চামড়া সমাচার ॥ কম দামে চামড়া কিনতে সিন্ডিকেট সক্রিয়!

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ আমরা ভালো করেই যানি কোরবানীর চামড়া গরীবদের জন্য। সেটি হয়তো কোন গরীব ব্যক্তি কিন্বা কোন এতিমখানা বা মাদ্রাসায় এই অর্থ দেওয়া হয়। অথচ সেই চামড়া নিয়েও তৈরি হচ্ছে সিন্ডিকেট! এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী এ ধরনের হীন প্রচেষ্টা শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, বিশ্বমন্দার দোহাই দিয়ে কোরবানির ঈদে কম দামে পশুর চামড়া কিনতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে রাজধানীকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা। গত বছরের মতো এবারও চামড়ার আগাম কোনো দর নির্ধারণ করা হয়নি। তবে রাজধানীর সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা ২০০৮ সালের কোরবানির ঈদে নির্ধারিত দরে চামড়া কিনতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে দাম কম হওয়ায় কোরবানির বিপুল পরিমাণ চামড়া এবার চোরাপথে ভারতে পাচারেরও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, প্রতিবছর বাজারদরেই চামড়া কিনতে হয়। তা না হলে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করে। জানা যায়, ঈদের আগে সীমান্তের ওপার থেকে একশ্রেণীর মাড়োয়ারি এপারে এসে চামড়া কেনার জন্য বিনিয়োগ করে। দেশের চামড়া ব্যবসায়ীরা ঢাকায় নিয়ে আসার চেয়ে কাছে পেয়ে তাদের হাতে ওই চামড়া তুলে দেন। চামড়া সংগ্রহ করে এসব মাড়োয়ারি বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে ভারতে তা পাচার করে নিয়ে যায়। জানা যায়, রংপুর, কুড়িগ্রাম, জয়পুরহাটসহ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের প্রায় সমস্ত চামড়ায় ভারতে পাচার হয়ে যায়।

ট্যানারি মালিকরা বলেছেন, বিশ্বমন্দার কারণে দেশের চামড়াশিল্পে ২০০৮ সালে যে ধস নেমেছিল, এবারের পরিস্থিতি প্রায় একই রকম। তখন ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়ার মজুদ ছিল না;
কিন্তু এবার কোরবানির আগেই মজুদ ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার চামড়া। তা ছাড়া গত তিন মাসে আন্তর্জাতিক বাজারেও চামড়ার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। তাই ২০০৮ সালে নির্ধারিত দরের বাইরে তাদের পক্ষে পশুর চামড়া কেনা সম্ভব হবে না।

তুলনামূলক চিত্র ও সম্ভাব্য মূল্য

জানতে চাইলে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা তাদের ২০০৮ সালের নির্ধারিত চামড়ার দর অনুসরণ করতে পরামর্শ দিয়েছেন। খুচরা ব্যবসায়ীরা সম্ভাব্য চামড়ার মূল্য সম্পর্কে বলেন, এবার ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর উন্নত চামড়ার মূল্য হবে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরের জন্য ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। অন্যদিকে, বকরির চামড়ার মূল্য হতে পারে প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২২ টাকা এবং খাসির চামড়া ২০ থেকে ২৭ টাকা। একইভাবে ঢাকায় আড়ৎদাররা প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া কিনবেন ৬০ থেকে ৭০ টাকায় এবং বকরি ও খাসির চামড়া কেনা হবে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। অথচ এক মাস আগেও স্থানীয় পর্যায়ে গরুর ভালো চামড়া বিক্রি হয়েছে প্রতি বর্গফুট ১০০ থেকে ১০৫ টাকা। একই চামড়ার দাম ঢাকায় ছিল আরও ১০ শতাংশ বেশি। এবার ৮০ লাখ পশুর চামড়া সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মালিকপক্ষের বক্তব্য

বাংলাদেশ প্রক্রিয়াজাত চামড়া, চামড়াপণ্য ও জুতা রফতানিকারক সমিতি বিএফএলএলএফইএর সভাপতি বেলাল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যদি চাহিদা ও দাম থাকত, তাহলে বেশি দামে চামড়া কিনলে ট্যানারির মালিকদের পোষাত। কিন্তু বাজারের বর্তমান অবস্থায় ২০০৮ সালে কোরবানির ঈদে যে দামে চামড়া কেনা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি দামে কেনা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে বিশ্বমন্দা এবং পরবর্তী সময়ে অ্যানথাক্স রোগের কারণে ওই বছর ঈদে গরু কোরবানি ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল। তখন তেমন কোনো মজুদ ছিল না। অথচ এখন মজুদই আছে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার চামড়া। তিনি জানান, তিন মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে উন্নত ফিনিশড চামড়ার (অ২উ) দাম ৩০ শতাংশ কমেছে। তখন প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ২ দশমিক ৫০ থেকে ৬০ সেন্টে কেনা হয়; কিন্তু এখন তা হচ্ছে ১ দশমিক ৭০ থেকে ৮০ সেন্ট। এ ছাড়া অপেক্ষাকৃত নিম্ন কোয়ালিটির (টঞঝ) গরুর চামড়া এখন ১ দশমিক ৩০ সেন্ট থেকে মাত্র ৭০-৯০ সেন্টে বিক্রি হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চামড়া কিনতে হবে।

বাংলাদেশ ট্যানারি মালিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাবেক সভাপতি শাহীন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাজার-পরিস্থিতি খুব খারাপ। কোরবানিতে প্রতিবছর আমার প্রতিষ্ঠানেরই ১০ লাখ বর্গফুট চামড়ার অর্ডার থাকে। এবার অর্ডার এসেছে পাঁচ লাখ বর্গফুটের। অর্ধেকই কমে গেছে।’ ২০০৮ সালের নির্ধারিত দামে স্থানীয়দের চামড়া কেনার পরামর্শ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চামড়া কেনার বিষয়ে এবার আমরা কোনো দর নির্ধারণ করিনি। তবে বাজারের অবস্থা অনুযায়ী ২০০৮ সালের কোরবানির ঈদে চামড়ার যে দাম ছিল, এখন তার চেয়েও কমে কেনা উচিত। তা না হলে চামড়া নিয়ে বাজারে অস্থিরতা দেখা দেবে, এমনকি পাচার হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’

ব্যবসায়ীদের সুর শুনে বোঝা যায়, এবার চামড়ার কি পরিস্থিতি দাঁড়াবে। তবে এক্ষেত্রে একটি বিষয় সকলকে খেয়াল রাখা দরকার আর তা হলো, যে চামড়া তারা কিনবেন তার অর্থ নেহাতই গরীবদের ঘরে যাবে। আর তাই গরীবরা যাতে ন্যায্য মূল্য পান সেদিকে সকলেরই খেয়াল রাখা দরকার।

Advertisements
Loading...