ব্রেকিং: জিয়া অরফানেজ দুর্নীতি মামলার রায়ে খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড

১৯৯১-১৯৯৬ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বিদেশ হতে এতিমদের সহায়তার জন্য আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ বহুল আলোচিত জিয়া অরফানেজ দুর্নীতি মামলার রায়ে খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। আজ জনাকীর্ণ বকশী বাজারের বিশেষ আদালতে এই রায় দেওয়া হয়।

বহুল আলোচিত জিয়া অরফানেজ দুর্নীতি মামলার রায়ে খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। আজ জনাকীর্ণ বকশী বাজারের বিশেষ আদালতে এই রায় দেওয়া হয়। ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আখতারুজ্জামান এই রায় ঘোষণা করেছেন। সেই সঙ্গে তারেক রহমানসহ অপর ৫ আসামীকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। সেইসঙ্গে তাদের ২ কোটি ১০ লাখ করে জরিমানা করেছে আদালত।

মামলায় যার যার বিরুদ্ধে অভিযোগ

দীর্ঘ এক দশক পূর্বে জরুরি অবস্থার মধ্যে দুদকের দায়ের করা জিয়া অরফানেজ দুর্নীতি মামলার রায় আজ (বৃহস্পতিবার) দেওয়া হলো। মামলার প্রধান আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ. এম. এরশাদের পর খালেদা জিয়া হলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সরকারপ্রধান, যার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি মামলার রায় হলো। দুর্নীতির দায়ে এরশাদকে জেলও খাটতে হয়।

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১-১৯৯৬ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বিদেশ হতে এতিমদের সহায়তার জন্য আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় এই মামলাটি দায়ের করা হয়।

ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে ‘অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ’ ও দুদক আইনের ৫(২) ধারায় অপরাধমূলক অসদাচরণের অভিযোগ এনে ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া, তাঁর ছেলে তারেক রহমানসহ মোট ৬ জনকে আসামির বিচার শুরু করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ বাসুদেব রায়।

২৬১ কার্যদিবস শুনানির পর ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান আজ (বৃহস্পতিবার) এই মামলার রায় দিলেন।

এই মামলায় আসামি যারা ছিলেন

দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎকালীন উপ-সহকারী পরিচালক হারুন-অর রশিদ (বর্তমানে উপ-পরিচালক) এই মামলার এজাহারে খালেদা জিয়াসহ মোট ৭ জনকে আসামি করেন।

বাকি ৬ জন হলেন- বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান, জিয়াউর রহমানের বোনের ছেলে মমিনুর রহমান (সাবেক রাষ্ট্রপতি), মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক (ইকোনো কামাল), সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ এবং সৈয়দ আহমেদ ওরফে সায়ীদ আহমেদ।

দুদক কর্মকর্তা হারুন-অর রশিদ ২০০৯ সালের ৫ অগাস্ট আদালতে যে অভিযোগপত্র দিয়েছিলেন, সেখান থেকে গিয়াস উদ্দিন এবং সায়ীদ আহমেদের নাম বাদ দেওয়া হয়।

তাদের অব্যাহতির কারণ হিসেবে বলা হয় যে, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ অনেক পূর্ব হতেই সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। যে কারণে অভিযোগে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অপরদিকে সায়ীদ আহমেদ নামে কারও অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। সাবেক সাংসদ কামাল জালিয়াতি করে ট্রাস্টের কাজে ওই দুই জনের নাম ব্যবহার করেন।

বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ

মামলার এজাহারে বলা হয়, বেগম খালেদা জিয়া তার প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম মেয়াদে ১৯৯১-১৯৯৬ সময়কালে এতিম তহবিল নামে সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখাতে একটি হিসাব খোলেন। একটি বিদেশী সংস্থা ১৯৯১ সালের ৯ জুন ওই হিসাবে ইউনাইটেড সৌদি কর্মাশিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে অনুদান হিসেবে ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাার ২১৬ টাকা জমা দেয়।

ওই প্রাপ্ত টাকা দীর্ঘ ২ বছর কোনো এতিমখানায় না দিয়ে জমা রাখা হয়। এরপর জিয়া পরিবারের ৩ সদস্য তারেক রহমান, তার ভাই আরাফাত রহমান ও তাদের ফুপাতো ভাই মমিনুরকে দিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করে ওই টাকা তাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, ওই ট্রাস্ট গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা মানা হয়নি নীতিমালা লংঘন করা হয়েছে। এছাড়া ট্রাস্টের ঠিকানা হিসেবে খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের ৬ নম্বর মইনুল রোডের বাড়ির ঠিকানাটি ব্যবহার করা হয়েছে।

