The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

চল্লিশ বছর ধরে দিগম্বর আছেন এমন এক ব্যক্তির গল্প!

কেনো তিনি উলঙ্গ থাকেন? এর কারণ কী?

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ এক ব্যক্তি যাকে অনেকেই রাজাও বলেন তিনি সব সময় থাকেন দিগম্বর (উলঙ্গ)। আজ আপনাদের জন্য রয়েছে এমনই এক ব্যক্তির গল্প। কেনো তিনি দিগম্বর থাকেন?

চল্লিশ বছর ধরে দিগম্বর আছেন এমন এক ব্যক্তির গল্প! 1

অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে সম্প্রতি এক ব্যক্তির ছবি ও খবর ভাইরাল। কারণ হলো ওই ব্যক্তি সব সময় থাকেন উলঙ্গ। কিন্তু কেনো তিনি উলঙ্গ থাকেন? এর কারণ কী? সে বিষয়গুলোও উঠে এসেছে সংবাদ মাধ্যমে।

ওই উলঙ্গ রাজার সন্ধান মিলেছে ভারতের কোচবিহারে। তার নাম সুবল বর্মন। বয়স চল্লিশের মতো। কোচবিহারের চান্দামারি পঞ্চায়েতের রাজাপুরে সুবল বর্মনের বাড়ি। এলাকার সকলেই তাকে ‘উলঙ্গ সুবল’ বলেই ডাকে। অনেকেই তাকে বলেন, ‘উলঙ্গ রাজা’। কোলকাতার সংবাদ প্রতিদিন পত্রিকায় সুবল বর্মনের একটি সাক্ষাৎকারও প্রকাশ পেয়েছে।

জানা যায়, জন্মের পর হতে এই চল্লিশ বছর পর্যন্ত শরীরে এক টুকরো সুতো ওঠেনি সুবল বর্মনের। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা দিন-রাত সব সময় উলঙ্গ থাকেন সুবল। গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে এখন এসবই স্বাভাবিক। উলঙ্গ অবস্থাতেই কাজে যান সুবল বর্মন; বাজার করেন। আবার কখনও বাইকে ছুটে বেড়ান। কখনও কখনও তিনি সাইকেল চালান। চা দোকানেও আড্ডা দেন সমাজের পাঁচজনের মতোই। এখন আর কেও তাকে নিয়ে কৌতুক করে না।

স্থানীয়রা এক সময় জামা-প্যান্টে অভ্যস্ত করার জন্য কম চেষ্টা করেননি। তবে দীর্ঘ চেষ্টার পর এক সময় সুবলের জেদের কাছে হার মানতেও হয়েছে প্রত্যেককে। কেনো এমনটা করেন তিনি? সুবল নিজেই জানিয়েছেন, ছোটবেলা হতেই শরীরে সুতোর কিছু সহ্য হতো না তার। তিনি নাকি অনেক চেষ্টাও করেছেন। জামা-প্যান্ট পরলে নাকি তার কাঁপিয়ে জ্বর আসে! তাই হাল ছেড়ে দিয়ে ঠিক করেছেন উলঙ্গই থাকবেন। এখন অভ্যাসে এটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শুধুই কি জামা-প্যাণ্ট! তার বিছানাতেও নেই কোনো চাদর। তক্তার উপরে পলিথিন পাতা থাকে। রাতে বালিশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন ঠিক ওভাবেই। মাঘের শীতে যখন প্রত্যেকে কাবু হয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে; জ্যাকেট, সোয়েটার, চাদরেও কাজ হয় না যখন, তখনও সুবল দিব্যি উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়ান প্রকাশ্যে! চাদর, কম্বল কিছুই দরকার হয় না এই ‌উলঙ্গ রাজার!

তাকে প্রশ্ন করা হয়, কষ্ট হয় না? সেই প্রশ্ন শুনে হাসেন সুবল। বলেন, “সবই অভ্যাস বুঝলেন! আমার কোনও সমস্যাই হয় না। অনেকেই অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। আমি লজ্জা পাই না। কারণ এভাবেই তো জন্মেছি। ” তবে দুঃখ নেহাতই কম নেই। উলঙ্গ থাকার জন্য কখনও স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। বড় হয়ে বয়স্ক শিক্ষার ‘নাইট স্কুলে’ কয়েকদিন গিয়েছেন। সেখানেই সামান্য শিখেছেন। ইংরেজি, বাংলা লিখতে এবং পড়তে পারেন। নিজে লেখাপড়া করতে পারেননি এই খেদ মেটাতে পড়শি এক ছেলের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। সন্তানসম সেই গোকুল বর্মন এবার মাধ্যমিক পাস করেছে। তিনি অনেক দূর পড়াতে চান গোকুলকে। সুবল বলেছেন, “আমার পড়ালেখা হয়নি। এই ছেলেটার সমস্ত স্বপ্ন আমি পূরণ করবো। ”

