The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

কোস্টারিকার অদ্ভূত পাথরের বল ও তার ইতিকথা

গোটা এলাকা জুড়ে যেখানে ছড়ানো রয়েছে এই প্রাগৈতিহাসিক যুগের মস্ত বড় বড় সব পাথরের বল

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ বিশাল বিশাল পাথরের বল। দেখলে বিস্মিত হতে হয়। যারা কখনও এই দৃশ্য দেখেননি তারা এমন দৃশ্য দেখে সত্যিই বিস্মিত হন। তবে বিস্ময়ক হলেও বাস্তবে এমন বিশাল বিশাল পাথরের বল কখনও দেখা যায় না। কিন্তু ইতিহাস আসলে কী?

কোস্টারিকার অদ্ভূত পাথরের বল ও তার ইতিকথা 1

কোথাওবা জঙ্গলে ঢাকা বিস্তীর্ণ এক অদ্ভুত জঙ্গল। আবার কোথাও দেখা যায় পাহাড়ের মতো ঢাল। সব মিলিয়ে গোটা এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে গোল গোল পাথরের বিশাল বিশাল বল; একটি-দুটি নয়, তাও শত শত। গোটা এলাকা জুড়ে যেখানে ছড়ানো রয়েছে এই প্রাগৈতিহাসিক যুগের মস্ত বড় বড় সব পাথরের বল। অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো শোনা গেলেও এটি বাস্তব।

এটি মধ্য আমেরিকার দেশ কোস্টারিকার ডিকুইস ব-দ্বীপ। এখানে আবিস্কৃত হয়েছে ১৯৩০ সালের দিকে নানা আকৃতির সব পাথরের বড় বড় বল। গ্রানোডিওরাইট ও গাবরো জাতীয় পাথরে তৈরি বলগুলির দুএকটি একেবারে ছোট্ট, কয়েক সেন্টিমিটার ব্যাসার্ধের; আবার কয়েকটির ব্যাসার্ধ দুই মিটারের কম হবে না। কিছু বল তৈরি হয়েছে লাইমস্টোন ও বেলেপাথর দিয়ে। এসব বলরে ওজন কমপক্ষে ১৬ টন হবে। অন্তত শ’তিনেক এমন পাথরের বল খুঁজে পাওয়া গেছে সেখানে। অদ্ভুত এই বলগুলো নিয়ে কিংবদন্তীও রয়েছে। কোথা থেকে এলো এই পাথরের বলগুলো? তা নিয়েও রয়েছে নানা কিংবদন্তি। এগুলো তো রাতারাতি উদয় হয়নি, হাজার বছর ধরেই জঙ্গলের ভেতরে পড়ে ছিল এইসব পাথর।

জানা গেছে, ১৯ শতকের প্রথম দিকে আশেপাশের লোকেরা এগুলোর কথা জানতে পারলেও সেভাবে কেও চিন্তা-ভাবনা করেনি। তবে বিশ্ব এদের কথা জানতে পারে ১৯৩০ ও ১৯৪০ এর দশকে এসে। অর্থাৎ যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি’ কোস্টারিকায় নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ করার জন্য জমিজমা কিনতে থাকে ঠিক তখন। কলা চাষের জন্য জঙ্গল পরিস্কার করতে গিয়ে সন্ধান পাওয়া যায় এইসব বলগুলোর।

তাদের কাছে খবর পেয়ে সেখানে হাজির হয় প্রত্নতাত্ত্বিকদরা। নানা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গবেষণা শেষে তারা রায় দেন যে, কলম্বাস পূর্ব যুগের আমেরিকার আদি বাসিন্দারাই এসব বল তৈরি করেছিল। বংশ সম্পর্কের দিক থেকে তারা ছিল হন্ডুরাস ও কলম্বিয়ার উত্তরে বসবাসকারী বরুকা, তেরিবে ও গুয়ামি নামের খুব ছোট ছোট নৃগোষ্ঠীর লোকদের পূর্বপুরুষ। চাষবাষ ও মাছ ধরা ছিল এই আদিম অধিবাসীদের মূল পেশা। পাহাড়ী নদীর ধারে বসবাস করতো বলে গোলাকার পাথর ছিল তাদের কাছে খুবই সহজলভ্য। এক তথ্যে বলা হয়েছে যে, চিবিচান ভাষাভাষী এই মানুষদেরই কীর্তি হলো এই বলগুলি। তবে কেনো তারা বানিয়েছিলো এই চমৎকার স্থাপত্যগুলো? আর কেনোই বা বিরান জঙ্গল ও প্রান্তরে ফেলে গিয়েছিলো এসব পাথরের বল? সেই উত্তর কারও জানা নেই।

