আধকপালি বা মাইগ্রেন হলে করণীয়

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ মাথাব্যথার প্রকৃত কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আজও কোনও স্থির সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি। টেনশনসহ নানা কারণেই মাথাব্যথা হতে পারে। এসব মাথাব্যথাকে আমরা আধকপালি বা মাইগ্রেন বলি। এ নিস্তারের উপায় কি? সে বিষয়েই আজকের আলোচনা।

বিজ্ঞানীরা ১৯৬০ সালে মাথাধরা সম্পর্কিত এক গবেষণায় জানান, টেনশনের কারণে অনেক সময় মাথাব্যথা হয় এবং তার চিকিৎসাও সহজ। রক্তবাহী শিরাগুলো যখন মস্তিষ্কে ঠিকমতো রক্ত সরবরাহ করে না, তখন অনেকে একে মাইগ্রেনের ব্যথা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

কি ধরনের মাথাব্যথা হয়

মাথাব্যথা বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এর মধ্যে এক ধরনের মাথাব্যথা হল ‘মাইগ্রেন’, যা সাধারণভাবে ‘আধকপালি ব্যথা’ বলে পরিচিত। ১৫-২০ বছর আগে এ রোগের তেমন প্রাদুর্ভাব ছিল না। বর্তমানে প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে এর ব্যাপকতাও প্রসারিত হচ্ছে।

কি কারণে মাথাব্যথা হতে পারে

টেনশন বা অন্য কারণেও এ ব্যথা হতে পারে। রক্তবাহী শিরাগুলো কখনও কোনও কারণে অতিরিক্ত রক্ত সরবরাহ করলেও মাথাব্যথা হতে পারে। এ ব্যথা মাইগ্রেনের ব্যথার চেয়ে তীব্র এবং মাইগ্রেনের ব্যথা বলে বুঝতে ভুল হতে পারে।

ধারণা করা হয়, টেনশন বা প্রাকৃতিক কারণ থেকে মাইগ্রেনের ব্যথা ওঠার শুরুতে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কমে যায়- যার কিছুটা প্রভাব পড়ে অক্সিপিটাল এবং প্যারাইটাল নামক মস্তিষ্কের দুটি অংশের কার্যকারিতার ওপর। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় মাথাব্যথার সৃষ্টি হতে পারে। যখন পুরোপুরিভাবে মাথাব্যথা শুরু হয়ে যায় তখন বহিঃমস্তিষ্কের ধমনিগুলোর প্রসারণ ঘটে- যা মূলত রক্তের মাঝে বিদ্যমান ৫- হাইড্রেক্সি ট্রিপটামিন নামক ব্রেনের উপাদানের উপস্থিতির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। এ উপাদানটির সঠিক ভূমিকা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনও সন্দিহান।

বংশগত প্রভাব

অন্যান্য ব্যথার তুলনায় মাইগ্রেনের ব্যথার ওপর বংশগত প্রভাব বেশি- যা মূলত কোষের একক ‘জিন’-এর বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। এর প্রমাণ- নেদারল্যান্ডের লিডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ফ্যাকাল্টির একদল নিউরোলজিস্ট একজন মাইগ্রেন রোগীর দেহ থেকে মাইগ্রেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিন পৃথক করেন। পরে ওই রোগীর মাইগ্রেনের ব্যথা আর দেখা যায়নি।

Related Post

দুশ্চিন্তা-অস্থিরতা

যারা সবসময় ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণে চিন্তাগ্রস্ত থাকেন বা দুশ্চিন্তায় ভোগেন তাদের ক্ষেত্রে এর প্রকোপ বেশি। তাছাড়া হঠাৎ করে কোনও বিপজ্জনক খবর বা আবেগপ্রবণ অবস্থা এ মাইগ্রেনের জন্ম দেয়।
জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি এবং কিছু যৌন হরমোন : ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা বেশি। অপরদিকে মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের একদল গবেষক ১০০ মহিলার ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, যাদের নিয়মিত মাসিক হয় না- তাদের এ মাইগ্রেনের হার বেশি। আবার অনেকের ক্ষেত্রে প্রত্যেক মাসিকের পূর্বাবস্থায় এ মাইগ্রেনের ব্যথা উঠতে পারে। অন্যদিকে যেসব মহিলা দীর্ঘদিন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন করেন তাদেরও এ রোগের লক্ষণ বেশি দেখা যায়।

পরিবেশের প্রভাব

বর্তমানে আমাদের দেশসহ বিশ্বের বড় বড় শহরে ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পরিবেশকে অসহনীয় করে তুলছে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের বর্জ্য পদার্থ ও ধোঁয়া পরিবেশকে এমন এক অবস্থায় এনেছে যার প্রভাব আমাদের শরীরের ওপর পড়েছে। আর এ প্রভাবের কারণ হিসেবে সৃষ্টি হয়েছে মাইগ্রেন। গ্রাম অঞ্চলের লোকদের চেয়ে শহর অঞ্চলের লোকদের মাঝে এর প্রভাব বেশি।

