The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

বিবি রাসেল: ডিজাইনে যিনি বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন বিশ্ব মানচিত্রে

ফ্যাশনের সাথে অনেক বাঙালির নাম জড়িত। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিবি রাসেল

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ বাংলাদেশ বৈশ্বিক ফ্যাশনে বৈশিষ্ট্যযুক্ত হয়েছে কিভাবে সেই প্রশ্ন আসতেই পারে। বৈশ্বিক ডিজাইনে বাংলাদেশকে কে তুলে ধরেছেন? সেই প্রশ্নও আসতে পারে। তিনি আর কেও নন বিবি রাসেল। কোথা হতে কীভাবে তিনি উঠে এসেছেন?

বিবি রাসেল: ডিজাইনে যিনি বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন বিশ্ব মানচিত্রে 1

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নানা দৃশ্য উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নীত হলেও ফ্যাশন শিল্প এখনও নবজাতক পর্যায়েই রয়েছে। যাইহোক, ফ্যাশনের সাথে অনেক বাঙালির নাম জড়িত। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিবি রাসেল। আমরা তাকে জানি, তবে আমি নিশ্চিত নই যে আমরা তার অর্জনের মাত্রা কতখানি জানি।

আমি বিস্মিত হয়ে যায়, যখন প্রথম জানতে পারি যে বিবি রাসেল, যাকে আমরা (“গামছা লেডি”) হিসেবেই চিনতাম। আজকের কথা নয় ২০ বছর আগের কথা, তখন প্যারিস ফ্যাশন সপ্তাহে বেড়াতে এসে প্রথমে দেখি তাকে। তিনি আরও অনেকের মধ্যে বিশেষ করে ভোগ, হার্পার বাজার, কসমোপলিটন, জর্জিও আরমানি, ইয়ভেস সেন্ট লরেন্ট, কার্ল লেগারফিল্ডের মতো নামী দামি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন।

এমনকি অ-ফ্যাশন সচেতন বাঙালিরাও তার নাম এবং খ্যাতি শুনে বড় হয়েছে। এটি গামছা প্রিন্টের প্রতি তার আইকনিক ভালোবাসার কারণেই হোক বা যে কারণেই হোক। কীভাবে তিনি বিবি রাসেলকে এক পরিচিত নাম হিসাবে পরিণত করলেন?

শিক্ষা জীবন

বিবি রাসেলের স্কুল জীবন কটেছে কামরুন্নেসা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসেবে। এখান থেকে ১৯৬৬ সালে মাধ্যমিক ও ১৯৬৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীকালে তিনি গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ থেকে বিএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৭২ সালে প্রথম বাংলাদেশী নারী হিসেবে বিবি রাসেল যুক্তরাজ্যের লন্ডন কলেজ অব ফ্যাশনে অধ্যয়ন করার সুযোগও পান।

বিবি রাসেল: ডিজাইনে যিনি বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন বিশ্ব মানচিত্রে 2

লন্ডনে প্রথম বছর তার খুব কষ্টে দিন কেটেছে। তিনি ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠতেন তারপর সারাদিন ক্লাস করে রাতে ঘরে ফিরতেন। নিজের খরচ চালানোর জন্য চিঠি সরবরাহসহ আরও বিভিন্ন ধরনের খন্ডকালীন চাকরিও করেছিলেন। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটিতেও তিনি কাজ করেছেন। তবে বিবি রাসেল তার কষ্টের কথা মা বাবাকে কখনও জানতে দেননি। ১৯৭৫ সালে লন্ডন হতে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

মডেলিং

স্নাতক শেষ হওয়ার পরের দিন তার অধ্যক্ষ তাকে জানান, বিখ্যাত মডেল এজেন্ট লারাইন অ্যাশটন বিবিকে মডেল হিসেবে নিতে চান। প্রথমদিকে তিনি মডেলিংয়ে আসতেও চাননি। তবে তার অধ্যাপকরা তাকে মডেল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কারণ এতে করে তিনি ফ্যাশন জগত সম্পর্কে আরও অনেক জ্ঞান লাভ করতে পারবেন।

১৯৭৬ সাল হতে বিবি মডেলিং শুরু করেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত টানা ১৬ বছর তিনি ছিলেন ভোগ, হারপারস বাজার ও কসমোপলিটনের মতো খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মডেল।এছাড়াও জর্জিও, কার্ল, কোকো শ্যানেল, বিএমডব্লিউ, ইভস সেন্ট লরেন্ট, টয়োটা, কোডাক, কার্ল লেগার ফিল্ড, আরমানিসহ অসংখ্য অভিজাত ব্র্যান্ডের মডেল ছিলেন এই বাংলাদেশের কন্যা বিবি রাসেল। ক্যাটওয়াক করেছেন নাওমি ক্যাম্পবেল, ক্লদিয়া শিফারের মতো বিশ্বখ্যাত সুপার মডেলদের সঙ্গেও।

