এর শেষ কোথায়

আসিফ নজরুল ॥ হরতাল ছিল সেদিন। পেছনে প্রায় জনশূন্য রাস্তা, দু-একটি রিকশা আর অলসগতির বাস। অথচ মাইক্রোফোন মুখের কাছে নিয়ে প্রতিবেদক অবলীলায় বলে যাচ্ছেন, আজকে হরতাল পালিত হয়নি, যান চলাচল স্বাভাবিক, দোকানপাট খুলেছে! এমন কিছু গণমাধ্যমের মতো সরকারও মানছে না যে হরতাল হচ্ছে দেশে। সরকার বলছে, অবস্থা তাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এর মধ্যে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে মানুষ, পুড়ছে রাষ্ট্রের সম্পদ, থমকে আছে অর্থনীতি, জনজীবন ও শিক্ষাকার্যক্রম। এমনকি অতিগুরুত্বপূর্ণ এসএসসি পরীক্ষা। হরতালের পর হরতালে বিপর্যস্ত হচ্ছে দেশ।
fd4e0324402008abf6e029bd4b1cf0ce
হরতাল আসলে হচ্ছে। আতঙ্কে হোক আর স্বেচ্ছায় হোক, হরতালে থমকে আছে মানুষ। রাজনীতিতে অসহিষ্ণুতা আর সংঘাত পৌঁছেছে চরমে। সর্বাত্মক আর সর্বগ্রাসী মোকাবিলার হুমকি দিয়ে রাস্তায় আর গণমাধ্যমে সরব রয়েছে দুটি বিবদমান পক্ষ। একদিকে সরকার আর তার জোটসঙ্গী কয়েকটি দল, অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াত ও অধিকাংশ ধর্মীয় সংগঠন। এক পক্ষ বলছে, অন্য পক্ষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে নেমেছে। আরেক পক্ষ বলছে, অন্য পক্ষ ধর্মের বিরুদ্ধে নেমেছে। দেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে স্পর্শকাতর দুটি ইস্যুতে যুদ্ধংদেহী অবস্থানে দাঁড়িয়েছে দুটি পক্ষ।

এই সংঘাত এড়ানোর লক্ষ্যে উদ্যোগ নেওয়ার মতো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিও যেন নেই আর! দেশের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চলছে বিষোদ্গার বা নীরব প্রত্যাখ্যান। বাকিরা বিভিন্ন পক্ষ নিয়েছেন। এক পক্ষ শুধু জামায়াত-শিবিরের বর্বরতার সমালোচনা করছে। অন্য পক্ষ শুধু পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণের নিন্দা করছে। একশ্রেণীর গণমাধ্যমে জামায়াতের তাণ্ডবলীলার বিবরণ দিতে বলছে, এতে এক দিনে মারা গেছে ৪০ বা ৫০ জন। অথচ নিহত লোকদের অর্ধেকের বেশি যে জামায়াত-শিবির, তারা যে মারা গেছে পুলিশের গুলিতে বা প্রতিপক্ষের হামলায়, এই সামান্য তথ্য দিতেও নারাজ তারা। অন্য শ্রেণীর গণমাধ্যমের চোখে পড়ছে শুধু পুলিশের বাড়াবাড়ি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জামায়াত-শিবিরের বর্বরতার কারণে যে সংঘাত হচ্ছে, তার লেশমাত্র নেই তাদের জবানিতে।

অবস্থা এতই শোচনীয় যে মসজিদ অপবিত্র করে দোষ দেওয়া হচ্ছে উল্টো সরকারের। আবার ক্ষেত্রবিশেষে এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে, নিজেরাই শহীদ মিনার বা জাতীয় পতাকার অবমাননা করে দোষ দেওয়া হচ্ছে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে। এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েছে এ দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। তাদের ওপর জামায়াত-বিএনপির রোষের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এ দেশে। অন্যদিকে, সর্বশেষ রামুর ঘটনায় সরকারের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আক্রমণের শিকার হয়েছে, এমন উদাহরণও দেখা গেছে। এই ঘোলাটে পরিস্থিতিতে অবশেষে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রক্ষার কথা বলেছে বিএনপি-আওয়ামী লীগ, এমনকি জামায়াতও দাবি করেছে যে তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করছে না। কিন্তু কোনো আশ্বাসেই আশ্বস্ত হওয়ার কথা না তাদের। প্রতিদিন আক্রান্ত হয়ে দেশের অন্য অনেক মানুষের মতো তীব্র অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটছে তাদের।