সামান্য কিছু জমি রয়েছে সুবলের। আগে কলমিস্ত্রির কাজ করতেন তিনি। উলঙ্গ অবস্থায় কতো বাড়িতে তিনি কলের কাজ করেছেন। কতো জমিতে শ্যালো বসিয়েছেন তার হিসাব নেই। কেও তাকে ঘিরে কোনো হইচই করেনি; এমনকী মহিলারাও নয়। এখন কল মিস্ত্রির কাজ ছেড়ে চান্দামারি মাছ বাজারের পিছনে একটি স্টল নিয়ে রান্নার গ্যাস ও ওভেন ভাড়ার দোকান খুলেছেন সুবল বর্মন। দিনের বেশি সময় তিনি দোকানেই থাকেন। কখনওবা খেতে সবজি চাষের কাজ করেন।

সুবল জানিয়েছেন, এবার আট বিঘা জমির মধ্যে ৬ বিঘাতে পাট, পটল ও কচু চাষ করেছেন। মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবা লক্ষ্মীকান্ত বর্মনকে হারান সুবল। মা রাজোবালাদেবী প্রয়াত হয়েছেন ১৬ বছর বয়সে। এরপর থেকে সে একা। বাড়িতে নিজেই দু’বেলা রান্না করেন। যেদিন শরীর ভালো থাকে না পড়শিদের বাজার করে দেন। ওরাই খাবারের ব্যবস্থা করে দেয়। বিয়ে করেননি কেনো? প্রশ্ন শুনে হোহো করে হাসিতে ফেটে পড়েন বছর চল্লিশের যুবক সুবল বর্মন। বলেন, “এই ন্যাংটো রাজাকে কেইবা মেয়ে দেবে বলুন তো? তাছাড়া বিয়ের পরে অনেক দায়িত্ব থেকে যায়। ওসব আমার পক্ষে পালন করা সম্ভব হবে না। তাই ঠিক করেছি একাই জীবন কাটিয়ে দেবো।” বৃদ্ধ হলে আপনি কী করবেন? তার কথায়, “কেনো পড়শি ও বন্ধুরা তো আছেই। তাই আমি ভয় করি না। ”

সুবল জানালেন, ছেলেবেলার নিজের হাডুডু খেলার দল ছিল। অনেক জায়গায় খেলতে গিয়ে চ্যাম্পিয়নও হয়েছেন। আরও ছিল কুষাণ গানের দল। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে গান গেয়ে বেড়াতেন। আজও সেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মজে অবসর সময় কাটান। কখনও শহরে যান না? এবার কিছুটা অবাক হলেন এই উলঙ্গ রাজা। উল্টে প্রশ্ন করলেন, “কেনো যাবো না?” আপনাকে দেখে কেও কিছু বলে না? সাবলীল উত্তর, “শহরের লোকজনের এতো সময় নেই যে আমাকে নিয়ে পড়ে থাকবে। আমি অনেক সময় দোকানের মালপত্র আনতে যাই। কাজ সেরে আবার ফিরে আসি। কোনো সমস্যা হয় না। তাছাড়াও শালবাড়ি, মোরোঙ্গাবাড়ি, গোসানিবাড়ি এলাকায় আত্মীয়দের বাড়িতেও যাই। ”

সুবল বর্মনের এক বন্ধু সন্তোষ দাস বলেছেন, এক সময় জামা-প্যান্ট পরানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। কম অত্যাচার চলেনি তার ওপর। নিরুপায় হয়ে তিনদিন নদীতে লুকিয়ে ছিল সুবল। প্রতিবেশী নৃপেন বর্মনের মতে, “সুবল আসলে শিশুর মতো।” সুমিত্র বর্মন, অনিমা বর্মনের মতো বধূরা বলেছেন, বিয়ের পর বাড়ির পাশে উলঙ্গ ছেলেকে দেখে প্রথম প্রথম বেশ অস্বস্তি হতো। লজ্জা লাগতো। এখন কোনওই সমস্যা হয় না। আর দশজনের মতোই ওকে মনে হয় এখন। এক কথায় এখন আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই চলাফেরা করেন সুবল বর্মন বা উলঙ্গ রাজা।

Loading...