একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন: পাহাড় কেন ধসে পড়ে

হাসান কামরুল ॥ পাহাড় ধস, এটা নতুন কোন বিষয় নয়। প্রতি বছরই আমরা এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছি। বছরের এ সময়টাতে পাহাড় ধসের কারণে লাশের মিছিল শুরু হয়। এবার প্রায় ১০০ জনের প্রাণ গেল। বহুবার বহু ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির পরও পাহাড়কে নিরাপদ মনে করে বসবাস করার যুক্তি কি? এমন প্রশ্ন সাধারণ জনগণের মধ্যে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। এর পেছনের গূঢ় রহস্য উদ্ভাবন করার কিছু নেই। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরেকটু পরিষ্কার করে বললে উপজাতি জনগোষ্ঠীর লোকজন সাধারণত পাহাড়ে বসবাস করে। সমভূমিতে বসবাস করে না বা করতে চায় না এমন উপজাতিরও জাতভেদ রয়েছে।

সাধারণত রাখাইন কিংবা সং উপজাতির লোকেরা পাহাড়ে বাস করে। সাঁওতাল, মারমা বা মুরুং নৃগোষ্ঠীর উপজাতিরা পাহাড় ও সমতল উভয় জায়গাতেই স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে বসবাস করে। যে শিশুটি পাহাড়ের ঢালে জন্মগ্রহণ করে, সে কিন্তু পাহাড়কেন্দ্রিক জীবনকে বেছে নিতেই পছন্দ করে। আরেক শ্রেণীর লোক উপজাতি না হয়েও পাহাড়ি জীবনকে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। যাদের খাঁটি বাংলায় বাস্তুহারা বলা হচ্ছে। বাস্তুহারাই বলি আর উপজাতিই বলি, যারা পাহাড়ে বাস করে তাদের জীবন বছরের পর বছর বিপন্ন হয়ে উঠছে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর সরকার বিপন্ন মানুষকে উদ্ধারে যে তৎপরতা দেখায়, বছরের অন্য সময়ে তাদের খবর রাখে না কেউ। অনেক এনজিও আছে এসব পাহাড়ি মানুষের জীবনযাপন নিয়ে কাজ করে বাইরে থেকে কোটি টাকার ফান্ড নিয়ে আসছে। কিন্তু সে ফান্ড পাহাড়ি জীবনে কোন প্রভাব ফেলে না। কিন্তু তাদের পুঁজি করে এনজিওওয়ালাদের জীবনে খুব ভালোভাবেই স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসছে।

পাহাড় কেন ধসে পড়ে? এ প্রশ্নের অনুসন্ধানে যদি ফিরি, তাহলে পাহাড়ি অঞ্চলে মাটির স্তরভেদের গঠন বিন্যাসকে বিবেচনায় নিতে হয়। পৃথিবীজুড়েই তিন ধরনের পাহাড় বিদ্যমান। আগ্নেয় শিলার পাহাড়, পাললিক শিলার পাহাড় ও রূপান্তরিত শিলার পাহাড়। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির গঠন বৈচিত্র্যে পাললিক শিলার পাহাড়ের অস্তিত্ব স্পষ্ট। এ ধরনের পাহাড়ের মাটিগুলোর পারস্পরিক বন্ধন মজবুত নয়, খাঁটি বাংলায় বলা যায় মাটির স্তরের বন্ধনগুলো আলগা থাকে। অর্থাৎ এখানে কোন কঠিন শিলার উপস্থিতি নেই। বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঝরনাধারায় এ ধরনের মাটি ক্রমাগত পানি চুষে ফুলেফেঁপে থাকে। ফলে মাটির ভেতর ফাঁকা স্থানে পথ বা সুড়ঙ্গ তৈরি হয় এবং মাটির অভ্যন্তরীণ গঠনে পানির সহজ প্রবেশের কারণে মাটিগুলো নরম ও পিচ্ছিল হয়। ফলে যখন ভারি বর্ষণ হয় মাটি বিশাল আকারে চাঙ্ক ধরে ভেঙে পড়ে। আর ওই চাঙ্কে যাই-ই থাকে তা বলকৃত প্রেসারে নিচে ধসে পড়ে। যা জান ও মালের জন্য প্রভূত ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

