আজ নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ৬৯তম জন্মদিন

হুমায়ূন আহমেদ জন্মেছিলেন ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ আজ নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ৬৯তম জন্মদিন। সাহিত্যাঙ্গনে কিংবদন্তি হুমায়ূন আহমেদ জন্মেছিলেন ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে।

হুমায়ূন আহমেদের বাবা ফয়জুর রহমান আহমদ ও মা আয়েশা আখতার খাতুন। বাবা পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হন। তাঁর বাবা লেখালিখি করতেন। বগুড়া থাকাকালীন তিনি একটি গ্রন্থও প্রকাশ করেন। গ্রন্থের নাম হলো ‘দ্বীপ নেভা যার ঘরে’।

হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের একজন খ্যাতিমান শিক্ষক ও কথাসাহিত্যিক। সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবীব রম্য সাহিত্যিক ও কার্টুনিস্ট। হুমায়ূন আহমেদের ছোট তিন বোন শিকু, শিফু এবং মনি।

খুব ছোটকালে হুমায়ূন আহমেদের নাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান। ডাক নাম ছিলো কাজল। তার বাবা নিজের নাম ফয়জুর রহমানের সঙ্গে মিল রেখে ছেলের নাম রাখেন শামসুর রহমান। পরবর্তীতে তিনি নিজে থেকেই নাম পরিবর্তন করে হুমায়ূন আহমেদ রাখেন।

হুমায়ূন আহমেদের বাবার চাকরি সূত্রে নেত্রকোনা, দিনাজপুর, বগুড়া, সিলেট, পঞ্চগড়, রাঙামাটি এবং বরিশালে তার শৈশব কেটেছে। সেই সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করার সুযোগও পেয়েছেন তিনি। তিনি বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন এবং রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সব গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। পরে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন ও সেখান থেকেই বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন ও প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি (সম্মান) এবং এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।

হুমায়ূন আহমেদ মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। ৫৬৪ নং কক্ষে ছাত্রজীবন অতিবাহিত করেন। জনপ্রিয় কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা ছিলেন তার রুমমেট। এমএসসি শেষে হুমায়ূন আহমেদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি হতে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন। তবে প্রচারবিমুখ এই বিস্ময় পুরুষ সাধারণত নামের শেষে কখনও ‘ড.’ উপাধিটি ব্যবহার করতেন না।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ কর্মে প্রবেশ করেন ১৯৭৩ সালে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ লিখেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। লেখালেখিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় একসময় অধ্যাপনাও ছেড়ে দেন তিনি।

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৭৩ সালে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ। ভালোবেসেই তিনি গুলতেকিনকে বিয়ে করেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের উত্থান ও তার প্রথম জীবনের সংগ্রামে নেপথ্যের নায়িকা হয়ে ছিলেন তারই স্ত্রী। হুমায়ূন আহমেদ তার ‘হোটেল গ্রেভার ইন’বইতে সেই সাক্ষ্য নিজেই দিয়েছেন।

হুমায়ূন-গুলতেকিন দম্পতির তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে রয়েছে। তিন মেয়ের নাম বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ ও ছেলের নাম নুহাশ আহমেদ। আরেকটি ছেলে অকালে মারা যায়।

১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগ থেকে শীলার বান্ধবী ও তার বেশ কিছু নাটক-চলচ্চিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রী শাওনের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠতা জন্মে। যে কারণে সৃষ্ট পারিবারিক অশান্তির অবসানকল্পে ২০০৫ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয় ও ওই বছরই শাওনকে বিয়ে করেন তিনি।

এই ঘরে তাদের তিন ছেলে-মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। প্রথম ভূমিষ্ঠ হওয়া কন্যাটি মারা যায়। সেই কন্যার নাম রেখেছিলেন লীলাবতী। তাকে একটি বইও উৎসর্গ করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ছেলেদের নাম নিষাদ হুমায়ূন এবং নিনিত হুমায়ূন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের ছাত্র থাকা অবস্থাতে সাহিত্যে যাত্রা শুরু করেন ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে, ১৯৭২ সালে। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ছিলো তাঁর ২য় গ্রন্থ। তারপর হতে যেখানেই হাত দিয়েছেন হুমায়ূন, সেখানেই যেনো সোনা ফলেছে। সময়ের অববাহিকায় দীর্ঘদিনের সাহিত্য জীবনে তিনি রচনা করেছেন প্রায় তিন শতাধিক গ্রন্থ, যা বিশ্ব সাহিত্যে একজন লেখক হিসেবে তাঁকে এনে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা।

হুমায়ূন আহমেদের রচনাসমগ্রের মধ্যে এইসব দিনরাত্রি, জোছনা ও জননীর গল্প, মন্দ্রসপ্তক, দূরে কোথাও, সৌরভ, নি, ফেরা, কৃষ্ণপক্ষ, বাসর, সাজঘর, গৌরীপুর জাংশান, বহুব্রীহি, দারুচিনি দ্বীপ, আশাবরি, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, আমার আছে জল, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি, মেঘ বলেছে যাবো যাবো, শ্রাবণ মেঘের দিন, মাতাল হাওয়া, শুভ্র গেছে বনে, বাদশাহ নামদার, রূপা, এপিটাফ, আমরা কেউ বাসায় নেই, মেঘের ওপারে বাড়ি, আজ চিত্রার বিয়ে, এই মেঘ, রৌদ্রছায়া, তিথির নীল তোয়ালে, আয়নাঘর, জলপদ্ম, হুমায়ূন আহমেদের হাতে ৫টি নীলপদ্ম ইত্যাদি।

হুমায়ূন আহমেদের লিখেছেন অসংখ্য ছোট গল্প। তাঁর ছোট গল্পগুলো বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ভৌতিক গল্পেও জুড়ি নেই হুমায়ূন আহমেদের। এর বাইরে কবিতা ও গানও লেখাতে হাত চালিয়েছেন। বিশেষ করে একজন গীতিকবি হিসেবে হুমায়ূন ‘বরষার প্রথম দিনে’, ‘যদি মন কাঁদে তবে চলে এসো’, ‘চাঁদনি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’, ‘চাঁদনী পসরে কে আমারে স্মরণ করে’,‘আমার ভাঙা ঘরে’, ‘ও আমার উড়াল পঙ্খিরে’ ইত্যাদি গানে নিজেকে কালজয়ী করে গেছেন হুমায়ূন আহমেদ। সাহিত্যে তাঁর অবদান ভোলার নয়। তিনি ছোট-বড় সকলের প্রিয় লেখক ছিলেন। আজ এই নন্দিত কথাসাহিত্যিকের ৬৯তম জন্মদিনে আমরা তাঁকে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধাভরে।

আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...