ঘাসের নৌকায় সাগর পাড়ি!

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ ঘাসের নৌকায় সাগর পাড়ি দেওয়ার কথা শুনলে হয়তো অনেকেই আশ্চর্য হবেন। কিন্তু আশ্চর্য হলেও ঘটনা সত্য।

Sea grass boat

টিটিকাকা হ্রদ সমতল থেকে ১২ হাজার ৫০৭ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। অত উঁচুতে নৌকায় চড়ার আনন্দই আলাদা। আবার সে নৌকা যদি হয় ঘাসের তৈরি, তাহলে তো কথাই নেই! ঘাসের নৌকায় চড়তে ভয় পাওয়ারও কিছুই নেই! কারণ ওই নৌকা ডোবে না। অথচ অত উঁচুতে নৌকায় চড়ার সুযোগ আর কোথাও পাওয়া যায় না।

২০০৫ সালে মার্কিন অভিযাত্রী ফিল বাক এই ঘাসের তৈরি নৌকায় চড়েই প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। নৌকাটি ১১ হাজার ৪০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে চিলি থেকে অস্ট্রেলিয়া পৌঁছেছিল ছ’মাসে। প্রাচীনকালে মিসরের মানুষ এই ঘাসের তৈরি নৌকায় চড়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় যেতেন বলে জানা যায়। ঘাসের তৈরি নৌকায় চড়ে যদি বিশাল সাগর-মহাসাগর পাড়ি দেওয়া যায়, তবে টিটিকাকা হ্রদে নৌকায় চড়তে ভয় কিসের টিটিকাকা অবশ্যই অনেক বড় হ্রদ। লম্বায় ১২২ মাইল আর চওড়ায় ৩৫ মাইল। গভীরতা ৩২৫ ফুট থেকে ৮৫০ ফুট। তবে যতই বড় হোক না কেন, মহাসাগরের মতো তা মোটেই নয়। দক্ষিণ আমেরিকায় পেরু ও বলিভিয়া নামে দুটি দেশ আছে। এ দুটি দেশের সীমান্তে আন্দিজ পর্বতমালার ওপর রয়েছে এই হ্রদ। বরফ গলা পানি আর বৃষ্টির পানি জমে এই হ্রদ তৈরি হয়েছে বলে এর পানিও স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ।

প্রতি বছর এই হ্রদ এবং হ্রদের ৪৩টি ঘাসের তৈরি দ্বীপ দেখতে বিশ্বের হাজার হাজার পর্যটক আসেন। ঘাসের তৈরি ভাসমান দ্বীপের বাসিন্দারা ঘুরে বেড়ান ঘাসের তৈরি নৌকোয় চড়ে। পৃথিবীর আর কোথাও এমন দৃশ্য দেখা যায় না। এই হৃদের বাসিন্দাদের বলা হয়, ‘উরো’, আর উরোদের তৈরি ঘাসের দ্বীপগুলোকে বলা হয় ‘উরোস’। উরোদের নিয়ে একটি সুন্দর উপকথাও আছে। অনেক দিন আগে অনেক দূর থেকে পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে ভীষণ কষ্ট করে কিছু আদিবাসী এসেছিলেন এই টিটিকাকা হ্রদের ধারে। তখন সূর্যদেবতা ভিরাকোচা সন্তুষ্ট হয়ে তাদের হাতে ‘তোতোরা’, অনেকে বলেন ‘তোরতোরা’ নামে এক ধরনের ঘাস দিয়ে বলেছিলেন, ‘আশ্চর্য ক্ষমতা আছে এই ঘাসের। এ দিয়ে তোমরা যা করতে চাইবে, তাই করতে পারবে।’ সূর্যদেবতা দিলেন ঘাস, আর পাহাড়ি চিতা দিল তার শক্তি। চতুর্দিকে পাহাড় আর তার মাঝে হ্রদ টিটিকাকা। তাদের থাকার মতো জায়গাও ছিল না, তাই তারা ওই ঘাস দিয়ে তৈরি করেছিলেন বসবাসের জন্য ভাসমান দ্বীপ, মাথা গোঁজার জন্য ঘর আর চলাফেরার জন্য নৌকা। চিতার দেওয়া শক্তি তাদের সাহায্য করল প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যেও টিকি থাকতে। সেই থেকে ওই ঘাস ছাড়া উরোদের জীবন অচল। আমাদের দেশে যে বাঁশ দেখা যায়, সেটিও কিন্তু এক ধরনের ঘাস। তবে তোরতোরা বা তোতোরা ঠিক বাঁশের মতো অত লম্ব নয়, অত মোটাও নয়। আমাদের সুন্দরবনে এক ধরনের ঘাস আছে, যার নাম নল। তোতোরা ঘাসও এই নলের মতো সরু, তবে খুব শক্ত। লম্বায় প্রায় ৫ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত। কোথাও কোথাও এই ঘাস ১৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতেও দেখা যায়। এর গোড়ার দিকটা মোটা, ডগা সরু।

টিটিকাকা হ্রদের ধারে জলাভূমিতে এই ঘাস জন্মায়। উরোরা এই ঘাস কেটে রোদে শুকিয়ে শক্ত করেন এবং পরে নৌকা বা ঘর তৈরি করেন। পরিবারের লোকেরা এসব নৌকা তৈরি করতে অভ্যস্ত, তবে এ কাজে দক্ষ কারিগরও পাওয়া যায়। এই কারিগররা নৌকার সামনের অংশটা সযত্নে নানা পশুপাখির মুখের আদলে তৈরি করেন। তখন সেগুলোর চাহিদা উরোদের কাছে দ্বিগুণ হয়ে যায়। আকৃতিতে এই দ্বীপগুলো খুবই ছোট হয়। বিপদের আশংকা দেখলে দ্বীপগুলোকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। যে ঘাস দিয়ে এই দ্বীপ তৈরি করা হয়, সেগুলো পুরনো হয়ে গেলে তা পাল্টে ফেলেন উরোরা। এভাবে বছরের পর বছর ধরে টিকে আছে দ্বীপগুলো। প্রতিদ্বীপে পাঁচ-ছ’টি থেকে দশ-বারোটি করে গ্রাম। কোনো দ্বীপেই গাড়ি নেই। বেশিরভাগ দ্বীপে হোটেলও নেই।

পর্যটকরা গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের ঘরেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। ছোটখাটো দোকান আছে, তাতে প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায়। কোনো কোনো দ্বীপে চিকিৎসার জন্য ছোটখাটো ক্লিনিক এবং স্কুলও দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা ঘাসের তৈরি নৌকায় চড়ে আশপাশের শহরগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করেন। আজকাল এসব দ্বীপে জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে তা দিনে কয়েক ঘণ্টার জন্য মাত্র। তা সত্ত্বেও পর্যটকরা বলেন, টিটিকাকা হ্রদে বেড়ানোর মজাই নাকি অন্যরকম। কম্পিউটার ও রোবটের যুগেও ঘাসের তৈরি এই নৌকা নিয়ে দিব্যি আছে টিটিকাকা হ্রদের মানুষ। সূত্র: অনলাইন

Advertisements
Loading...