্স করা রয়েছে। আর এই ইন্সুরেন্স কি শুধুই মালিকের স্বার্থ দেখে? অর্থাৎ শুধুই কি পুড়ে যাওয়া কাপড়, আসবাবপত্র ও মেশিনের ক্ষতি পূরণ দেওয়া হয়? সেখানে আগুনে পুড়ে শত শত জীবন চলে গেলো তার কি কোন মূল্য নেই? যদি থেকে থাকে তাহলে কি সিস্টেমে করা হয়ে থাকে তার সঠিক ফিরিস্তি দিতে হবে। নাকি মালিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পর সেটি গোপন করে সেই অর্থই ক্ষতিগ্রস্থ শ্রমিকদের দিয়ে থাকেন? নিজেদের ক্ষতিপূরণের কথা বলে। এমন অনেক প্রশ্নের উদ্ভব ঘটেছে। জীবন গেলে সে জীবন আর কখনও ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু যেসব শ্রমিকরা কাজ করতে গিয়ে লাশ হচ্ছেন, তাদের পরিবার কিভাবে চলবে সে খবর আমরা ক’জনায় বা রাখি। একের পর এক ঘটনা ঘটছে তারপরও মালিকরা কেনো সতর্ক হচ্ছেন না বা কেনো অগ্নি নির্বাপনের বা প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা কেনো করছেন না সে প্রশ্ন আজ বড় করে দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলেন, মালিকরা সব সময় ইন্সুরেন্স কোম্পানি থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়ে থাকেন। যে কারণে তাদের তেমন একটা ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয় না। শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়ে মালিকরা যদি একটু ভাবতেন, তাহলে অবশ্যই অগ্নি নির্বাচনের বা প্রতিরোধের ব্যবস্থা তারা করতেন। এমনও দেখা গেছে, আগুন লাগার পর শ্রমিকরা দিক-বিদিক ছুটে বেড়াচ্ছে অথচ ভবন থেকে বের হওয়ার মূল গেটে তালা। কর্তৃপক্ষ আগুন লাগলে তালা খুলে দিলে অন্তত প্রাণগুলো বাঁচানো সম্ভব সেটিও করেন না। এবারের আশুলিয়ার গার্মেন্টসের ঘটনাও অনেকটা এরকম। কারণ আগুন লেগেছিল নীচ তালায়। বেশিরভাগ শ্রমিকরা মারা গেছে ৩য় তলায়। অথচ ৫ ও ৬ তলায় কোন আগুন যায়নি। কিন্তু সেখানকার ফ্লোরগুলো তালাবদ্ধ ছিল। তালা খোলা থাকলে ৬ তলায় বা ছাদে গিয়ে শ্রমিকরা অনায়াসে বাঁচতে পারতেন।

আমরা চাইনা আর কোন শ্রমিক এভাবে প্রাণ হারাক। আগুনের মতো দুর্ঘটনা যে কোন সময় ঘটতে পারে এটি যেমন আমরা শিকার করি তেমনি এই আগুন থেকে বাঁচার অনেকগুলো পথ রয়েছে। সেগুলো যদি আমরা অনুসরণ করি তাহলে অসময়ে এতো বিভৎস্য অবস্থায় কাওকে মৃত্যুবরণ করতে হবে না। আশা করি এবার অন্তত মালিকরা সচেতন হবেন এবং শ্রমিকদের রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। আর যেনো কাওকে এমন করুণ মৃত্যুর মুখোমুখি হতে না হয়।

২৭ নভেম্বর জাতীয় শোক ঘোষণা

আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানীর ঘটনা এবং চট্টগ্রামে ফ্লাইওভার ভেঙে প্রাণহানির ঘটনায় সরকার আগামীকাল ২৭ নভেম্বর জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে। এদিন দেশের সব সরকারি-আধা সরকারি কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। ছুটি থাকবে দেশের সব পোশাক কারখানায়। সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইয়া সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানান।

সচিব বলেন, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামে ঘটনায় মন্ত্রিসভায় শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে এবং নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামরা করা হয়েছে। জাতীয় শোক দিবস পালনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার পাশাপাশি মঙ্গলবার সারা দেশের সব ধর্মের উপসনালয়ে বিশেষ মুনাজাত ও প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হবে। দেশের সব কারখানায় মঙ্গল ছুটি থাকবে, তবে অন্যান্য অফিস আদালত খোলা থাকবে।

শনিবার আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তুবা গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানা তাজরিন ফ্যাশনসে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১২৪ জন নিহত হন। একই দিনে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার থেকে তিনটি কংক্রিটের গার্ডার ভেঙে পড়ে। এ ঘটনায় সোমবার পর্যন্ত ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। এই হতাহতের ঘটনায় যে জাতীয় শোক পালন করা হবে প্রধানমন্ত্রী তা রোববারই জানিয়েছিলেন।

রোববার সন্ধ্যায় গণভবনে এক অনুষ্ঠানে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আমি গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাচ্ছি।”

এই দুটি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল; ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ তহবিল এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তহবিল থেকে সহায়তা করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান।

Advertisements
Loading...