প্রভাবিত করে এমন কারণ

প্রথমত কিছু কিছু খাবার মাইগ্রেনের ব্যথার তীব্রতা বাড়িয়ে দেয় বা হালকা ব্যথার ভাব থাকলে তা পরিপূর্ণ মাইগ্রেনের ব্যথায় রূপ লাভ করে। নিম্নলিখিত খাবার উল্লেখযোগ্য-
# চকোলেট
# পনির
# মদ
# কোলাজাতীয় পানীয়।

দ্বিতীয়ত মাইগ্রেন রোগী যারা এ ব্যথার পাশাপাশি সাইনাসগুলোর প্রদাহে ভুগছেন বা প্রচণ্ড সর্দি-কাশি বা ঠাণ্ডায় ভুগছেন; তাদের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের ব্যথার প্রকোপ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।

তৃতীয়ত যখন প্রচণ্ড গরম পড়ে এবং পরিবেশের অবস্থা ভ্যাপসা আকার ধারণ করে তখন মাইগ্রেনের রোগীর মাথাব্যথার প্রকোপ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। অপরদিকে শীতকালে যদি ঠাণ্ডা বাতাস বেশি লাগে বা কুয়াশা পরিবেষ্টিত অবস্থা বিরাজ করে তখন এর প্রকোপ আরও বেড়ে যায়।

প্রকারভেদ : মাইগ্রেন সাধারণত তিন ধরনের হয়।
# মাইগ্রেন উইথ অরা বা ক্লাসিক মাইগ্রেন
# মাইগ্রেন উইথ আউট অরা বা কমন মাইগ্রেন
# মাইগ্রেন ভ্যারিয়্যান্স অ্যাটিপিক্যাল মাইগ্রেন

মাইগ্রেনের লক্ষণ

অরা বা প্রাক-ইঙ্গিত মাইগ্রেন হচ্ছে, মাথাব্যথা শুরুর আগের ৩০ মিনিটের মধ্যে কিছু বিশেষ অনুভূতির প্রমাণ।
মাথাব্যথার আক্রমণকে কয়েক পর্যায়ে ভাগ করা যায়- # প্রডরমাল বা প্রাকউপসর্গ যা মাথাব্যথা শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েকদিন আগে লক্ষ করা যায়,
# অরা বা পূর্ব লক্ষণ যা মাথাব্যথা শুরুর আগ মুহূর্তে হয়, # মূল মাথাব্যথা, # পরবর্তী উপসর্গ বা পোস্টড্ররমাল পর্যায় অধিকাংশ রোগী একাধিক পর্যায়ে ভুগে থাকেন।

পূর্ব লক্ষণ

মাথাব্যথা শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন আগে শতকরা ৫০-৮০ ভাগ মাইগ্রেন রোগীর ক্ষেত্রে কিছু মানসিক, স্নায়ুবিক, অটোনমিক ও অন্যান্য লক্ষণ দেখা যায়। এদের কেউ কেউ বিষণ্ন, উল্লসিত, ঝিমুনি, অতি সচেতন, অতি উৎসাহী কিংবা খিটখিটে, শান্ত ধীরগতিভাবে ভুগে থাকেন।

পরবর্তী লক্ষণ

মাইগ্রেন মাথাব্যথার পরবর্তী পর্যায়ে রোগী সাধারণত ক্লান্ত এবং অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন যেন বিশাল একটা শারীরিক পরিশ্রমের ধকল গেছে। এ সময়ে তিনি কোনও কিছু মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করতে পারেন না।

অরাবিহীন মাইগ্রেন

এটাকে কমন মাইগ্রেনও বলা হয়। অরাযুক্ত মাইগ্রেনের চেয়ে এর প্রকোপ অনেক বেশি। এ মাথাব্যথা ৪-৭২ ঘণ্টাব্যাপী হয় এবং কমপক্ষে নিচের যে কোনও দুটি লক্ষণ থাকতে পারে-

# চিন চিন বা দপ দপ করে ব্যথা
# অর্ধেক মাথায় ব্যথা
# বমি বমি ভাব অথবা বমি হওয়া
# আলো ভীতি বা শব্দ ভীতি
# অতীতে এ ধরনের মাথাব্যথার কমপক্ষে পাঁচবার অভিজ্ঞতা।