এই অবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে কি যে গৃহযুদ্ধের ডাক আমরা জামায়াতের মুখে শুনে শিউরে উঠেছিলাম, তা সত্যি সত্যি কি শুরু হয়ে গেছে শাহবাগ মঞ্চের কঠোর সমালোচনা করে আর ধর্মীয় আবেগকে উদ্দীপিত করে অবশেষে জাতীয় পার্টির নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও এই যুদ্ধে একটি পক্ষ হয়ে গেছেন ইতিমধ্যে। এই সর্বব্যাপী যুদ্ধ কি আসলে অনিবার্য ছিল সরকার বা বিএনপি কি পারত না এটি এড়াতে এখন আমাদের গন্তব্য কোথায় কতটুকু সর্বনাশের পর বোধোদয় হবে আমাদের।

দুই.
শাহবাগ জাগরণের পর এমন একটি পরিস্থিতি হবে, তা অনেকের কাছে অকল্পনীয় ছিল। শাহবাগের তরুণসমাজ যেভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জাতীয় ঐক্যের আবহ গড়ে তুলেছিল, তাতে মৃদুভাবে হলেও সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু তাদের জাগরণকে নানাভাবে অপব্যবহার করে সরকার এর বিরোধিতার, এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বিতর্ক তোলার সুযোগ করে দেয়।

শাহবাগ জাগরণের প্রথম দিকে আইন প্রতিমন্ত্রী জানান, এই জাগরণ আগে হলে কাদের মোলস্নার রায় ভিন্ন হতে পারত। এই জাগরণে উপস্থিত থেকে কয়েকজন মন্ত্রী ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই স্লোগানে অংশ নেন। এরপর দেশের প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুন্যালকে রায় দেওয়াকালে জনগণের আবেগ-অনুভূতিকেও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্‌বান জানান। সরকারের এসব বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের কারণে একজন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীরও যদি ফাঁসির রায় হয়, তাহলে তা বিতর্কিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এই বিতর্ক দেশে যুদ্ধাপরাধী ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তি কর্তৃক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির সুযোগকে আরও অবারিত করে দেয়।

সরকারের নীতিনির্ধারকেরা চাইলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে আরও নির্বিঘ্‌ন করতে পারতেন, পারতেন জামায়াত-শিবিরকে নিঃসঙ্গ করে সংঘাতময় পরিস্থিতি অনেকাংশে এড়াতে। আমাদের মনে থাকার কথা, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে বিএনপির নেতা খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিয়ে সরকার তার মেয়াদপূর্তি করুক, এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা শুরু করে বিএনপিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধের সব তৎপরতা থেকে হয়তো সরিয়ে ফেলতে পারত সরকার, কিন্তু সরকার তা করেনি। বরং সরকারের কর্মকাণ্ডে মনে হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য সৃষ্ট জনমতকে পুঁজি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে আড়াল করার একটি লক্ষ্য তাদের রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপিকে জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন করা সহজ নয়, তা করাও যায়নি।

সরকারের নীতিনির্ধারকেরা দেশের জনগণের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও এটি নিয়ে অপরাজনীতি করার যে সুযোগ রয়েছে, তা উপলব্ধি করতেও ব্যর্থ হয়েছেন। বাংলাদেশে অধিকাংশ ধর্মীয় দল জামায়াতে ইসলামীকে ধর্ম ইস্যুতেই অপছন্দ ও বিরোধিতা করে। অভিযোগমতে, কিছু ব্লগে ধর্ম ও মহানবী (সা.)কে নিয়ে আপত্তিকর প্রচারণায় আহত হয়ে তারাও সরকারের প্রতিপক্ষে পরিণত হয়েছে। সরকার শাহবাগ জাগরণের আগেই উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও এসব অভিযোগ যথাযথভাবে গুরুত্ব দিতে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা (যেমন পেনাল কোড অনুসারে ধর্মীয় অপরাধের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা) নিতে ব্যর্থ হয়। বরং পরে এই ইস্যুতে ইসলামি দলগুলোর হরতাল প্রতিরোধে দেশের কোনো কোনো স্থানে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে।

সরকার যদি বিচক্ষণতার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের বিচারের রাজনৈতিক কর্মকৌশল নির্ধারণ করত, তাহলে এত অঘটন ঘটত না। কিন্তু তা করা হয়নি। বরং দেশকে বিভক্ত করার অশুভ খেলায় বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সরকার আর সরকারি দলও মাঠে নেমেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক দিনে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এক দিনে সর্বোচ্চসংখ্যক পুলিশ সদস্যও নিহত হয়েছেন জামায়াত-শিবিরের বর্বরতায়।

