১৭ মেডিক্যালে বার্ন ইউনিট করা হলেও জনবলের অভাবে চালু হয়নি!

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ দেশে আগুনে পোড়া রোগীর সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থায় নানা আধুনিকতা এলেও সে অনুপাতে আগুনে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থার তেমন কোন উন্নতি ঘটেনি। যদিও দেশের ১৭টি মেডিক্যালে বার্ন ইউনিট করা হয়েছে অথচ আশ্চর্য্যের বিষয় জনবলের অভাবে তা চালু করা যাচ্ছে না।

৯ মাসেও যোগ দেননি চিকিৎসকরা ॥ ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে আইসিইউ চালু

প্লাস্টিক সার্জন ও বার্ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাসময়ে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) সাপোর্ট পেলে বেশির ভাগ আগুনে পোড়া রোগী বেঁচে যায়। আর যদি আইসিইউটি জীবাণু মুক্তকরণসহ অত্যাধুনিক সুবিধা সম্পন্ন হয় তাহলে রোগী দ্রুত আরোগ্য লাভ করে। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে সীমিত সময়ের মধ্যে দেশে প্রথমবারের মত ১০ বেডের অত্যাধুনিক আইসিইউ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে।

একটি দৈনিকের খবরে জানা যায়, আগামী মাসেই এই ইউনিট রোগীদের চিকিৎসা দেয়া শুরু করবে। অপরদিকে ঢাকার বাইরের পোড়া রোগীদের সুচিকিৎসার জন্য সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসমূহে বার্ন ইউনিট চালু করার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এ নির্দেশের প্রেক্ষিতে ১৭টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট চালু হলেও জনবলের অভাবে তা এখনো চালু করা যায়নি। সেখানে কাজ করার জন্য চিকিৎসকদের বদলি করা হলেও তারা এখনো কর্মস্থলে যোগদান করেননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৯ মাস পর্যন্ত কর্মস্থলে যোগদান না করলেও স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও মন্ত্রণালয় থেকে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। শীর্ষ কর্মকর্তা-এর সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, বদলিকৃত ওই সকল ডাক্তার রাজধানীতে ৯ মাস ধরে ঘুরাফেরা করছেন।

বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, পোড়া রোগীদের প্রথম ২৪ ঘন্টা গোল্ডেন সময়। তাদের এ সময়ের মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দিলে ৯০ ভাগ রোগী বেঁচে যাবে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে সরকারিভাবে সকল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট খোলার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২ জুন পুরাতন ঢাকার কায়েৎটুলি এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৩ জন মারা যান। এতে অগ্নিদগ্ধ হয় আরো দেড় শতাধিক। হতাহতদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে প্রেরণ করা হয়। মাত্র ৫০ বেডের বার্ন ইউনিটে প্রতিদিন রোগী থাকে প্রায় সাড়ে তিনশ। এরমধ্যে উক্ত অগ্নিকাণ্ডে কয়েকশ হতাহত চিকিৎসা সেবা নিয়ে কি যে পরিস্থিতি তা স্বচক্ষে দেখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উপস্থিত চিকিৎসকদের কাছে প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, পোড়া রোগীদের সুচিকিৎসা সেবায় কি কি প্রয়োজন- এরপরে তিনি প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দেন। আইসিইউ সাপোর্ট পেলে অনেক সংকটাপন্ন পোড়া রোগী বেঁচে যাবে বলে প্রধানমন্ত্রীকে চিকিৎসকরা জানান। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিট প্রকল্প পরিচালক ডা. সামন্ত লাল সেনকে প্রধানমন্ত্রী ঢাকার বাইরে প্রতিটি হাসপাতালে বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেন।

জানা গেছে, দেশের পোড়া ও প্লাস্টিক সার্জারি তালুকাটা, ঠোঁট কাটাদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা কেন্দ্র ঢাকা মেডিক্যাল বার্ন ইউনিট। রাজধানীসহ সারাদেশ থেকে পোড়াসহ উক্ত রোগীদের বার্ন ইউনিটে প্রেরণ করা হয়ে থাকে। ৫০ বেডের বার্ন ইউনিটে মেঝেতে ও ওয়ার্ডের বারান্দায় গাদাগাদি করে বিছানা দিয়ে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। পোড়া রোগীদের সুস্থ হলেও ৯০ ভাগের পরবর্তীতে প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন হয়। পোড়া ও প্লাস্টিক সার্জারি চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

