ঘাস চাষ করে কোটিপতি হওয়া এক গফুরের গল্প!

এক সময় ঠিকমত তিনবেলা ভাতই জুটতো না, এখন সেখানে তিনি প্রায় কোটি টাকার মালিক হয়েছেন!

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ অনেকেই এমন একটি খবর দেখে বিস্মিত হবেন। কারণ ঘাস চাষ করে আবার কোটিপতি হওয়া যায়? তবে সত্যিই তা সম্ভব। মানুষ পারে না এমন কিছু নেই। যেমন গাইবান্ধার গফুর তা করে দেখিয়েছেন।

অন্যের জমিতে কাজ করে এক সময় ঠিকমত তিনবেলা ভাতই জুটতো না, এখন সেখানে তিনি প্রায় কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করে সফল হওয়া এই ব্যক্তির নাম আবদুল গফুর শেখ। গফুরের বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরগাড়ি ইউনিয়নস্থ সুলতানপুর বাড়াইপাড়া গ্রামে। নেপিয়ার জাতের ঘাস চাষ বদলে দিয়েছে গরীব গফুরের জীবন।

আবদুল গফুর সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া আড়াই বিঘা জমির মধ্যে দেড় বিঘা জমিতে ফসল ফলিয়ে ছয় সদস্যের সংসারই ঠিকমত চলতো না। তাই আবদুল গফুর জমি বিক্রি করে ২০০৩ সালে মেজো ছেলে ফারুককে বিদেশে পাঠানোর জন্য এক লোককে টাকা দেন। কিন্তু তিনি প্রতারিত হন। পরে অন্যের জমিতে কাজ করে প্রতিদিন ১৩০ থেকে ১৫০ টাকার আয়ে কোনো মতে সংসার চলতে থাকে।

২০০৪ সালের কথা। পলাশবাড়ীর দুলু মিয়ার কাছ থেকে নেপিয়ার জাতের ঘাসের বহুমুখী ব্যবহারের কথা শুনে আবদুল গফুরও উদ্বুদ্ধ হন এই ঘাস চাষে। এরপর তিনি নেপিয়ার ঘাসের চারা সংগ্রহ করে পাঁচশতক জায়গায় ঘাস লাগান।

স্থানীয় সমিতি হতে ৭ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি গাভী কেনেন গফুর। এরপর গাভীটি একটি বাছুর দেয়। পরবর্তীতে সেই ঘাস বড় হলে গাভীকে খাওয়ানো শুরু করে গফুর। যে কারণে গাভীর দুধও বাড়তে থাকে। আবার ঘাসও বিক্রি করে টাকা পান গফুর। তার হাতে বেশ টাকা আসতে শুরু করে। সেই টাকা দিয়ে জমি ইজারা নিয়ে ঘাস চাষ শুরু করেন গফুর।

এরপর আর তাকে থেমে থাকতে হয়নি। বর্তমানে ২০ বিঘা জমিতে তিনি নেপিয়ার ঘাস চাষ করছেন। এরমধ্যে ৮ বিঘা নিজের কেনা এবং ১২ বিঘা ইজারা নেওয়া। একবিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় দশ হাজার টাকার মতো। প্রতিমাসে খরচ বাদে ঘাস বিক্রি করে মাসিক আয় হয় ১ লাখ টাকারও বেশি!

খড়ের ঘরের বদলে বর্তমানে ২০ শতক জমিতে আধাপাঁকা ঘর তৈরি করেছেন গফুর। তার খামারে বিভিন্ন উন্নত জাতের ২২টি দুধাল গাভী রয়েছে। এরমধ্যে ৮টি গাভী দুধও দিচ্ছে। সেই দুধ বিক্রি করে দৈনিক ২২০০ টাকা আয় হচ্ছে তার। ঘাসের জমিতে পানি সেচের জন্য দুইটি শ্যালো চালিত মেশিনও রয়েছে তার। আবার হাঁস-মুরগি এবং ছাগল পালেন গফুর।

বাড়িতে সরকারি বিদ্যুৎ ছাড়াও রয়েছে একটি নিজস্ব সৌর বিদ্যুৎ, ২টি মোটরসাইকেল এবং ৫টি ভ্যান। কর্মচারি রয়েছে ৩ জন, তাদের প্রতিজনের মাসিক বেতন ৯ হাজার টাকা করে। তারা প্রতিদিন জমি হতে ঘাস কেটে পলাশবাড়ী, ঢোলভাঙ্গা, ধাপেরহাট, মাঠেরহাট এবং গাইবান্ধা শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে থাকে।

শুধু আবদুল গফুরই নয়, তার বাড়ির আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ১০০ জন কৃষক ৮০ হতে ৯০ একর জমিতে নেপিয়ার জাতের ঘাস চাষ করছেন।

আব্দুল গফুর সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, আমার স্বপ্ন হলো ব্যাপকহারে এই ঘাস চাষ করে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হওয়া। যাতে আরও অনেকেই উদ্বুদ্ধ হয়ে এই ঘাস চাষ করে তাদের ভাগ্য পাল্টাতে পারে।

তবে তিনি জাতীয় স্বীকৃতিও পেয়েছেন। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি চাষের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নে দৃষ্টান্ত রাখার জন্য ২০১৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারে ভুষিত হয়েছেন আবদুল গফুর। ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর ঢাকাস্থ ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত হতে একটি সনদপত্র এবং একটি রৌপ্যপদক পুরস্কার হিসেবে গ্রহণ করেন আব্দুল গফুর।

Loading...