দুই. পাহাড়ে যারা বাস করে তারা সাধারণত পাহাড়ের ঢালে ঘর তৈরি করে থাকে। এর কারণ বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করা। অনেক হিংস্র প্রাণী সাধারণত ঢালু জায়গায় বিচরণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। যদিও মাঝে মাঝে হাতির আক্রমণের খবর পাওয়া যায়। তবে তা সমতল জায়গার তুলনায় পাহাড়ের ঢালে কম বলেই প্রতীয়মান। পাহাড়ের ঢালে ঘর তৈরি করতে গিয়েই পাহাড়ে বসতিরা প্রথম সর্বনাশ করছে। কারণ গৃহনির্মাণে পাহাড়ের সবচেয়ে শক্ত মাটির স্তর, অর্থাৎ ক্লে বা কাদামাটির স্তরকে কেটে গৃহ নির্মাণ করা হচ্ছে। যার ফলে পুরো পাহাড়ের বিভিন্ন মাটির স্তর যার ওপর দণ্ডায়মান সে জায়গাটা নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে, যা পাহাড়ি জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনছে।

তিন. পাহাড়ের মাটির গুণাগুণ আমলে নিলে সাধারণত দুই ধরনের মাটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বেলে ও কাদামাটি। বেলের স্তর সরাসরি কাদামাটির স্তরের ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে থাকে। এভাবে একের পর এক বেলে ও মাটির স্তরের পুনর্বিন্যাসেই পাহাড় দাঁড়ায় বা এর অস্তিত্ব স্পষ্ট হয়। এসব স্তরের ভেতরে আবার ফল্ট লাইন বা ভূ-ফাটল দেখা যায়। এসব ফাটল সৃষ্টির পেছনে পৃথিবীর আবর্তনের চিহ্ন লুকায়িত থাকে। পৃথিবীর সাব-সারফেসে পুঞ্জীভূত শক্তির বিস্ফোরণে পাহাড়ের ভূ-ফাটল কাজ করে। যা ভূমিকম্প হিসেবে সমধিক পরিচিত। শুধু প্রবল বর্ষণেই পাহাড়ি ঘরবাড়ি ধসে পড়ে না, বড় কিংবা মাঝারি ধরনের ভূমিকম্পের আঘাতেও পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারীদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে।

সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো বেশি বিপজ্জনক। এর কারণ এ পাহাড়গুলোর বেড়ে ওঠার বয়স কম, বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়গুলোর তুলনায়।

প্রাকৃতিক এসব কারণ ছাড়াও রয়েছে মনুষ্য কর্মকাণ্ড। জুম চাষ পাহাড়ে জনখ্যাত ফসল হলেও জুম চাষের কারণে পাহাড়ের মাটি প্রতিনিয়ত তার শক্তি হারাচ্ছে। পাহাড়ে গড়ে উঠছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড। হাউজিং ব্যবসা থেকে শুরু করে লেবু বাগান ও পরিবেশ বিধ্বংসী বৃক্ষরোপণ, যা পাহাড়ের আভ্যন্তরিক গঠনকে উত্তপ্ত করে তুলছে।

সত্যিকার অর্থেই পাহাড়ে বাস করা কোন অংশেই যুক্তিসঙ্গত নয়। পরিকল্পনামাফিক বাসস্থান গড়ে তোলা অনস্বীকার্য। পৃথিবীর অনেক দেশেই সুশৃঙ্খলভাবেই পাহাড়ে নগরায়ন করা হচ্ছে। পাহাড়ের ওপর গড়ে উঠছে পরিকল্পিত বাসস্থান। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্র ভিন্ন। এখানে পাহাড়ে ঘর তুলতে কারও অনুমতির প্রয়োজন হয় না। যদি পাহাড়েও কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, যার কাজ হবে পাহাড়ে ঘর নির্মাণের উপযোগিতা নির্ণয় করে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে দেয়া, তাহলে অনভিজ্ঞ লোকগুলোর ওপর থেকে এ দুর্যোগ কেটে যাবে।
(পাহাড় সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই খুব একটা ধারণা নেই। যে কারণে হাসান কামরুলের এই লেখাটি পড়ে পাহাড় সম্পর্কে আমাদের একটি ধারণা আসবে, যা আমাদের জন্য হয়তো সহায়ক ভূমিকাও রাখতে পারবে- সে কথা বিবেচনা করেই লেখাটি প্রকাশ করা হলো।)

# হাসান কামরুল : ভূতত্ত্ববিদ ও কলাম লেখক
hasankamrulgeologist@gmail.com

Advertisements
Loading...