বিবি রাসেলের স্বপ্ন

বিবি বাংলাদেশে ফিরে স্থানীয় কারিগর ও তাঁতিদের জন্য কিছু একটা করতে চেয়েছিলেন। যখন তিনি তার সহকর্মীদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করেন, তখন তারা এই বিষয়টিকে তেমন একটা পাত্তা দেননি। উল্টো তার এজেন্ট তাকে দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে, বরং সিনেমাতে অভিনয়ের কথা চিন্তা করতে বলেছিলেন। তবে তিনি দেশের জন্য কিছু একটা করতে চেয়েছিলেন। বিবি রাসেল যখন বুঝতে পারলেন দেশে নিজের যাত্রা শুরু করতে তিনি প্রস্তুত হয়েছেন, তখন তিনি সবকিছু ফেলে রেখে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে ফিরে এলেন। দেশে এসে মনোযোগ দেন দেশীয় হস্তশিল্পকে বিশ্ববাজারে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। চেষ্টা চালিয়ে যান মসলিনের হারানো ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনতে।

বিবি রাসেল: ডিজাইনে যিনি বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন বিশ্ব মানচিত্রে 3

বাংলাদেশের বস্ত্র ও হস্তশিল্পকে পুনরুদ্ধার করেন বিবি

বিবি তার মাকে সব সময় বলতেন যে, তিনি স্থানীয় তাঁত শিল্পের অবস্থার উন্নতি করতে কাজ করবেন। এই লক্ষ্যে পরের দেড় বছর বিবি দেশের প্রতিটি অঞ্চল চষে বেড়িয়েছেন, তাঁতি ও কারিগরদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের খোঁজ খবর নিয়েছেন। শুধু দেশেই নয়, ভারত, শ্রীলঙ্কা, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ডেনমার্ক ও কম্বোডিয়ার তাঁতিদের নিয়ে তিনি কাজ করেন। গ্রামীণ মানুষের প্রতি তার রয়েছে অগাধ ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধাবোধ। তিনি মনে করেন, একমাত্র তাদের কারণে তিনি সকল সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।

বিবি প্রোডাকশন

বিবি রাসেল দেড় বছরের কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে তার সংস্থা বিবি প্রোডাকশনের যাত্রা শুরু করে। তিনি তার জীবনের সকল সঞ্চয় বিবি প্রোডাকশনে বিনিয়োগ করেন। তিনি নিজেই ড্রেস, ব্যাগ, জুতা, স্কার্ফ, ওড়না, অলংকার, চুড়ি ইত্যাদির নকশা করতে থাকেন। বিবি রাসেল যে পণ্য তৈরি করতে যে উপকরণ ব্যবহার করতেন তা সবই হস্ত বোনা এবং প্রাকৃতিক।

বিবি বলেন, “আমি সিন্থেটিক উপকরণ ব্যবহার করি না। আমি যে কাপড়গুলি ব্যবহার করি তা হলো খাদি, সিল্ক, তুলা, গামছা, পাট, পূর্ণব্যবহারযোগ্য কাপড় এবং জামদানি’’। তাছাড়াও বিবি রাসেল রিকশা আর্টের উপর ভিত্তি করে চশমার ফ্রেমও ডিজাইন করেন। আমাদের দেশের গামছাকে বিবি রাসেল দেশ বিদেশে তুলে ধরেছেন।

সম্মাননা

এখন পর্যন্ত অনেক দেশী-বিদেশী অসংখ্য পুরস্কার, স্বীকৃতি ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন বিবি রাসেল। ১৯৯৭ সালে ‘এল ম্যাগাজিন’ এর বিবেচনায় বর্ষসেরা নারী হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন। ২০০১ সালে ইউনেস্কো তাঁকে ‘শান্তির শিল্পী’ পদক দেন। ২০০৪ সালে স্পেনের জাতিসংঘ সমিতির শান্তি পুরস্কার পান তিনি।২০০৮ সালে ইউএনএইডস তাঁকে শুভেচ্ছা দূত হিসেবে মনোনীত করে। ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি “দ্য ক্রস অফ অফিসার অফ দ্য অর্ডার অফ কুইন ইসাবেলা’’ পুরস্কারে ভূষিত হন।

বিবি রাসেল: ডিজাইনে যিনি বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন বিশ্ব মানচিত্রে 4

২০১৩ সালের নারী দিবস উপলক্ষে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক জনপ্রিয় ফ্যাশন ব্লগ ‘ফ্যাশন কম্প্যাশন’ ফ্যাশনে ব্যাপক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ১০ নারী ফ্যাশন ডিজাইনারের নামের তালিকা ঘোষণা করেছিলো। এই ১০ নারীর মধ্যে এশিয়ার একমাত্র ডিজাইনার হলেন বিবি রাসেল।

২০১৫ সালে নারীর সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারী জাগরণ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বেগম রোকেয়া পদকে ভূষিত করেছিলো। উপরোক্ত সম্মাননা ছাড়াও আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন বিবি রাসেল। দেশের তাঁতিদের জন্যে, শিল্পের জন্যে বিবি রাসেল সব সময় স্মরণীয় এবং বরণীয় হয়ে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে।

তথ্যসুত্রঃ রিভোলি ডটকম, ফ্যাশন্সবিডি ডটকম, ডেইলি স্টার, টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া, ট্যারামনবিডি ডট কম ও হাইফাই পাবলিক ডট কম।

Loading...