পরবর্তীতে ওই টাকা দুইভাগে ভাগ করে ট্রাস্টের বগুড়া এবং বাগেরহাট শাখার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরমধ্যে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫’শ টাকা ১৯৯৩ সালের নভেম্বর মাসে বরাদ্দ দেওয়া হয় বগুড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে। ওই অর্থ হতে ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ট্রাস্টের নামে বগুড়ার দাঁড়াইল মৌজায় ২.৭৯ একর জমিও কেনা হয়।

আবার অবশিষ্ট টাকা এতিমখানায় ব্যয় না করে ব্যাংকে জমা রাখা হয়। ২০০৬ সালের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত তা সুদে আসলে বেড়ে ৩ কোটি, ৩৭ লাখ ৭শ’ ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা হয়।

এজাহারে আরও বলা হয়, ২০০৬ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার ছেলে তারেক রহমান এবং মমিনুর রহমানকে দিয়ে ৩ কিস্তিতে ৬টি চেকের মাধ্যমে ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা তুলে প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় স্থায়ী আমানত হিসেবে (এফডিআর) করেন। এরপর ওই টাকা কাজী সালিমুল হক কামাল এবং অন্যদের মাধ্যমে সরিয়ে অন্য কোনো খাতে ব্যবহার করা হয়।

এই মামলায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে ‘নাম সর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অপরাধের সময়কাল বলা হয় ১৯৯৩ সালের ১৩ নভেম্বর হতে ২০০৭ সালের ২৮ মার্চের মধ্যে।

আসামীদের বিরুদ্ধে কেনো অভিযোগ

বেগম খালেদা জিয়া : অভিযোগপত্রে বলা হয় যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অসৎ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের নামে পাওয়া টাকা দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো এতিমখানাতে না দিয়ে, কোনো নীতিমালা তৈরি না করে, জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না করে নিজের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে অস্তিত্বহীন ট্রাস্ট সৃষ্টি করে প্রধানমন্ত্রীর পরিচালিত তহবিলের টাকা ওই ট্রাস্টে দিয়েছেন। পরে বিভিন্ন উপায়ে ওই টাকা আত্মসাত করা হয়, যার জন্য বেগম খালেদা জিয়াই দায়ী বলে অভিযোগ করা হয়।

তারেক রহমান : প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহায়তায় তাঁর ছেলে তারেক রহমান তাদের বাসস্থানের ঠিকানা ব্যবহার করে ‘অস্তিত্বহীন’ জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট সৃষ্টি করেন। ওই ট্রাস্টের নামে সোনালী ব্যাংকের গুলশান নর্থ সার্কেল শাখায় হিসাব খুলে সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের ওই টাকা জমা করেন। পরে ট্রাস্ট ডিডের শর্ত ভেঙে ওই টাকা তিনি ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পর্কহীন সালিমুল হক কামালকেও দেন। পরে সেখান থেকে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্মসাত করা হয়।

মমিনুর রহমান : তারেক রহমানের ফুপাতো ভাই মমিনুর রহমানও একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা আত্মসাতে সহযোগিতা করে অপরাধ করেছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।

কাজী সালিমুল হক কামাল : সাবেক সাংসদ সালিমুল হক কামালের সঙ্গে ওই ট্রাস্টের কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও তিনি তারেক রহমানের নিকট হতে ৫টি চেক নিয়ে এফডিআর করেন ও পরে তা ভাঙান। সে সময় প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শাখা ব্যবস্থাপকদের দিয়ে সৈয়দ আহমেদ এবং গিয়াস উদ্দিন আহমেদ নামে দুই ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে এফডিআর ভাঙিয়ে ওই টাকা শরফুদ্দিন আহমেদের অ্যাকাউন্টে জমার ব্যবস্থা করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী : তখনকার মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল গঠন এবং পরিচালনার জন্য কোনো নীতিমালা তৈরি না করে, কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুমোদন নিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের দিয়ে অস্তিত্বহীন ট্রাস্ট সৃষ্টি করে সেখানে এতিম তহবিলের টাকা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের মূল নথি সংরক্ষণ না করে তিনি তা গায়েব করে দেন। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি ওই অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ করা হয়।

শরফুদ্দিন আহমেদ : ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন এই আত্মসাতে সহযোগিতা করে ব্যংকে তার নিজের নামে অ্যাকাউন্ট হতে টাকা তুলে আত্মসাতের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন বলে অভিযোগ করা হয়।

আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...