মানুষের মনে প্রশ্ন, কী হচ্ছে দেশে এরপর কী হবে এর উত্তর কোথাও নেই। বরং হুতু-তুতসির মতো রক্তের নেশায় উন্মত্ত দুই প্রতিপক্ষ জনগোষ্ঠী সৃষ্টির চেষ্টাই যেন হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর ধর্মের কথা বলে উসকানিমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে দুই বিবদমান পক্ষ থেকে। অথচ এই দুই চেতনার মধ্যে যে আসলে বিরোধ নেই, তা জোরের সঙ্গে বলছে না কেউ। মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মকে পরিত্যাগ করে যুদ্ধে নামেনি কেউ। ইসলামও ন্যায়সংগত স্বাধীনতাযুদ্ধ বা এই যুদ্ধে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞকারীদের বিচারকে অনুৎসাহী করেনি। দুই চেতনাকে বুকে ধারণ করেই বেঁচে আছে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ। অথচ এই দুই চেতনাকে সাংঘর্ষিকভাবে তুলে ধরে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে কেউ কেউ।

এমন পরিস্থিতিতে চাপা পড়েছে সুশাসন, মানবাধিকার আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার তাগিদ। চাপা পড়েছে শেয়ারবাজার, হল-মার্ক, পদ্মা সেতু, রেলের দুর্নীতি, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড আর শাসক দলের সন্ত্রাসের চিত্র। গতবার বিএনপি সরকারের শেষ দুই বছরে এনজিও আর সুশীল সমাজ সারা দেশ তোলপাড় করে ফেলেছিল যোগ্য প্রার্থী, সুশাসন আর সুষ্ঠু নির্বাচনের বিভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে। কোনো এক অদ্ভুত কারণে তারা নিশ্চুপ ছিল আওয়ামী লীগের আমলের সবটুকু সময়। টক শো আর পত্রিকার পাতায় যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে এসব বিষয়ে সরব থাকতেন, তাঁদের সব মনোযোগও কেড়ে নিয়েছে দেশের সংঘাতময় পরিস্থিতি। সারা দেশ যেন টানটান উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছে এক অমোঘ ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষের পরিণতির জন্য। অনেকেই হয়তো বুঝতে পারছে না এই সংঘর্ষে যে-ই জিতুক, হারবে আসলে দেশ। গভীরভাবে বিভক্ত জনগোষ্ঠী কখনো দেশকে এগিয়ে নিতে পারে না। আমরাও পারব না। বরং আমাদের বিভক্তির সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের সম্পদ আর সম্ভাবনার ওপর ভবিষ্যতে আরও আধিপত্য কায়েম করতে পারে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল, বহুজাতিক পুঁজি ও তাদের এদেশীয় দোসররা।

তিন.
এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে বাঁচানোর উদ্যোগ নেওয়ার দায় সরকারের ও প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলোচনার কথা বলেছেন। এমন কথা আমরা আগেও শুনেছি, কিন্তু আলোচনার অর্থবহ কোনো উদ্যোগ দেখিনি। সরকারকে এমন উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের বুঝতে হবে, তাদের সামনে বিকল্প মাত্র দুটি। এক: আরও কার্যকর ও আগ্রাসীভাবে বিভিন্ন বিরোধী দল ও মতকে দমন করা, যার পরিণতিতে দেশ এক মহাবিপর্যয়ের মুখেও পড়তে পারে। দুই: বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও আগামী নির্বাচন-দুটি ইস্যুতেই একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা।
সরকার আরও একটি বিষয় ভাবতে পারে। স্বাভাবিক পন’ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সরকার দেশে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে পারে। জরুরি অবস্থা জারি গণতন্ত্রের জন্য লজ্জার। কিন্তু আরও বেশি লজ্জার হচ্ছে, দেশে দীর্ঘকালীন নৈরাজ্য চলতে দেওয়া, দেশকে রক্তক্ষয়ী বিভক্তির দিকে যেতে দেওয়া।
# আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
(বাংলাদেশ নিউজ২৪ এর সৌজন্যে এই লেখাটি পাঠকদের কথা চিন্তা করে প্রকাশ করা হলো)

Advertisements
Loading...