গবেষক জর্জ এরিকসন সহ কয়েকজন গবেষকের ধারণা হলো, বলগুলোর বয়স হতে পারে কমপক্ষে ১২ হাজার বছর। তবে অনেকেই আবার তাদের সঙ্গে একমত নন। প্রচলিত রেডিও কার্বন ডেটিং পদ্ধতি এইসব বলগুলোতে প্রয়োগ করা যায় না, সে কারণেই এদের বয়স নির্ণয়ে বিজ্ঞানীদের বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। তবে এখন মোটামুটিভাবে স্বীকৃত যে, এই বলগুলো খ্রিস্টের জন্মের ৬০০ হতে ১৫০০ বছর পূর্বে বানানো হয়েছিলো।

তবে আজও গবেষণা চলছে পাথরের বলগুলোর ব্যবহার আসলে কী ছিল, তা নিয়ে। প্রথমেই জানা যাক এগুলোকে ঘিরে তৈরি হওয়া পৌরাণিক কাহিনীগুলো আসলে কি ছিলো।

জানা যায়, রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে যে, বজ্রের দেবতা তারা, বিশাল এক ব্লো পাইপের সাহায্যে ঝড়ের দেবতা সের্কেসের দিকে এই বলগুলি নাকি ছুঁড়ে মেরেছিলেন। আমাদের আধুনিক কল্পনাবিলাসীরা দাবি করেন যে, এই বলগুলো এসেছে সেই সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যাওয়া শহর আটলান্টিস হতে।

আবার কেও কেও দাবি করেছেন যে, ভিনগ্রহের অধিবাসীরা এগুলো বানিয়ে রেখে গিয়েছেন! বলগুলো যখন আবিস্কার করা হয়, তখন দেখা যায়, অনেকগুলো সাজানো রয়েছে সোজা লাইনে, আবার কিছু সাজানো ত্রিকোনাকারভাবে, কিছু সাজানো সামন্তরিক ক্ষেত্রের মতো করে। কিছু বল উত্তর মেরুকে নির্দেশ করে সাজানো ছিল। ইভর জ্যাপ নামে জনৈক ব্যক্তি দাবি করেছিলেন যে, এই বলগুলো চিলির স্টার আইল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিখ্যাত স্টোনহেঞ্জের দিকে নির্দেশ করে সাজানো! তবে শেষ পর্যন্ত এসব ধারণার কোনটিই ধোপে টেকেনি।

ধারণা করা হচ্ছে, বলগুলো ওই আমলের গোত্র অধিপতিদের বাড়ি নির্দেশ করেও বানানো হয়ে থাকতে পারে। তবে এই ব্যাখ্যার ব্যাপারেও ঠিক নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। কাজেই বলগুলো বানানোর উদ্দেশ্য রহস্যজনই রয়ে গেছে।

জানা গেছে, জঙ্গল পরিস্কার করার সময় মজুররা অনেক বল আসল জায়গা হতে সরিয়ে দিয়েছে। আবার কোস্টারিকার অনেক ধনী ব্যক্তিবর্গ বা বিদেশী গবেষকরা অনেকগুলো বল তুলে নিয়ে গেছেন। যে কারণে আদৌ যদি এদের কোনো জ্যামিতিক গুরুত্ব থেকেও থাকে, তবে তা আজ আর বোধগম্য হচ্ছে না।

বলা হয়েছে, যেসব রেড ইন্ডিয়ান গোত্রের পুর্বপুরুষরা বলগুলো নির্মাণ করেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, স্প্যানিশ কঙ্কুইস্তাদোরসদের (যেসব স্প্যানিশ অভিযাত্রী লাতিন আমেরিকা দখল করেছিলো) অত্যাচারের কল্যাণে তারা সবাই দেশছাড়া হয়েছেন। তাছাড়া তাদের নেই কোনো লিখিত ইতিহাসও, কাজেই তাদের কাছ থেকেও কার্যকর কোনো তথ্যনির্দেশ পাওয়া সম্ভব নয়। বলগুলো তৈরির একটি কারণ হতে হলো, পেরুর নাজকা লাইনের মতো এগুলোও হয়তো জ্যোতিচর্চার কাজে ব্যবহৃত হতো। তবে সে সম্বন্ধেও নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি। সব কিছুই যেনো এক রহস্যময়!

২০১৪ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে গণ্য করার পর হতে কোস্টারিকা সরকার বলগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এই পাথরগুলো এখন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ।

Loading...