আজ সেই ভয়াল দিন ॥ পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস আজ

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ স্মরণকালের ঘটে যাওয়া সেই ভয়াল ঘটনার দিন আজ। পিলখানা ট্রাজেডির চার বছর পূর্তি হচ্ছে আজ। বিদ্রোহের নামে ২০০৯ সালের এদিনে কতিপয় বিডিআর সদস্য পিলখানায় পৈশাচিক কায়দায় ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেদিন পিলখানায় যে তাণ্ডব চলেছিল পৃথিবীর কোন সুশৃঙ্খল বাহিনীর ইতিহাসে সেটা বিরল। জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধাভরে তাঁদের স্মরণ করছে।
Pilkhana-09
বিদ্রোহী নামধারী জওয়ান সদস্যদের হাত থেকে সেদিন বিজিবির তৎকালীন (বিডিআর) মহাপরিচালকের স্ত্রী, তার বাসার কাজের মেয়ে, রিকশাচালক, সবজি বিক্রেতা, ছাত্রসহ সাধারণ মানুষও রক্ষা পাননি। ল্যান্সনায়েক ইকরাম, সিপাহি সেলিম রেজা, কাজল আলী, বাছেদ ও শামীম আল মামুন জুয়েলসহ বিডিআরের কিছু সংখ্যক বিপথগামী ঘাতকের হিংস্র তাণ্ডবে সেদিন ৫৭ সেনা পরিবারসহ শতাধিক পরিবার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিডিআরের হাজার হাজার পরিবার। নির্মম এ ঘটনার বিচার, সংশিস্নষ্টদের সাহায্য-সহযোগিতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর নানা চেষ্টার পরও স্বজনহারাদের কান্না থামেনি আজও। তবে আশার কথা হচ্ছে- নির্মম ও নৃশংস এ হত্যাযজ্ঞের বিচার চলতি বছরেই শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা জোরের সঙ্গে বলছেন, চলতি বছরেই শেষ হবে পিলখানা হত্যা মামলার বিচার। সূত্র জানায়, পিলখানা ট্র্যাজেডি ঘটে যাওয়ার পরে প্রথমে কোতোয়ালি থানায় ও পরে নিউ মার্কেট থানায় সদর ব্যাটালিয়নের ডিএডি তৌহিদুল আলমসহ ৬ জনের নাম উলেস্নখ করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। এছাড়াও বাহিনীর নিজস্ব আইনে পিলখানাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫৭টি বিদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় ৬ হাজারেরও বেশি বিডিআর সদস্যকে আসামি করা হয়।
2009-03-01__front02
গত বছরের ২০শে অক্টোবর সদর রাইফেল ব্যাটালিয়নের ৭২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়ার মধ্য দিয়ে ৫৭টি বিদ্রোহের মামলার নিষ্পত্তি হয়। তবে ২০১১ সালের ৫ই জানুয়ারি পুরান ঢাকা আলিয়া মাদরাসা মাঠসংলগ্ন অস্থায়ী ঢাকা মহানগর জজ আদালতে হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হলেও অদ্যাবধি এ বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। ৫৭টি বিদ্রোহ মামলায় বিডিআরের নিজস্ব আইনে গঠিত বিশেষ আদালতে ৫৯২৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ সাজা দেয়া হয় ৮৭০ জনকে। একই সঙ্গে সকল সাজাপ্রাপ্তকে ১০০ টাকা করে জরিমানা ও চাকরিচ্যুত করা হয়। এসব মামলা থেকে বেকসুর খালাস পান ১১৫ জন বিডিআর সদস্য। খালাসপ্রাপ্ত সকল বিডিআর সদস্যই বর্তমানে বিজিবিতে (সাবেক বিডিআর) চাকরি ফিরে পেয়েছেন। হত্যা মামলায় সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সিআইডির প্রায় ৪০ সদস্য তদন্ত কাজে তাকে সহায়তা করেন। তদন্তের পর হত্যা মামলায় ২৩ বেসামরিক ব্যক্তিসহ প্রথমে ৮২৪ জনের বিরুদ্ধে ও পরে সম্পূরক চার্জশিটে আরও ২৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। বেসামরিক ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু, বিএনপির স্থানীয় নেত্রী সুরাইয়া বেগম ও আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক বিডিআর সদস্য তোরাব আলীও রয়েছেন। এ মামলার ২০ আসামি এখনও পলাতক রয়েছেন। অপরদিকে হত্যা মামলার সঙ্গে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাটিও চলছে একই আদালতে। এ মামলায় প্রথমে ৮০৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়। পরে আরও ২৬ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়ায় এ মামলায় মোট আসামি দাঁড়ায় ৮৩৪ জনে। এদের মধ্যে মারা গেছেন তিনজন। বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ জানিয়েছেন, বিডিআর বিদ্রোহ ও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মতো কলঙ্কজনক অধ্যায়কে পেছনে রেখেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আর আইন অনুযায়ী পিলখানা হত্যা মামলার আসামিদের বিচার হবে। এক্ষেত্রে বিচার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে শেষ করতে বিজিবির পক্ষ থেকে আদালতকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান প্রসিকিউটর এডভোকেট আনিসুল হক বলেন, হত্যা মামলার বিচার কবে নাগাদ শেষ হবে- এখনই সেটা নিশ্চিত কওে বলার সময় হয়নি। তবে বিচার কার্যক্রম চলতি বছরই শেষ করার চেষ্টা চলছে। রাষ্ট্রপক্ষের আরেক প্রসিকিউটর এডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, হত্যা মামলাটি এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী মাসে মামলার তদন- কর্মকর্তার সাক্ষ্য নেয়ার মাধ্যমে সাক্ষ্য পর্ব শেষ করা সম্ভব হবে। এ হিসাবে চলতি বছরই শেষ করা যাবে হত্যা মামলার বিচার।
ch_sakhi
প্রসিকিউটর এডভোকেট শেখ বাহারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, পিলখানা হত্যা মামলায় চার্জশিটে সাক্ষীর সংখ্যা ছিল ১২০০ বেশি। তাদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপক্ষ এরই মধ্যে ৫৬২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য সম্পন্ন করেছেন। কিছু দিনের মধ্যে আরও কয়েক জনের সাক্ষ্য নিয়ে সাক্ষ্য পর্ব শেষ করা হবে। এরই মধ্যে এ মামলায় ভিআইপি সাক্ষী হিসেবে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম, হুইপ মির্জা আজম এমপি, নৌবাহিনী প্রধান, সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান, সাবেক আইজিপিসহ অনেক সেনাকর্মকর্তা সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ মামলায় ভিআইপি সাক্ষী হিসেবে বাকি রয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী (সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সাহারা খাতুন, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এমপি, সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ। তবে সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমদ সাক্ষ্য দিচ্ছেন না বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেছেন, পিলখানা হত্যা মামলা যত তাড়াতাড়ি শেষ হবে ততই ভাল। কারণ, রাষ্ট্রপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে অহেতুক সাক্ষী এনেছেন। আসামিপক্ষের অপর দুই আইনজীবী শামীম সরদার ও ফারুক আহমেদও বলেন একই কথা। তবে তারা এ-ও বলেন, রাজনৈতিক অসি’রতার কারণে মামলার কার্যক্রম বিলম্বিতও হতে পারে।

মিলাদ মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি

দিবসটি পালনের অংশ হিসেবে আজ পিলখানায় নিহতদের জন্য বিজিবির পক্ষ থেকে দোয়া, মিলাদ মাহফিল, কবরে ফুল দেয়ার মতো কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনও নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহম্মদ মোহসিন রেজা জানান, পিলখানা হত্যাযজ্ঞ দিবসে পিলখানাসহ বিজিবির সকল রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান, ইউনিট ও বিওপি পর্যায়ে আজ বাদ ফজর পবিত্র কোরআন খতম, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস’াপনায় সকাল ১০টায় বনানী সামরিক কবরস’ানে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী (একত্রে), তিন বাহিনীর প্রধানগণ (সম্মিলিতভাবে), স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক (একত্রে) শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। আগামীকাল মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৪টায় পিলখানার বীর উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে শহীদ ব্যক্তিবর্গের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, বিজিবি মহাপরিচালক, শহীদ ব্যক্তিবর্গের নিকটাত্মীয়রা, পিলখানায় কর্মরত সকল অফিসার, জেসিও, অন্যান্য পদবির সৈনিক এবং বেসামরিক কর্মচারীরা অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।

Advertisements
Loading...