জিপিএ পদ্ধতি জাতিকে মেধাশূন্য করার কৌশল!

মোহাম্মদ কায়কোবাদ ॥ জিপিএ সিস্টেমের মাধ্যমে সারা দেশে যে গ্রেডিং স্ফীতি হচ্ছে, তা জাতিকে মেধাশূন্য করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলের যে বিশ্লেষণ প্রথম আলো পত্রিকায় বের হয়েছে, তাতে এই আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
JSC 2012
শিক্ষায় যেখানে পৃথিবীতে গড় বিনিয়োগ জিডিপির ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, সেখানে আমাদের হলো ২ দশমিক ২ শতাংশ। একটি পুরোনো পরিসংখ্যান বলে, বিজ্ঞান শিক্ষায় কোরিয়া মাথাপিছু ব্যয় করে ১৭৫ ডলার, মালয়েশিয়া ১৫৫ ডলার, ভারত ১৪ ডলার, পাকিস্তান ১০ ডলার এবং আমরা মাত্রই ৫ ডলার। অকস্মাৎ আমরা এই বিনিয়োগ বৃদ্ধি করব, তার সম্ভাবনা নেই। এমন দ্রম্নতগতিতে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করার পর এর বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধিই হতো যুক্তিযুক্ত, সম্ভবত তার বিপরীত ঘটনাটিই ঘটেছে। উন্নত দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভৌত অবকাঠামোর সঙ্গে আমাদের তুলনা চলে না, চলে না শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের মানের সঙ্গে, লাইব্রেরি কিংবা গবেষণাগারের মানেও।

তাহলে তাদের সঙ্গে আমাদের শিক্ষার মানের যে ব্যবধান, তা কমিয়ে আনার উপায় কী? উন্নত বিশ্বের সমকক্ষ কিংবা তাদের থেকেও তুলনামূলকভাবে শ্রেয়তর অবস্থানে আমরা আছি ছেলেমেয়েদের অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে, প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে টিকে থাকার গুণাবলিতে। আর এই অফুরন্ত প্রাণশক্তিকে জ্ঞানার্জনে, দক্ষতা অর্জনের কাজে যদি আমরা লাগিয়ে দিতে পারি, তাহলেই হবে আমাদের সফলতা। শিক্ষায় আমাদের এ রকম একটি পরিবেশ তৈরি করা দরকার, যাতে ছাত্ররা জ্ঞান ও দক্ষতায় উৎকর্ষ অর্জনে নিজেদের নিবেদিত করবে। যেকোনো বিষয়ে উৎকর্ষ অর্জনের চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। নোবেল পুরস্কারের মতো লোভনীয় পুরস্কার না থাকলে হয়তো এতজন মানবসন্তান এমন মাপের জ্ঞানতাপস হিসেবে আবির্ভূত হতেন না। সুতরাং, সাধারণ মানুষকে অসাধারণ করতে হলে লোভনীয় কিছু থাকতে হবে। অন্য সব বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য নানা ধরনের আকর্ষণীয় পুরস্কার রয়েছে, শুধু শিক্ষায় নেই। পৃথিবীর ভূখ-ের এক-সহস্রাংশজুড়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর ২৪ সহস্রাংশ মানুষের অন্ন-বাসস্থান-চিকিৎসার ব্যবস্থা করে থাকে, তা-ও আবার অত্যন্ত সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে। কেবল মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যাকে শিক্ষা ও দক্ষতা দিয়ে জনসম্পদে পরিণত এবং জ্ঞান ও বিজ্ঞানপ্রযুক্তির সাহায্যে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতই একবিংশ শতাব্দীর প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে টিকে থাকার চাবিকাঠি।

যখন প্রথম জিপিএ সিস্টেম প্রবর্তিত হয়েছিল, তখন কয়েকজন মাত্র জিপিএ-৫ পেত। সময়ের সঙ্গে পালস্না দিয়ে এখন জিপিএ-৫-এর সংখ্যা এসএসসি লেভেলে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭০ হাজারেরও বেশি। এবার কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রায় ৪৫ হাজার জিপিএ-৫ অংশগ্রহণ করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে জিপিএ-৫-এর স্ফীতি ঘটেছে। এই স্ফীতি দিয়ে সম্ভবত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিক্ষায় সফলতা দেখাতে চেয়েছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে এই সফলতা যে ভঙ্গুর, টেকসই নয়, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এই পরিসংখ্যান প্রকাশের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

আশা করি, আমাদের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও এমনিভাবে পরিসংখ্যান প্রকাশ করে আমাদের মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়ালেখায় মেধাশূন্যতার আগ্রাসনের চিত্রটি পরিষ্কার করে দেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক, খ ও গ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনকারীদের ২০১০, ১১ ও ১২ সালে অনুত্তীর্ণের হার যথাক্রমে ৫২, ৫৩ ও ৫৫ শতাংশ। মনে রাখতে হবে, জিপিএ-৫ পেতে হলে জ্ঞানের যে উৎকর্ষের প্রয়োজন পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ভর্তির সময় খলনায়ক কোচিং সেন্টারগুলোর সুবাদে তাদের দক্ষতা কিন্তু অনেক বৃদ্ধি পায় এবং তারপর আমাদের সর্বোচ্চ গ্রেডপ্রাপ্তদের ৫৫ শতাংশ ফেল।

আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড কিংবা ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে আমাদের ছাত্ররা যে কঠিন সব সমস্যা সমাধান করতে পারে, তার কারণ কিন্তু তাদের ওই চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করানো হয়েছে বলেই। আমাদের পাবলিক পরীক্ষাগুলো ছাত্রদের এ রকম চ্যালেঞ্জ দিতে পারছে না, যার কারণে পাবলিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ গ্রেড পেয়ে কোচিং সেন্টারের এত চেষ্টার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ৫৫ শতাংশ ফেল। তরুণদের চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করাতে হবে, তাদের শেখানোরও প্রয়োজন নেই। তারা নিজেদের পথ নিজেরাই বের করে নেবে। উৎকর্ষ অর্জনের জন্য শুধু একটি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা তা-ও পারছি না। একসময় আমাদের দেশে এসএসসি ও এইচএসসি লেভেলে ১০ বা ২০ জনের মেধাতালিকা খবরের কাগজে ছাপানো হতো। সেই মেধাতালিকায় স্থান করে নেওয়ার জন্য রাষ্ট্র কিংবা পরিবারের কোনো অতিরিক্ত সম্পদ বিনিয়োগ ছাড়াই নিজেদের সব মেধা, শক্তি ও সময় নিয়োজিত করত ওই মেধাতালিকায় নিজের নামটি দেখার জন্য। এক-দুজন নয়, প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ ছাত্ররাই ওই স্বপ্ন দেখত, রাতের ঘুম হারাম করে জ্ঞানার্জনে নিজেদের নিবেদিত করত।

উন্নত দেশে গ্রেডিং সিস্টেম প্রচলিত, তাই দেখে আমরা গ্রেডিং সিস্টেম চালু করলেই উন্নত হয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সহকর্মীর সঙ্গে আলাপ করে জেনেছি, এখন আমরা ক্রমশ দুর্বলভাবে প্রস্তুত ছাত্রদের পাচ্ছি। আমাকে একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান জানালেন, এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বের হলেই তাঁর ভালো ছাত্রদের মন খারাপ হয়ে যায়। কারণ, তারা ওই স্কুলের প্রতিষ্ঠিত দুর্বল ছাত্রদের সঙ্গে একই গ্রেড পেয়ে থাকে। স্কুল যাদের পরীক্ষায় পাঠাতে নারাজ, তারাও জিপিএ-৫ পাচ্ছে এবং শিক্ষকেরা অভিভাবকদের রোষানলে পড়ছে।

ইদানীং একটি কথা চালু হয়েছে, তা হলো, ছাত্ররা ফেল করবে কেন? এটা মাত্রাতিরিক্ত পারফেকশনিজমের কথা। আমরা আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে পারছি না, যোগ্যসংখ্যক শিক্ষক দিতে পারছি না, তারপর আবার আশা করি সবাই পাস করবে। সবাই পাস করলে শিক্ষার গুণগত মান কখনোই বৃদ্ধি পাবে না। সবাই পাস করলে তো পরীক্ষা নেওয়ারও প্রয়োজন নেই। অস্ট্রেলিয়ায় স্কুলে পরীক্ষার সিস্টেম উঠিয়ে দিয়ে কেবল দশম শ্রেণীতে পরীক্ষা নেওয়া হলো। তখন দেখা গেল, মাত্র ১০ শতাংশ পাস করেছে। উৎকর্ষ অর্জনের জন্য চাপ থাকতেই হবে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য, তা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। শিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জনের জন্য যে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন, আমরা কবে তা করতে পারব, তার নিশ্চয়তা নেই। সুতরাং, এখানে উৎকর্ষ অর্জন করতে হলে নানা লোভনীয় প্রতিযোগিতা দাঁড় করানো প্রয়োজন। সর্বোচ্চ গ্রেড পেতে হলে যাতে করে ছাত্রদের জ্ঞান ও দক্ষতা অনেক বেশি প্রয়োজন হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার।

আমার মনে হয়, পাবলিক পরীক্ষায় যেভাবে গ্রেডিং সিস্টেম প্রবর্তন করা হয়েছে, তা আমাদের দেশে শিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জনের সহায়ক নয়। নীতিনির্ধারকসহ শিক্ষাসংশিস্নষ্ট সবাইকে নিয়ে এই অভিশাপ থেকে বের হয়ে আসার পদ্ধতি আবিষ্কার করতে হবে। আমাদের ছাত্রদের হঠাৎ করে ভালো শিক্ষক আমরা দিতে পারব না। ভালো পাঠ্যপুস্তক দেওয়ার জন্য তৎপর হওয়া উচিত। উন্নত যেকোনো দেশের একটি পাঠ্যপুস্তক দেখলেই বোঝা যাবে পাঠ্যপুস্তক কী রকম হওয়া প্রয়োজন, যা ১৫-২০ লাখ ছাত্র পড়বে। আমাদের অত্যন্ত সুন্দর প্রশ্ন তৈরি করা উচিত, যা নিয়ে সারা বছর গবেষণা করা যেতে পারে এবং যা করলে আর সম্ভবত কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধেও আমাদের যুদ্ধে নামতে হবে না। বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি ছাত্রদের অনাগ্রহ দেশের জন্য অশনিসংকেত। এর পরিবর্তনের জন্য দেশকে কথায় নয়, কাজে উৎপাদনমুখী হতে হবে। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের জ্ঞানবিজ্ঞানপ্রযুক্তির দক্ষতায় বলীয়ান হতে হবে, দক্ষতা হতে হবে বিশ্বমানের। সেই দক্ষতা তৈরির জন্য স্কুল থেকেই ছাত্রদের সামনে চ্যালেঞ্জ দাঁড় করাতে হবে। এ রকম একটি শিক্ষাব্যবস্থাই আমাদের দেশকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে, এই প্রত্যাশায় রইলাম। সৌজন্যে : বাংলাদেশ নিউজ২৪।

# মোহাম্মদ কায়কোবাদ : অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস

Advertisements
Loading...