ফেলানী হত্যাকাণ্ড ॥ ‘মাইয়াডারে পাখির মতোন মারলো- বিচার হইলো না’

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ বহুল আলোচিত ফেলানী হত্যাকাণ্ডের রায় শুনে ফেলানীর বাবা এই রায়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মাইয়াডারে পাখির মতোন মারলো-বিচার হইলো না’।

Phelani killings

সেই পুরোনো কথাটি আবার জনসমক্ষে এসেছে, ‘বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে’। বহুল আলোচিত ফেলানী হত্যাকাণ্ডের রায় গতকাল ভারতের বিশেষ আদালত দিয়েছে। সবার ধারণা ছিল সীমান্তে হত্যার কোন বিচার কোন দিন ভারত করেনি। তবে এবার যখন বিচার করছে ন্যায় বিচারই হবে। কিন্তু সবার সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। অভিযুক্ত বেকসুর খালাস পেয়েছে।

বহু প্রতিক্ষিত ওই রায় হয়েছে গতকাল ভারতের বিশেষ আদালতে। রায় শোনার পর নিহত ফেলানীর বাবা ক্ষোভ ও ঘৃণায় ডুকরে ওঠেন। কারণ তার ধারণা ছিল বিচার যখন শুরু হয়েছে, তখন ন্যায় বিচার তিনি পাবেন। কিন্তু তিনি নিরাশ হয়েছেন। সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘ভারতে সাক্ষী দিয়া আইসা আশা করছিলাম, বিচার পামু। কিন্তু এ কেমুন বিচার, বুঝলাম না। মাইয়াডারে চোখের সামনে পাখির মতোন মারলো, তার কোন বিচার হইলো না।’ ভারতের আদালতে ফেলানী হত্যা মামলায় অভিযুক্ত আসামি বিএসএফ হাবিলদার অমিয় ঘোষ বেকসুর খালাস পাওয়ায় এভাবে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন পিতা নুরুল ইসলাম নুরু। তিনি বলেন, আমার মেয়ে হত্যার বিচার নিয়ে আমি আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে চাই। আর এ আইনি লড়াইয়ে চাই সরকারের সহযোগিতা। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ফেলানী হত্যার মামলার রায়ে অভিযুক্ত বিএসএফ হাবিলদার অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। ভারতের কুচবিহারের ১৮১ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তরে বিশেষ আদালত জেনারেল সিকিউরিটি কোর্ট এ রায় ঘোষণা করেন। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টায় এই রায় ঘোষণা দিয়ে যথাযথ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর আব্রাহাম লিঙ্কন এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের পশ্চিম বাংলার প্রতিনিধি মধুপূর্ণা দাস তাকে ফোনে এই রায় নিশ্চিত করেছেন। রায়ে ফেলানীর হত্যাকারী বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয়ার খবরে বিস্মিত মা জাহানারা বেগমও। তিনি বলেন, ‘আমার নির্দোষ মাইয়াডারে যে খুন করেছে তার ফাঁসি চাইছিলাম। কিন্তু বিচারের নামে হেরা তামাশা করলো। ভারত সরকার আমাদের সাথে বেইমানি করেছে।’

ফেলানীর মামলার শুনানিতে অংশ নেয়া বাংলাদেশের আইনজীবী কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন বলেন, ‘এই রায়ে ন্যায়বিচার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। হত্যাকারীর বিচারের মাধ্যমে সীমান্ত হত্যা বন্ধের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তা তিরোহিত হলো। এই রায় মানবাধিকারের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং আত্মস্বীকৃত খুনকে বৈধতাদানের শামিল। এ রায় বহাল থাকলে আগামীতে সীমান্ত এলাকায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আরও বৃদ্ধি পাবে। কারণ অভিযুক্ত আসামি নিজে খুনের কথা স্বীকার করেছেন আদালতে। এছাড়া সাক্ষ্য-প্রমাণেও অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে যে- বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ গুলি করে ফেলানীকে হত্যা করে। শুধু তাই নয়, সীমান্ত অপরাধ হিসেবে বিএসএফ পক্ষ নিজে বাদী হয়ে ২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি তাদেরই এক সদস্য অমিয় ঘোষকে আসামি করে স্থানীয় থানায় মামলা দায়ের করে। প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পেয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। ভারতীয় পুলিশও তাকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করে।’ কুড়িগ্রাম ৪৫ বিজিবির ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর সৈয়দ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, ভারতের বিএসএফের কাছে মামলার রায়ের ব্যাপারে একাধিকবার যোগাযোগ করে বিষয়টি চেষ্টা করা হলেও এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি জানান, শুনানির সময় আসামিপক্ষ নানাভাবে কন্ট্রাডিকশন তৈরির চেষ্টা করলেও ফেলানীর বাবা ও মামা সঠিকভাবে সাক্ষ্য দেয়ায় আশা করা হয়েছিল, আসামির সর্বোচ্চ সাজা হবে।

উল্লেখ্য, গত ১৩ই আগস্ট ভারতের কোচবিহারের সোনারী এলাকায় বিএসএফের উদ্যোগে গঠিত একটি বিশেষ আদালতে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ফেলানী হত্যার বিচার শুরু হয়। ৫ সদস্যের বিচারক মন্ডলীর সভাপতিত্ব করেন বিএসএফর গৌহাটি ফ্রন্টিয়ারের ডিআইজি সিপি ত্রিবেদী। বিচারের প্রথম দিন গত ১৩ই আগস্ট মামলার নথিপত্র জমাসহ একমাত্র আসামি বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের জবানবন্দি নেয়া হয়। অমিয় ঘোষের বিরুদ্ধে ভারতীয় দন্ডবিধির ৩০৪ ধারায় (অনিচ্ছাকৃত খুন) এবং বিএসএফ আইনের ৪৬ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এ ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তথ্যসূত্র: বিভিন্ন অনলাইন সংবাদ মাধ্যম।

ধৈর্য ধরার পরামর্শ ভারতের

ফেলানী হত্যার রায়ের পর বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার আহবান জানিয়েছে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন। হাইকমিশনের একজন মুখপাত্র বলেন, এটি ছিল ফেলানী হত্যার বিচারের ‘প্রথম ধাপ’। বিডিনিউজ

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফের বিশেষ আদালত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যামামলার রায় দেয়, যাতে অভিযুক্ত বিএসএফের হাবিলদার অমিয় ঘোষকে ‘নির্দোষ’ বলা হয়। চূূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এ রায় বাহিনীর মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে বিএসএফ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এ খবরে হতাশা প্রকাশ করে ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম বলেন, তিনি ‘সঠিক’ বিচার চান, ন্যায়বিচার চান।

আর ফেলানীর পরিবারকে আইনি সহায়তা দেওয়া কুড়িগ্রাম জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এসএম আব্রাহাম লিংকন বলেন, এ রায় অনুমোদন পেলে বিএসএফের বেপরোয়া মনোভাব আরও উৎসাহিত হবে।

ভারতীয় হাইকমিশনের মুখপাত্র বলেন, ‘রায়ের বিষয়টি এখন যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা উচিৎ।’

Advertisements
Loading...