দুই নেত্রীর ফোনালাপ: সংকটের সমাধান কতদূর?

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ দুই নেত্রী ফোনালাপ করবেন এমন খবরে দেশবাসী অনেকটা স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে গিয়ে দেখা গেলো অনেকটা অন্য রকম। যদিও এখনও জনগণ আশাবাদি দুই নেত্রী বসবেন এবং জাতির এই মহা সংকট নিরসন হবে।

Hasina-Khaleda

গতকালের ফোনালাপের পর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ব্যাপক লেখা-লেখি শুরু হয়েছে। রাতে টিভির টকশো গুলোতেও এই বিষয় নিয়ে বিষদ আলোচনা হয়েছে। তবে সবাই বিষয়টিকে পজেটিভলি দেখতে চান।

ডাক্তার আসিবার আগেই রোগী মারা গেল

আমাদের সময় পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ‘সংলাপ কিংবা সমঝোতা রাজনৈতিক সংকটে এ মুহুর্তে দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি আকাঙ্খিত হলেও পারস্পরিক আস্থার সংকটে তা মাঠে মারা গেল। প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন করলেন, কিন্তু ‘ডাক্তার আসিবার আগেই রোগী মারা গেল’ এমন আপ্তবাক্যের মধ্যে দিয়ে নৈশভোজের আমন্ত্রণে সীমাবদ্ধ রইল সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যেকার আলোচনা।’

জাতি দুঃখিত, লজ্জিত, হতাশ

একই পত্রিকার আরেকটি আর্টিকেল। তাতে বলা হয়েছে, ‘দুঃখিত বিরোধীদলের নেতা, আপনার অবস্থানে জাতি দুঃখিত, লজ্জিত, হতাশ। আপনার একটি সম্মতি, জাতিকে আশঙ্কা, উদ্বেগ থেকে মুক্তি দিতে পারতো। জাতিকে এক দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে স্বস্তি দিতে পারতো। কিন্তু আপনি সমঝোতার পথে গেলেন না। এ ঘটনায় অনেকের মতো আমাদেরও প্রশ্ন- আপনার মূল লক্ষ্য কি একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচিত সরকার, নাকি অন্য কিছু।’

‘২৫ অক্টোবর নিয়ে সারা জাতি ছিল উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে বিরোধীদলকে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হলো। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিরোধীদল সমাবেশ করলো। সমাবেশের দিনই আমরা তথ্যমন্ত্রীর মাধ্যমে জানতে পারি যে, প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলের নেতাকে টেলিফোন করবেন। গণতন্ত্রের প্রতি যাদের বিন্দুমাত্র আস্থা, তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করেছিলেন যে, তথ্যমন্ত্রীর মতো একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির আশ্বাসের পর বিরোধীদল কোনও কর্মসূচি না দিয়ে আলোচনার জন্য সময় দেবে, অপেক্ষা করবে। বিরোধীদলের নেতার বক্তব্যের মধ্যেও তেমন ইঙ্গিত ছিল। বিরোধীদলের নেতা বলেছিলেন, ‘শনিবারের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ না নেওয়া হলে রোববার থেকে ৬০ ঘণ্টার হরতাল।’ অর্থাৎ শনিবারের মধ্যে আলোচনার সূত্রপাত করতে হবে, নইলে হরতাল।’

সেই কাঙ্খিত ফোন: কথা হলো যেভাবে

বহুল আকাঙ্খিত সেই টেলিফোনটি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথা বললেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে। তিনি আগামীকাল (২৮ অক্টোবর) নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি আজ থেকে শুরু হওয়া টানা হরতাল প্রত্যাহারের আহ্‌বান জানান। তিনি বলেন, আসুন আমার এবং আপনার দেয়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করি। জবাবে খালেদা জিয়া জানিয়েছেন, সোমবার নয়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় তিনদিনের হরতাল শেষে যে কোনো সময় তিনি আলোচনায় বসতে রাজি আছেন। প্রধানমন্ত্রী যদি নীতিগতভাবে নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নেন, তাহলে সামনের সব কর্মসূচিও স্থগিত করা হবে।

