আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চরমপন্থীরা ॥ ২ মাসে প্রায় ৭৫ জন নিহত ॥ শক্ত অভিযান চালানো দরকার

ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ চরমপন্থীদের আস্ফালন অনেক দিন কম ছিল। বিশেষ করে র‌্যাব গঠনের পর চরমপন্থীদের কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইদানিং তাদের কর্মকাণ্ড আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সামপ্রতিক সময়ে চরমপন্থীদের হাতে অন্তত ৭৫ জনের মতো নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কারণে বহু নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। বিগত বিএনপি তথা চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) গঠন করে। র‌্যাব গঠনের পর বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক অভিযান চালানোর পর ক্রস ফায়ারে বহু চরমপন্থী নেতা নিহত হয়। যে কারণে সে সময় বহু চরমপন্থী আত্মগোপন করে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলেন। চরমপন্থীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এলাকার অনেকে ঘর-বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। র‌্যাব গঠনের পর অভিযান চালানো এবং ক্রস ফায়ারে নিহত হওয়ার পর সবাই আবার নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ে র‌্যাবের অভিযান কমে যাওয়ায় এলাকায় আবার চরমপন্থীদের উৎপাত বেড়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে।

এলাকার সাংবাদিকরা যা বলেন

চুয়াডাঙ্গার এক সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপ করলে তিনি জানান, এলাকায় চরমপন্থীদের উৎপাত ক্রমেই বাড়ছে। র‌্যাব গঠনের পর একের পর এক অভিযান চালানোর পর চরমপন্থীদের কর্মকাণ্ড প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। মানুষ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারতো। কিন্তু সেই অবস্থার আবার অবনতি ঘটেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সাংবাদিক আরও বলেন, এক সময় আমিও চরমপন্থীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছিলাম। অনেক দেন-দরবার করে সে সময় তাদের হাত থেকে বেঁচেছি। এখন যদি আবার ওদের কর্মকাণ্ড মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তাহলে চলাফেরা করাও দুষ্কর হয়ে পড়বে। ওই সাংবাদিক আরও বলেন, আমরা সচরাচর চরমপন্থীদের কোন সংবাদ করিনা। কিন্তু যখন এলাকার একজন মানুষ তাদের হাতে নিহত হয় তখন সংবাদ না করলে সাংবাদিক হিসেবে আমাদের কোন মূল্যায়ন সমাজে থাকে না। আমাদের দায়িত্ব খবরা-খবর মানুষের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু আমরা বড়ই অসহায় বোধ করি এক্ষেত্রে। পত্রিকার সম্পাদকরা চাই নিউজ পাঠাতে অথচ আমরা বড়ই অসহায়ের মধ্যে এই সব চরমপন্থীদের নিউজ করি। নিজের লাইফের রিস্ক নিয়ে সংবাদ পাঠাতে হয়।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দশটি জেলায় রাজনৈতিক ব্যানারে চরমপন্থীরা

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত দশটি জেলায় রাজনৈতিক ব্যানারে চরমপন্থীরা তৈরি করেছে শক্ত ঘাঁটি। চরমপন্থী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে চাঁদা দাবি করে ব্যবসায়ীদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। চরমপন্থীদের ভয়ে অনেক ব্যবসায়ী এলাকা ছেড়ে ঢাকায় আশ্রয় নিয়েছে। তাছাড়া কিছু কিছু চরমপন্থী গ্রুপের শীর্ষ নেতা স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বিভিন্ন তৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ এসেছে। চরমপন্থী নিধনে গঠিত টাস্কফোর্সের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। ক্রসফায়ার ও পুলিশ বা র‌্যাবের অভিযান আগের মতো নেই। প্রায় দুই মাস ধরে সরকারের দুটি গোয়েন্দা সংস্থা চরমপন্থী সংগঠন ও ওইসব গ্রুপের সদস্যদের ব্যাপারে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে একটি গোপন রিপোর্ট তৈরি করেছে। ওই রিপোর্ট গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৪টি চরমপন্থী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার কথা থাকলেও সেই প্রক্রিয়া থেমে আছে। রাজনৈতিক ব্যানারের ঊর্ধ্বে থেকে এসব সংগঠন দ্রুত নিষিদ্ধ করতে হবে। আর না হয় হানাহানি কিছুতেই রোধ করা যাবে না।

