শিশুর জন্মগত হৃদরোগ সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ শিশুর জন্মগত হৃদরোগ একটি বড় সমস্যা। আমাদের দেশে অসচেতনার কারণে এর হার একেবারে কম নয়।

Child's Heart Disease

এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে ন্যূনতম ৮ জন জন্মগত হূদরোগ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। শিশুর জন্মগত হূদরোগ বলতে হূৎপিণ্ড ও সংশ্লিষ্ট রক্তনালিগুলোর গঠন, কার্যপ্রণালী প্রভৃতির অস্বাভাবিকতাকে বোঝায়। ধারণা করা হয়, বংশগত বা পরিবেশগত কারণে জন্মগত হূদরোগ হয়ে থাকে। কিছু কিছু হূদরোগ শিশুর জন্মের পরপরই প্রকাশ পায়, আবার কিছু কিছু জন্মগত হূদরোগ সারা জীবন অপ্রকাশিত বা অজানা থেকে যায়।

ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট (ভিএসডি)

জন্মগত হূদরোগীদের মধ্যে সর্বাধিক শতকরা ৩৬ ভাগ এই সমস্যায় আক্রান্ত। ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট বলতে বোঝায় হূৎপিণ্ডের বাম ও ডান ভেন্ট্রিকলকে পৃথককারী পর্দার মধ্যে এক বা একাধিক ছিদ্রের উপস্থিতি। ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট থাকলে শিশুর শরীরে অক্সিজেনযুক্ত বিশুদ্ধ রক্ত অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ দূষিত রক্তের সঙ্গে মিশে যায়, যা নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট খুব ছোট হলে তা কোনও লক্ষণ প্রকাশ করে না এবং তা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনা-আপনি ভালো হয়ে যায়। তবে ছিদ্রের আকার বড় হলে বাচ্চার হার্ট ফেইলিউর হতে পারে। দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, শ্বাসকষ্ট, বুকের অস্বাভাবিক ওঠানামা, বয়স অনুপাতে ওজন না বাড়া, বার বার কাঁশি বা ঠাণ্ডা লাগা, অল্পতেই হাপিয়ে ওঠা, গায়ের রং পরিবর্তন হয়ে নীল হয়ে যাওয়া প্রভৃতি এ রোগের প্রধান লক্ষণ।

কার্ডিয়াক ক্যাথেরাইজেশনের মাধ্যমে বড় কোনও কাটা-ছেড়া ছাড়াই এ রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব, তবে অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করার মাধ্যমে এ রোগের চিকিৎসা করাতে হয়।

এট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেক্ট (এএসডি)

হূৎপিণ্ডের উপরের অংশের দুটি প্রকোষ্ঠের মাঝে ছিদ্র থাকলে তাকে এট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেক্ট বলে। ছোট আকারের ছিদ্র থাকলে ভিএসডি-র মতো এএসডিও আপনা-আপনি ঠিক হয়ে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা ভালো না হলে কার্ডিয়াক ক্যাথেরাইজেশন বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই রোগের চিকিৎসা করা হয়।

এট্রিও ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট (এভিএসডি)

এই সমস্যাটি একটু জটিল প্রকৃতির। মোট জন্মগত হূদরোগের শতকরা ৪ ভাগ রোগী এ সমস্যায় আক্রান্ত। এখানে হূৎপিণ্ডের দুই প্রকোষ্ঠের মাঝখানে ছিদ্র থাকে এবং একই সঙ্গে রক্ত প্রবাহ নিয়ন্ত্রণকারী বাল্বগুলো সঠিকভাবে কাজ করে না। এট্রিও ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট হলে হূৎপিণ্ড অতিরিক্ত পরিশ্রম করে ফুসফুসে বেশি বেশি রক্ত পাঠায়, ফলে হূৎপিণ্ড আকারে বড় হয়ে যায় এবং ফুসফুসে রক্তচাপ বেশ বেড়ে যায়। জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়।

পালমোনারি স্টেনোসিস

আমাদের শরীরে পালমোনারি বাল্বের অবস্থান হল রাইট ভেন্ট্রিকল ও পালমোনারি আর্টারির মাঝে এবং এতে তিনটি লিফলেট বা পাতা থাকে যা ফুসফুসে রক্তের একমুখী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। পালমোনারি স্টেনোসিসের ক্ষেত্রে পালমোনারি বাল্ব সংশ্লিষ্ট লিফলেটগুলো বা পালমোনারি আর্টারিগুলো সঠিকভাবে রক্ত প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারে না, ফলে রাইট ভেন্ট্রিকল থেকে ফুসফুসে রক্ত প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটে। অনেক ক্ষেত্রেই শিশু বড় না হওয়া পর্যন্ত এই রোগের কোনও লক্ষণ প্রকাশ পায় না। রোগীর অবস্থা বিবেচনায় কম কাটা ছেড়ার কার্ডিয়াক ক্যাথেরাইজেশন বা বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এ রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়।

কোয়ার্কটেশন অফ অ্যাওর্টা

অ্যাওর্টার কোনও অংশ স্বাভাবিকের চেয়ে চিকন হয়ে গেলে তাকে কোয়ার্কটেশন অব অ্যাওর্টা বলে। প্রচণ্ড ঘাম, সব সময় পা ঠাণ্ডা থাকা, ওজন বৃদ্ধি না পাওয়া, দুই পা শরীরের অনুপাতে চিকন হয়ে যাওয়া, পায়ে পালস না পাওয়া বা দুর্বল পালস, শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হওয়া প্রভৃতি এ রোগের প্রধান লক্ষণ। বেলুন ডাইলেশনের মাধ্যমে বড় কোনও অস্ত্রোপচার ছাড়া কোয়ার্কটেশন অফ অ্যাওর্টার চিকিৎসা সম্ভব। তবে অনেক ক্ষেত্রে বড় রকমের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়।

বাইকাসপিড এওর্টিক বাল্ব ডিজিস

এওর্টিক বাল্বের অবস্থান আমাদের হূৎপিণ্ড ও অ্যাওর্টার (প্রধান রক্তনালি) মাঝে যা শরীরে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহের গতিপথ ঠিক রাখে। সাধারণত বাল্বে তিনটি লিফলেট থাকে যার বন্ধ ও খোলার মাধ্যমে রক্তের গতিপ্রবাহ ঠিক থাকে। কোনও শিশুর বাল্বে তিনটির পরিবর্তে দুটি লিফলেট থাকলে তাকে বাইকাসপিড এওর্টিক বাল্ব ডিজিস বলে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাল্ব প্রতিস্থাপন বা ক্যাথেরাইজেশনের মাধ্যমে বাল্বোপ্লাস্টি করে এই রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। শ্বাসকষ্ট, অতি সহজেই হাপিয়ে যাওয়া, প্রচণ্ড ঘাম প্রভৃতি এ রোগের প্রধান লক্ষণ।

# মোঃ আবু জাফর সাদেক, ফার্মাসিস্ট, সিনিয়র ডেপুটি ম্যানেজার, রেনাটা লিমিটেড।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...