রাজধানীর বহু ভবন ঝুঁকিপূর্ণ

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ যখন কোন বিল্ডিং এ আগুন লাগে কিন্বা ভূকম্পন অনুভূত হয়, তখন রেডিও-টিভি এবং সংবাদপত্রে বড় বড় হরফে লেখা-লেখী শুরু হয়। বিল্ডিং কোড মানা হচ্ছে না, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রাজধানী ধ্বংস হবে, ..ইত্যাদি ইত্যাদি সংবাদে মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় হয়। আবার যখন সব ঠাণ্ডা হয়ে যায়, তখন কোন কথায় থাকে না কারো মুখে। সব যেনো ঠিক-ঠাক মতই চলছে, কোন সমস্যায় নেই। শুধু সমস্যা সামনে এলে দুনিয়া উদ্ধার, আর সমস্যা না থাকলে সবঠিক এমন একটা পরিস্থিতি আমাদের জন্য অনেক সমস্যা তৈরি করছে। যখন কোন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, তখন অনেক লেখা-লেখী আবার পরে একেবারে চুপচাপ এমনটি হলে সমস্যা সব সময় থেকেই যাবে। আসলে বাস্তবধর্মী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ আমাদের দেশে দেখা যায় না। ভূমিকম্প হলে কি ধরনের ক্ষতি হতে পারে এবং এর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কি কি ব্যবস্থা আগে থেকেই নিতে হবে সে বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি আসলে জরুরি হয়ে পড়েছে।

অপরদিকে রাজধানীর আরও একটি বড় সমস্যা হলো রাজধানীতে ইদানিং বড় বড় ভবন নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু সেসব ভবনে অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা কি আছে তা দেখা হচ্ছে না। আমাদের মনে আছে, এনটিভি ভবনসহ বসুন্ধরার মতো আধুনিক ভবন নির্মাণ হয়েছে, অথচ অগ্নি নির্বাপনের কোন ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। আর তাই বিগত সময়ে অনেক ক্ষয়ক্ষতি আমরা স্বচোক্ষে দেখেছি।
শুধু আকাশছোঁয়া ভবন নির্মাণ করলে হবে না, এর অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা রাখতে হবে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ১০টি জোনে বর্তমানে কমপক্ষে ২ হাজার ১৫০টি সুউচ্চ ভবন রয়েছে। এসব ভবনের উচ্চতা সর্বনিম্ন ৭ তলা থেকে সর্বোচ্চ ২৯ তলা। আকাশছোঁয়া এসব ভবন নির্মাণের সময় বাধ্যতামূলকভাবে অগ্নিনির্বাপণের সব সুব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড ডিফেন্স অধিদফতরের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বেশিরভাগ ভবনেই তা যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে না। ফলে দুর্ঘটনাজনিত মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে ওইসব ভবনের হাজার হাজার বাসিন্দা। তথ্য-দৈনিক যুগান্তরের।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, এ ধরনের ভবন নির্মাণকালে ২৬ ধরনের সর্তকতামূলক ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা রয়েছে। এগুলো হল- ইলেকট্রিক সাব স্টেশন, সাব স্টেশন স্থাপনে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি অনুসরণ, জেনারেটর, কন্ট্রোল প্যানেল, লাইটিং কনডাক্টর, একজাস্ট ফ্যান, ফায়ার ইমার্জেন্সি স্টিয়ার, ইমার্জেন্সি এক্সিট ইন্ডিকেটর, হোজ ফিটিংস, ইলেকট্রিক পাম্প, ডিজেল পাম্প, জকি পাম্প, ফায়ার লিফট, ফায়ার ফাইটারস, ফায়ার ট্রেইনড পারসন, ইমার্জেন্সি হেলিকপ্টার লেন্ডিং অর লিফটিং এবং ন্যূনতম ৫০ হাজার গ্যালন বেইজমেন্ট ওয়াটার স্টোরিং ক্যাপাসিটি।
২০১০ সালে ফায়ার সার্ভিস পরিচালিত ‘সার্ভে অ্যান্ড স্টাডি অব ফায়ার ফাইটিং সিস্টেমস ইন হাই রাইজ বিল্ডিং অ্যাট ঢাকা সিটি’ শীর্ষক জরিপে দেখা যায়, হাতেগোনা কিছু সংখ্যক বহুতল ভবনে ইলেকট্রিক সাব স্টেশন, জেনারেটর, ফায়ার ফাইটিং টুলস, এক্সটিনগুইসার সুব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার বা সতর্কতা হিসেবে নিয়মিত ফায়ার ড্রিল না হওয়ায় অব্যবহূত পড়ে আছে।
ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১০ সালে দুই সহস্রাধিক সুউচ্চ ভবন থেকে বিভিন্ন উচ্চতার ১০৫টি সুউচ্চ ভবনের ওপর অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা কেমন তা জানতে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, শতকরা মাত্র ২ ভাগ ভবনে যথাযথ নির্দেশনা পালন করে ভবন নির্মিত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা মনে করেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সুউচ্চ এসব ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে ভয়াবহ হতাহতের ঘটনা ঘটবে।
সুউচ্চ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন গ্রাহকসেবা যেমন- বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ইত্যাদি সংযোগ বা প্রাক অনুমোদন দেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের সনদ গ্রহণে ভবন মালিককে বাধ্য করা। কর্তৃপক্ষ দেড় বছর ধরে কাজ করেও কোন কূলকিনারা পাচ্ছেন না। ডিসিসির ১০টি জোনে মোট বহুতল ভবনের সংখ্যা ২ হাজার ১৫০টি। জোনওয়ারি পরিসংখ্যান অনুসারে ১ নম্বর জোনে ১২৯, ২ নম্বর জোনে ২৪০, ৩ নম্বর জোনে ৬৪, ৪ নম্বর জোনে ৪০২, ৫ নম্বর জোনে ৪৬৭, ৬ নম্বর জোনে ২৩৭, ৭ নম্বর জোনে ১৪৭, ৮ নম্বর জোনে ১১৯, ৯ নম্বর জোনে ৩০৭ ও ১০ নম্বর জোনে ৩৮টি বহুতল ভবন রয়েছে। ৪ এবং ৫ নম্বর ভবনে শতকরা ৪০ শতাংশ উচ্চবহুতল ভবন রয়েছে। মোট ভবনের অর্ধেকের বেশি আবাসিক ভবন। এছাড়া বাণিজ্যিক ভবনও রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, রাজধানীতে ৭ থেকে ৯ তলা উচ্চতার ১ হাজার ৪০৪, ১০ থেকে ১৪ তলার ৫০৪, ১৫ থেকে ২৯ তলার ২৪০ ও ২৯ তলার অধিক ২টি ভবন রয়েছে।
এসব ভবন মালিকরা যদি পূর্বে কোন ব্যবস্থা না নেওয়া থাকে তাহলে এখন তরিৎ ব্যবস্থা নিলে বড় ধরনের কোন দুর্ঘটনার হাত হতে রক্ষা পেতে পারেন। কারণ শীত প্রায় শেষের দিকে সামনেই আসছে তাপদাহ। এ সময় আগুনের ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। যেমন ভবন নির্মাণকারীদের সজাগ হতে হবে তেমনি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সকল দুর্ঘটনার হাত থেকে নাগরিকদের রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। #

Advertisements
Loading...