জাপানীদের নাকি স্মরণ শক্তি কম!

আমাদের দেশে এ ধরণের হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার ঘটনা হয়তো বিরল কিন্তু জাপানীরা ফিরে পাচ্ছেন হারিয়ে যাওয়া জিনিসপত্র!

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ বয়স হলে স্মরণ শক্তি কমে যায় সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই নাকি জাপানীরা ভুলোমন অর্থাৎ তাদের নাকি স্মরণ শক্তি খুব। তাই তারা যেখানে যায় কোনো না কোনো কিছু ফেলে আসে। সে কারণে সেখানে ‘লস্ট এন্ড ফাউন্ড সেন্টার’ খোলা হয়েছে!

শোনা যায় যে, ভুলোমনা স্বভাবের কারণে অনেকেই তার প্রিয় অথবা নিতান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো হর হামেশায় হারিয়ে বসেন। প্রিয় জিনিসটির জন্য আফসোস হয় সারাজীবন। তবে প্রয়োজনীয় কিছু হারিয়ে গেলে বেশ ঝামেলা পোহাতেই হয়। যেমন ব্যক্তিগত ড্রয়ারের চাবিটি বা অতিপ্রয়োজনীয় মোবাইলফোনটিই হারিয়ে গেলে তখন সমস্যায় পড়তে হয়।

তবে আমাদের দেশে এ ধরণের হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার ঘটনা হয়তো বিরল। কারণ আমাদের দেশে এই ধরনের হারানোর ঘটনা ঘটলে সেটি আর ফিরে পাওয়ার কোনই সম্ভাবনা থাকে না। তবে জাপানে এটি একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। হারানো জিনিসের মালিককে খুঁজে বের করে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়াটা জাপানিরা দায়িত্ব হিসেবেই মনে করেন। অর্থাৎ তাদের মধ্যে রয়েছে সততা।

মাইথিলি জাদেজা নামের এক জাপানীজ তরুণী তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেছেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। ভ্রমণের সুন্দর মুহূর্তগুলো ধরে রাখার জন্য মুঠোফোনে ছবি তোলেন তিনি।

ওই ছবি তুলতে গিয়ে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। মুঠোফোনটি হাত থেকে পড়ে গিয়ে একেবারে পাহাড়ের ফাটলের ভিতর ঢুকে যায়। সেটি উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরে আসেন। তারপর তিনি শরণাপন্ন হন পুলিশের। নির্দিষ্ট অবস্থান উল্লেখ করে ফোন হারানোর কথা জানিয়ে একটি রিপোর্টও করেন।

এই ঘটনার মাস দুয়েক পর তিনি একটি চিঠি পান। চিঠিটি পাঠান এক পথচারী। তিনি ওই তরুণীর ফোনটি কুড়িয়ে পেয়েছেন। তারপর ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনি সেই হারিয়ে যাওয়া মুঠোফোনটি হাতে পান। সেটির পর্দা ফেটে গেলেও মুঠোফোনটি তখনও ছিল সচল। এটি জাপানের সচরাচর ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে একটি। সেখানে ফোন, ওয়ালেট, চাবি, ক্রেডিট কার্ড এসব হারিয়ে যাওয়া জিনিসগুলো অধিকাংশ সময় তাদের মালিককে খুঁজে পেতে সমর্থ হয়।

কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসটি ফিরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে নৈতিকতার বিষয়টি জড়িত। তবে এক্ষেত্রে জাপানের রাষ্ট্রীয় প্রচারণার ভূমিকাটাও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পৃথক দোকান, ক্যাটালগ এমনকি যথাযথ মালিকের কাছে দেখা করে সেটি ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে!

প্রকাশিত এক তথ্যে জানা যায়, জাপানে এই ধরনের হারানো জিনিস ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য লস্ট এন্ড ফাউন্ড সেন্টারও রয়েছে। টোকিও মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিপার্টমেন্টের লস্ট এন্ড ফাউন্ড সেন্টার হতে ২০১৬ সালে ৩৬৭ কোটি ইয়েন (৩ কোটি ২০ লাখ ডলার) পরিমাণ অর্থ এর মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু টাকা নয়, তারা ৩৮ লাখ ৩০ হাজার হারানো জিনিসও ফিরিয়ে দিয়েছে মালিকের কাছে!

জানা গেছে, জাপানের শহর এবং উপশহরগুলোতে অন্ততপক্ষে ৬ হাজার পুলিশবক্স রয়েছে এসব কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস জমা দেওয়ার জন্য। প্রাথমিকভাবে কোনও জিনিস হারিয়ে ফেললে কিংবা কুড়িয়ে পেলে সেটি জানানো হয় এসব পুলিশ বক্সে। তবে জিনিসগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার পিছনে অর্থনৈতিক বিষয়টিও জড়িত রয়েছে। যিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন তাকে ওই জিনিসের প্রকৃত মূল্যের ৫ হতে ২০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করার নিয়ম চালু রাখা হয়েছে।

যদি কোনো জিনিসের মালিক খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে সেটি যে নিয়ে এসেছেন শেষ পর্যন্ত তাকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আবার এসব হারিয়ে যাওয়া জিনিসের পৃথক দোকানও রয়েছে জাপানে। এই জিনিসগুলো যদি কেও কিনে না নিতেন তাহলে প্রতিবছর এমন অনেক পণ্যই হয়তো অব্যবহৃত হয়ে পড়ে থাকতো কিংবা ফেলে দেওয়া হতো।

সংবাদ মাধ্যমের খবরে আরও জানা যায়, সামাজিকভাবে জাপানের শিশুদের এইসব বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। পুলিশ বক্স ছাড়াও যেসব দোকানে হারানো জিনিসের খোঁজ করা হয় সেগুলো ‘কোবান’ নামে পরিচিত। জাপানের বাবা-মা এবং শিক্ষকরা তাদের শিশুদেরকে ছোটবেলা থেকেই কোবানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

উল্লেখ্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের থেকে খুনের ঘটনা জাপানে অনেক কম। আবার তাদের অন্যান্য অপরাধের পরিমাণও দিনদিন উল্লেখযোগ্যহারে কমছে। সে কারণে জাপান কর্তৃপক্ষ নিশ্চিন্তমনেই হারানো জিনিস ব্যবস্থাপনায় মনযোগ দিতে পারছেন।

তথ্য সূত্র: www.japantimes.co.jp

Advertisements
Loading...