‘দেশী জামাই বাবু’র কাছে আমাদের প্রত্যাশা…

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বর্তমানে বাংলাদেশে রয়েছেন। তিনি শুধু ভারতের রাষ্ট্রপতিই নন- তিনি আমাদের ‘জামাই বাবু’ও বটে। আর তাই তাঁর কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কারণ ভারতের সঙ্গে বেশ কিছু ইস্যু রয়েছে অমীমাংসিত। এগুলোর মীমাংসা হওয়া জরুরি। তিস্তা চুক্তি, বিশেষ করে সীমান্তে মানুষ হত্যাসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে মীমাংসায় আসা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
pranab-mukherjee1 (1)
নড়াইলে চলছে ব্যাপক আয়োজন

ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার প্রথম বিদেশ সফরে গতকাল রবিবার ৩ মার্চ ঢাকায় এসে পৌঁছলে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে তাকে স্বাগত জানান। এর আগে ভারতের রাষ্ট্রপতিকে বহনকারী একটি বিশেষ বিমান বাংলাদেশের আকাশ সীমায় প্রবেশ করলে বিমান বাহিনীর চারটি জেট বিমান তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে। বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা ৩২ মিনিটে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৪৭ বিমান থেকে ভারতের রাষ্ট্রপতি নেমে আসার সময় ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে তার আগমনী বার্তা ঘোষণা করা হয়।

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তাঁর শ্বশুরালয় নড়াইলে যাবেন। এদিকে নড়াইলে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির আগমন উপলক্ষে সেখানে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। রাস্তাঘাট, ব্রীজ কালভার্ট মেরামতসহ ওই এলাকা নতুন করে সাজানো হচ্ছে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির আগমনকে সামনে রেখে। এলাকার মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাদের দেশী এই ‘জামাই বাবু’ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে স্বচোক্ষে এক নজর দেখার জন্য।

আমি অভিভূত- প্রণব মুখার্জি

9cd79895ba0239751de6d78a4999b765‘বহু দেশের যুদ্ধে ভারতীয় সৈন্য নিহত, আহত হয়েছেন। বহু দেশের যুদ্ধে ভারত সহায়তা করেছে। তবে বাংলাদেশের মতো কেওই স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তা করার জন্য এভাবে সম্মাননা জানায়নি। আমি অভিভূত।’ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ দেয়ায় বাংলাদেশের প্রতি এভাবেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গতকাল রবিবার বাংলাদেশে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি। তিনি শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বেরও প্রশংসা করেছেন। গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় সোনারগাঁও হোটেলের সুরমা হলে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রসঙ্গত, আজ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে প্রণব মুখার্জিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ দেয়া হবে।

পরে সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে হোটেল লবিতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে বহু দেশের যুদ্ধে ভারত সহায়তা করেছে। ভারতের বহু সৈন্য সেসব যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন। তবে বাংলাদেশের মতো এভাবে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি দেয়নি। প্রণব মুখার্জি জানিয়েছেন, তিনি এ সম্মাননা পেয়ে অভিভূত।

দীপু মনি জানান, বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যু ও উপ-আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রণব মুখার্জি বলেছেন, ভারতের লোকসভায় চলতি বাজেট অধিবেশনে স্থল সীমান্ত চুক্তি-১৯৭৪ এবং সীমান্ত প্রটোকল-২০১১ পাস হবে বলে তিনি আশা করছেন। অভিন্ন তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তিও সহসাই হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনার উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটানকে নিয়ে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা ভিত রচিত হয়েছে। যা এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে। শেখ হাসিনাই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রথম প্রস্তাবক বলে মন্তব্য করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি।

শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে প্রণব মুখার্জি বলেন, সাহসিকতা ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কারণে তিনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশ গড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশ বেশ উন্নয়ন করেছে। এজন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি জনগণ আস্থা রেখেছে। প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংহের শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা পৌঁছে দেন।

প্রণব মুখার্জির সঙ্গে অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের আগে হোটেল সোনারগাঁও-এ প্রণব মুখার্জির সঙ্গে অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেন। প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সাংবাদিকদের জানান, প্রণব মুখার্জীর মতো একজন ব্যক্তিত্বকে স্বাগত জানাতে পেরে আমরা খুবই খুশি। তিনি বাংলাদেশের একজন অকৃত্রিম বন্ধু আছেন ও থাকবেন। রাষ্ট্রপতি হবার পর প্রথম সফরের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেয়ায় আমরা কৃতজ্ঞ। প্রণব মুখার্জির উদ্যোগে বাংলাদেশ ও ভারত অভিন্ন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। কেবল দ্বিপাক্ষিক নয়, আঞ্চলিক ইস্যু যেমন, জলবিদ্যুৎ, কৃষি, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমরা কাজ করছি।

প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত বলেন, এক বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় ঋণের ব্যাপারে কথা হয়েছে। ২০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদানের মধ্যে ৫০ মিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যে ভারত দিয়েছে। ৫০ মিলিয়ন ডলার আগামী মাসে দেয়া হবে। ১০০ মিলিয়ন ডলার সহসাই পাওয়া যাবে। এই ২০০ মিলিয়ন ডলার পদ্মা সেতুতে ব্যয় হবে। পদ্মা সেতুর অর্থায়ন কিভাবে হবে সে ব্যাপারে জানতে চেয়েছেন প্রণব মুখার্জী। জবাবে অর্থমন্ত্রী তাকে জানিয়েছেন আগামী চার বছরের বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকা করে পদ্মা সেতুর জন্য বরাদ্দ রাখা হবে। সামগ্রিক পরিকল্পনা তাকে জানানো হয়েছে।

অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সামনে আসবে

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির আগমনে এবার অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সামনে আসবে। বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি ও সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নির্বিচারে মানুষ হত্যার বিষয়টি উঠে এসেছে। আজ বাংলাদেশের জনগণও আশাবাদি। কারণ তারা মনে করেন, যদিও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত তবুও তিনি বাংলাদেশের জন্য সাধ্যমতো করবেন। এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি যেমন অকৃত্রিম সহযোগিতা দিয়েছিলেন- আজকের এই প্রেক্ষাপটেও তিনি এদেশের জন্য ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।

উল্লেখ্য, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই ভেবেছিলেন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি হয়তো আসবেন না। কিন্তু সকলের সেই ধারনাকে মিথ্যে প্রমাণ করলেন তিনি। তিনি যে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু সেটি আবার প্রমাণ করলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। হরতালসহ দেশের বর্তমান এই নাজুক পরিস্থিতির কারণে তিনি নাও আসতে পারতেন।

Advertisements
Loading...