সাড়ে তিন হাজার তালিকাভুক্ত চরমপন্থী সক্রিয়

পত্র-পত্রিকার সংবাদে জানা যায়, চরমপন্থী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার তালিকাভুক্ত চরমপন্থী সক্রিয় আছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, যশোরের সঙ্গমস্থল তালা, ডুমুরিয়া ও কেশবপুরে সন্ত্রাসীদের আনাগোনো থাকে বেশি। এসব এলাকায় পুলিশি টহল থাকে না। তাছাড়া এলাকার পুলিশ ক্যাম্পগুলো সচলও নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চরমপন্থীদের কয়েকটি গ্রুপ তাদের প্রভাব বলয় বিস্তারের লক্ষ্যে গ্রামে গ্রামে গোপন মিটিং করছে। তারা নানা পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যে নানা ধরনের বিরোধ মীমাংসার দায়িত্বও নিচ্ছে তারা। দেশের দুই ধারার রাজনীতির পক্ষ নিয়ে বিভাজিত চরমপন্থী দলগুলো সামনের সংসদ নির্বাচনের বিষয়টিও মাথায় রেখেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থী সংগঠনগুলোর তৎপরতা কঠোরভাবে দমন করতে র‌্যাব ও পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। নির্দেশ পেয়ে র‌্যাব-পুলিশের সমন্বয়ে একটি ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী এবং উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, নাটোর ও নওগাঁসহ কয়েকটি জেলায় সর্বহারা ও চরমপন্থীদের তৎপরতা রোধ করতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে আসছে। অপারেশন চলাকালে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে চরমপন্থীদের একাধিক বন্ধুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। কিন্তু তার পরও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া পুলিশ-র‌্যাব ও টাস্কফোর্সের কার্যক্রম শিথিল হয়ে পড়েছে। এই নিয়ে গোয়েন্দারা একটি গোপন রিপোর্ট তৈরি করেছে। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া এলাকায় পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (লাল পতাকা), পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল জনযুদ্ধ), কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহে নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (শৈলেন গ্রুপ), ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর এলাকায় গড়ে ওঠা শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন, বাংলাদেশ নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (গাজী-কামরুল), বাংলাদেশ নিউ বিপ্লবী কমিউনিষ্ট পার্টি (মৃণাল), গণমুক্তি ফৌজ, পাবনা জাসদ বাহিনী, কুষ্টিয়া জাসদ বাহিনী, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-রশিদ), পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (সর্বহারা-মাদারীপুর), পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (সর্বহারা-বরিশাল গ্রুপ) ও পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (সর্বহারা গ্রুপ-রাজবাড়ী) চিহ্নিত ক্যাডাররা এখন বেশি সক্রিয়। ওই অপরাধীরা বড় বড় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ অস্ত্র বেচাকেনা, নৃশংস হত্যা, অপহরণ, গুম ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। চরমপন্থীদের বেশির ভাগই এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ে থাকছে। চরমপন্থীদের তৎপরতা সম্পর্কে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানানোর সাহস পাচ্ছে না নির্যাতিত লোকজন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, মাঝপথে চরমপন্থীদের তৎপরতা বন্ধ থাকলেও তারা এখন মাঠে নেমে পড়েছে। এতে জনমনে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২ মাসে দশটি জেলায় ৭৫ জন নিহত হয়েছে। তাছাড়া ১৬টি ডাকাতি, ৪৬টি অপহরণ, ৬০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। চরমপন্থী এলাকাগুলোতে যেসব পুলিশ ক্যাম্প রয়েছে সেগুলো পুরোপুরি সচল করার চেষ্টা চলছে। তবে এই মুহূর্তে বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান চালানো দরকার বলে এলাকাবাসী মনে করছেন।

Advertisements
Loading...