এক অমানবিক ঘটনা: কোটিপতি সন্তানদের ‘বাবার লাশ আঞ্জুমানে’!

ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হয় ওইসব মানুষ নামের অমানুষদের

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ কোটিপতি সন্তানদের বাবাকে যদি বেওয়ারিশ লাশ হতে হয় তাহলে পৃথিবীতে মানবিকতা শব্দটির কোনো অর্থই থাকে না। পৃথিবীতে প্রতিদিন কতো রকম ঘটনা ঘটছে তা হয়তো আমাদের জানা নেই। কিন্তু দু’একটি ঘটনা আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেয়। আজকের এই ঘটনাটিও ঠিক তেমনই হৃদয় নাড়া দেওয়ার মতো ঘটনা। এই ঘটনাটি পড়ে পাঠকদের জন্য না লিখে পারলাম না।

কতো বিচিত্র এই পৃথিবী। এমন ঘটনাও আমাদের লিখতে হয়। আবার এমন ঘটনাও আমাদের পড়তে হয়। ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হয় ওইসব মানুষ নামের অমানুষদের। যে বাবার ঘটনা বলবো একদিন এই বাবা ছিলেন কোটিপতি। তিনিই সন্তানদের করেছেন প্রতিষ্ঠিত। লিখে দিয়েছেন তাদের নামে বাড়ি গাড়ি সবকিছু। তারপর একদিন বুঝতে পারেন সেই বাবা, সন্তানদের কাছে তিনি এক ‘জঞ্জাল’ হয়ে উঠছেন। এমন একটা সময় আসে যখন সন্তানরাই তাকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেন! এক পর্যায়ে ধুঁকে ধুঁকে সেই বাবার মৃত্যু ঘটে। লাশ নেওয়ার জন্য সন্তানকে খবর দেওয়া হলে ‘জরুরি মিটিংয়ে আছেন’ বলে লাশটি আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে দিয়ে দিতে বলে দেন তারই সন্তান!

একটি সত্য গল্প সবার সঙ্গে শেয়ার করেছেন রিজেন্ট হাসপাতাল এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহেদ। গত সোমবার রাত ১০টায় তিনি তার ফেসবুকে লেখেন যে- ‘একটি সত্য ঘটনা, সবাইকে পড়ার অনুরোধ রইলো।’

মোহাম্মদ শাহেদের সেই স্ট্যাটাসটিতে কী ছিল? আসুন জেনে নিই:

‘লোকটির নাম হামিদ সরকার। তিনি ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর গ্রামের বাড়ি জামালপুরে। আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় সূত্রটা পরেই বলছি।

আমি যখন উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালের প্রথম শাখাটি উদ্বোধন করি, তখন উত্তরা পশ্চিম থানার তৎকালীন ওসি ও মসজিদের ইমাম সাহেব আমার কাছে আসেন। তারা বলেন যে, একজন লোক অনেকদিন ধরে মসজিদের বাইরে পড়ে আছে। অনেকেই ভিক্ষুক ভেবে তাকে দু-চারটি টাকা ভিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।

ইমাম সাহেব নিজে তার জন্য প্রেরিত খাবার থেকে কিছু অংশ লোকটিকে দিয়ে আসছেন। হঠাৎই লোকটি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তারা আমার সরনাপন্ন হয়েছেন। এমতাবস্থায় আমি লোকটিকে আমার হাসপাতালে নিয়ে এসে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। দায়িত্বরত ডাক্তার ও অন্যান্য সকল কর্মকর্তা/কর্মচারীকে অবগত করি যে, এই লোকটির চিকিৎসার সকল দায়ভার আমার এবং এর চিকিৎসায় যেনো কোনো ত্রুটি না হয়।

হামিদ সরকার নামক লোকটির সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে আমি রীতিমত অবাক হয়ে গেলাম। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত জোনাল সেটেলম্যান্ট অফিসার। তার ৩ ছেলের মধ্যে ৩ জনই বিত্তশালী। উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে তার নিজস্ব বাড়ি রয়েছে যা ছেলেদের নামে দিয়েছেন। তার বড় ছেলে একজন ডাক্তার। নিজস্ব ফ্ল্যাটে স্ত্রী, শালী ও শ্বাশুড়ী নিয়ে থাকেন, অথচ বৃদ্ধ বাবার জায়গা নেই সেখানে।

মেঝো ছেলে ব্যবসায়ী, তারও নিজস্ব বিশাল ফ্ল্যাট রয়েছে। যেখানে প্রায়ই বাইরের ব্যবসায়ীক অতিথীদের নিয়ে পার্টি করা হয়। অথচ তার বাবা না খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে। ছোট ছেলেও বেশ অবস্থাসম্পন্ন। তবে স্ত্রীকে সন্তুষ্টি করার জন্য বাবাকে নিজের ফ্ল্যাটে রাখতে পারেন না। সকল সন্তান স্বাবলম্বী হওয়া স্বত্তেও বাবার স্থান হয়েছে কিনা মসজিদের বারান্দায়! সবশেষে সেখান থেকে আমার হাসপাতালে।

প্রসঙ্গত, আমার হাসপাতালে আগত রোগীর ক্ষেত্রে রক্তের প্রয়োজন হলে আমি নিজে রক্ত দেবার চেষ্টা করি। সেদিনও হামিদ সরকার নামক অসুস্থ লোকটিকে আমি রক্ত দিয়েছিলাম। অবাক করার বিষয় হলো, তিনি দিন ১৫ আমার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও কোনো একটা ছেলে পনের মিনিটের জন্যও তার খোঁজ নেননি!

আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, সর্বোচ্চ চেষ্টার পরেও পনের দিন পর আরও একটা কার্ডিয়াক অ্যাটাকে হামিদ সাহেব মারা যান। তার মৃত্যুর পর আমি তার বড় ছেলেকে ফোন করি। তিনি আমাকে প্রতি উত্তরে জানান যে, তিনি জরুরি মিটিংয়ে রয়েছেন এবং লাশটি যেনো আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম এ দিয়ে দেওয়া হয়। পরে কোনো আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে আমি নিজ উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে তাঁর লাশ যথাযথ মর্যাদায় দাফন করি।

লেখাটি আমি কোনো প্রকার বাহবা নেওয়ার জন্য লিখিনি। আজ আমি নিজেও একজন বাবা। সন্তানের একটু সুখের জন্য দিন-রাত একাকার করছি। সেই সন্তান যদি কোনোদিন এধরনের আচরণ করে তখন আমার কেমন লাগবে? শুধু এই অনুভূতি থেকে এটি লেখা।

আমার মনে একটা প্রশ্ন, আমরা যারা বাবা-মাকে অসম্মান-অবহেলা করি তারা কি একবারও ভেবে দেখি না যে, একদিন ওই জায়গাটাতে আমরা নিজেরা গিয়ে দাঁড়াবো?

আজ আমি আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে যে আচরণ করছি, তা যদি সেদিন আমার সন্তান আমার সঙ্গে করে তবে? আজ আমাদের বাবা-মায়েরা সহ্য করছে। কাল আমরা কি সহ্য করতে পারবো?’

রিজেন্ট হাসপাতাল এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহেদ এর উপরোক্ত বক্তব্যগুলো পড়ে আমাদের মনে হয়েছে ‌‘মানবিকতা’ শব্দটি কী ডিকসনারী থেকে উঠিয়ে দেওয়া উচিৎ? পৃথিবীতে মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়া আমাদের কী তাহলে বৃথা হলো?

Advertisements
Loading...