সন্ধ্যা ৬টা ২১ মিনিটে বিরোধীদলীয় নেতার বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের মোবাইলে ফোন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফোনালাপের সময় প্রধানমন্ত্রী গণভবনে আর বিরোধীদলীয় নেতা তার গুলশানের বাসভবনে ছিলেন। উভয়ে কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে কথা শুরু করেন। দেশের শীর্ষ দুই দলের দুই নেত্রী প্রায় ৪০ মিনিট ফোনালাপ করেন। দেশের চলমান সংকটসহ প্রায় সব ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেন তারা। তাদের আলাপে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের করণীয় নিয়েও আলোচনা হয়।

কিন্তু এই দীর্ঘ ফোনালাপের পরও দেশবাসী পুরোপুরি যেন হাঁফ ছাড়তে পারল না। কারণ সবার প্রত্যাশা ছিল দুই নেত্রীর কথা বলার পর টানা তিনদিনের হরতাল প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্‌বানে দেরি হয়ে গেছে এমনটা জানিয়ে এ মুহূর্তে তা প্রত্যাহার করা সম্ভব নয় বলে বিরোধীদলীয় নেতা জানান। বিরোধী দলীয় নেতার প্রেস সচিব সাংবাদিকদের জানান, ১৮ দলের প্রায় সব নেতা আত্মগোপন করে আছেন। পুলিশ তাদের নানা ভাবে ঝামেলা করছেন। এই মুহূর্তে তাদের পাওয়া না গেলে কিভাবে কর্মসূচি প্রত্যাহার হবে। কারণ এ কর্মসূচি বিএনপি’র একার নয়। এ কর্মসূচি ১৮ দলের।

কূটনীতিকরা স্বাগত জানিয়েছেন

দুই নেত্রীর ফোনালাপকে স্বাগত জানিয়েছেন ঢাকায় বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কূটনীতিকরা। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া টেলিফোনে কথা বলেন। ফোনে প্রধানমন্ত্রী কাল সোমবার সন্ধ্যায় বিরোধীদলীয় নেতাকে গণভবনে নিমন্ত্রণ জানান। এ বিষয়ে জানতে ঢাকায় বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর দূতাবাসগুলোর কয়েকটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা একে অত্যন্ত ইতিবাচক অভিহিত করে। তারা আশা করে, আলোচনা শুরু হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো সংঘাত হতে পারে বা আলোচনার পরিবেশে নষ্ট হতে পারে এমন কর্মসূচি পরিহার করবে। খবর সংবাদ মাধ্যমের।

কূটনীতিকরা মনে করেন, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে ইতিবাচক কথোপকথন দেশের জনগণ, কূটনীতিক মহলে স্বস্তি বয়ে আনবে। এটি একটি শুভ সূচনা। বিরোধীদলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীর নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে আলোচনার সুযোগ কাজে লাগাবেন এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের ইতিবাচক যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে বাংলাদেশের বিদেশি বন্ধুরা আশা করেন।

শেষ কথা

ঘটনার আগে পিছে যায়ই থাক না কেনো। দেশবাসী মনে করে এখনও সময় আছে দেশের এই মহা সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার। যেহেতু ফোনালাপের মাধ্যমে আলোচনা একটি পথ তৈরি হয়েছে। সেই পথ ধরেই শীঘ্রই দুই নেত্রী আলোচনায় বসে একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ তৈরি করবেন। জাতিকে এই মহা সংকট থেকে মুক্তি দেবেন। কারণ জনগণ হরতাল, ধর্মঘটের মতো সহিংস কর্মসূচিকে কখনও গ্রহণ করবে না। জনগণ মনে করে, এখনও যথেষ্ট সময় আছে দু’দলের দুই প্রধান আলোচনায় বসে সে পথ সুগম করবেন এবং জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেবে যে নির্বাচনে দেশের সব দল স্বানন্দে অংশগ্রহণ করবেন।

Advertisements
Loading...