এক সমীক্ষায় জানা গেছে পোড়াদের মধ্যে প্রায় ৯০ ভাগ দরিদ্র, দিনমজুর ও অসহায়। তাদের পক্ষে সরকারি হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসা করানো সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। এ সব পোড়া রোগীদের মধ্যে মুখমণ্ডল অর্থাৎ শ্বাস নালী পোড়া যাওয়ার রোগীর সংখ্যা অনেক। সংকটাপন্ন কিংবা শ্বাস নালী পোড়া রোগীদের আইসিইউর চিকিৎসা সেবা ছাড়া বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। নতুন প্রতিষ্ঠিত ১০ বেডের আইসিইউ’র মান যে কোন উন্নত দেশের সমতুল্য।

গত মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ বার্ন ইউনিটে ১০ বেডের অত্যাধুনিক আইসিইউ নির্মাণ শুরু হয়। মাত্র সাত মাসের মধ্যে কার্যক্রম শেষ হয়। দোতলায় প্রতিষ্ঠিত আইসিইউ কক্ষটির ফ্লোর জীবাণুমুক্ত করতে সিলিংয়ে বসানো হয়েছে জীবাণুমুক্তকরণ মেশিন। বার্ন ইউনিট ভবনের ছাদে হেপাফিল্টার বসানো হয়েছে। সেখান থেকে আইসিইউর কক্ষের সিলিংয়ে সংযুক্ত করা হয়। আইসিইউতে জীবাণুর ঝুঁকি বেশি। উক্ত কক্ষে ফ্লোর কিংবা রোগীর সঙ্গে যে কোনভাবে জীবাণু থাকলে তা খুব দ্রুত মরে যাবে। আগামী মাসের ২৯ নভেম্বরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী উক্ত আইসিইউ উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে। আইসিইউ প্রতিষ্ঠায় আর্থিক সহযোগিতা করেছে এক্সিম ব্যাংক।

যে কারণে ঢাকার বাইরে বার্ন ইউনিট চালু হয়নি

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বাইরে সকল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট চালু করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেয়ার পরপরই কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকার বাইরে ১৭টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু জনবলের অভাবে তা এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্প পরিচালক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ১৭টি মেডিক্যালে বার্ন ইউনিটে শুধু জনবলের অভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। এ ইউনিটগুলো চালু হলে পোড়া রোগীরা হাতের কাছে দ্রুত সুচিকিৎসা পাবে। মৃত্যুর হার অনেক কমে আসবে। বর্তমান গ্রামাঞ্চলের পোড়া রোগীরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অনেক বিলম্বে ঢাকা পৌঁছায়। বিলম্বের কারণে ইনফেকশনসহ নানা জটিলতায় পোড়া রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়ে। এ বিষয়টি বিবেচনায় এনে প্রধানমন্ত্রী ঢাকার বাইরে প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট চালু করার নির্দেশনা দেন বলে তিনি জানান।

কোরবানি ঈদের দিন রংপুর থেকে শ্বাসনালীসহ মুখমণ্ডল পোড়া রোগী স্বর্ণা রায় নামে এক তরুণীকে ঢাকা মেডিক্যাল বার্ন ইউনিটে আনার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা বলছেন, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট চালু থাকলে স্বর্ণা রায় সেখানে প্রথমে সুচিকিৎসা পেত এবং বেঁচে যেত। শুধু বিলম্ব ও চিকিৎসার অভাবে তার মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানান। জানা গেছে, ডা. শামীমকে রংপুর মেডিক্যাল বার্ন ইউনিটে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে বদলি করা হয়। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে ডা. ইমরান হোসেনকে বদলি করা হয়। ৯ মাসে এ দুই চিকিৎসক কর্মস্থলে যোগদান না করে ঢাকায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছেন। অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট চিকিৎসকদেরও বদলি করা হয়েছে। তারা কর্মস্থলে যাননি। এ সব চিকিৎসক ক্ষমতাসীন দলের স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতাকর্মী কিংবা কতিপয় নেতার আশ্রয়ে থাকায় তারা মন্ত্রণালয়ের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষযে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মোঃ সিফায়েত উল্লাহ বলেন, বদলিকৃত স্থানে চিকিৎসকদের যোগদান করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ওই সব ডাক্তার যোগদান না করার বিষয়টি অধিদপ্তরকে জানায়নি। আদেশ লংঘন করায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Advertisements
Loading...