অরাযুক্ত মাইগ্রেন

শতকরা ১৫ ভাগ মাইগ্রেন রোগী তাদের মাথাব্যথা শুরু হওয়ার আগে কিছু লক্ষণ অনুযায়ী আসন্ন মাথাব্যথার আক্রমণ বুঝতে পারে। সাধারণত এ রোগীরা মাথাব্যথা শুরুর আগে আধঘণ্টা সময়ের মধ্যে চোখে আলোর ঝলকানি, চোখের সামনের কিছু অংশ অন্ধকার দেখা, রাস্তাঘাট উঁচু-নিচু, আঁকাবাঁকা ইত্যাদি দেখতে পান। কোনও কোনও সময়ে রোগী শরীরের অংশবিশেষ অনুভূতির অস্বাভাবিকতা অনুভব করেন। কারও কারও কিছুক্ষণের জন্য শরীরের অংশবিশেষ অবশ, কথা বলার অস্বাভাবিকতাও হতে পারে।

চিকিৎসা

সাধারণ চিকিৎসা:

# যেসব খাবার মাইগ্রেনের ব্যথাকে বাড়িয়ে দেয় সেসব খাবার বর্জন করা।
# যদি কোনও মহিলা জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেতে থাকেন, তবে তিনি বড়ি খাওয়া বন্ধ রাখবেন এবং অন্য যে কোনও ধরনের বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করবেন।
# পরিবেশগত কারণে যদি ধোঁয়া, ধুলাবালি, প্রচণ্ড গরম বা শীতের বাতাসের মাঝে বের হতে হয় তবে মাস্ক বা রুমাল ব্যবহার করতে হবে।

শাস্ত্রীয় চিকিৎসা

সাময়িকভাবে আক্রান্ত সাধারণ মাইগ্রেন রোগীর চিকিৎসা
# ট্যাবলেট অ্যাসপিরিন (৬০০-৯০০ মি. গ্রা.) যা পানিতে দ্রবণীয় অথবা ট্যাবলেট প্যারাসিটামল (১ গ্রাম বা ২টা ট্যাবলেট)
# সঙ্গে বমি বন্ধ করার জন্য ওষুধ, যেমন-
মেটোক্লোপ্রোমাইড বাজারে যা মোটিলন, নিউট্রামিড, অ্যান্টিমেট বা মেটোসিড নামে পরিচিত অথবা প্রোক্লোরপিরাজিন বাজারে যা স্টিমিটিল, ভারগন বা প্রম্যাট নামে পাওয়া যায়- এসব দেয়া যেতে পারে।

ওহিরো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের একদল গবেষক চেষ্টা চালাচ্ছেন যাতে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা করার প্রয়োজন না পড়ে। ওই গবেষকরা শ্রেনিং টেস্টের কথা বলেছেন। এ টেস্টের ফলে ডাক্তাররা জানতে পারবেন ব্যথা কোথায় ঘটছে এবং কীভাবে রক্তবাহী শিরাগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। মাথা ধরার অন্যান্য কারণও এ টেস্টে জানা যাবে। ফলে চিকিৎসকরা সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসা দিতে পারবেন।

ডা. শাহজাদা সেলিম
ডায়াবেটিস ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ
অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বারডেম, ঢাকা।

* (মাথাব্যথা সমস্যাটি আমাদের দেশের একটি প্রধান সমস্যা। ডা. শাহজাদা সেলিম-এর এই লেখাটি থেকে হয়তো অনেকেই উপকৃত হবেন। সে কারণে ইন্টারনেটে প্রাপ্ত তাঁর লেখাটি প্রকাশ করা হলো)।

This post was last modified on জানুয়ারি ২৩, ২০২৫ 2:23 pm

স্টাফ রিপোর্টার

Recent Posts

ইউটিউবে ১০০ কোটি ভিউয়ের রেকর্ডে ‘পাসুরি’

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ প্রথম পাকিস্তানি মিউজিক ভিডিও হিসেবে ইউটিউবে ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন)…

% দিন আগে

রাশিয়ার ড্রোন হামলা থেকে অল্পের রক্ষা পেয়েছে জেলেনস্কির বিমান

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ নরওয়ের ওসলোতে যাওয়ার সময় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে বহনকারী একটি…

% দিন আগে

শনি গ্রহের দক্ষিণ মেরুতে বিশাল ১০ কোণ!

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ মহাকাশে এমন কিছু দৃশ্য রয়েছে, যেগুলো প্রথম দেখায় যেন কোনো…

% দিন আগে

এমন দৃশ্য আপনি কী আগে কখনও দেখেছেন?

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ শুভ সকাল। বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খৃস্টাব্দ, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩…

% দিন আগে

ভাতের সঙ্গে ঘি খেলেও কী মেদ কমতে পারে?

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ ভাতের সঙ্গে সামান্য ঘি খাওয়ার প্রচলন দক্ষিণ এশিয়ার বহু পরিবারেই…

% দিন আগে

ইএসজি এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডস এ স্বীকৃতি অর্জন করলো এনার্জিপ্যাক

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ টেকসই অবকাঠামো, সম্পদের যথাযথ ব্যবহার এবং দায়িত্বশীল উৎপাদন চর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ…

% দিন আগে