ফার্নিচার দোকানি হয়ে গেছেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট!

২০১৪ সালের ২২ জুলাই নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর নাম ঘোষিত হয়

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ খুব সাধারণ জীবন-যাপন করেও মানুষের মন জয় করে শেষ পর্যন্ত একজন ফার্নিচার দোকানি থেকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছেন জোকো উইদোদো।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো ২০১৪ সালের জুনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে জনসমর্থন নিতে মাঠে নামেন। তাঁর সাধারণ জীবন-যাপন দেখে মানুষ মুগ্ধ হন এবং তাঁকে নির্বাচিত করেন।

রাজনৈতিক অভিজাত পরিবার কিংবা সেনাবাহিনীর অফিসার বৃত্তের বাইরে সাধারণত কোনো নাগরিক ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট হননি। বিশ্বের জনসংখ্যায় বৃহত্তর এই মুসলিম রাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট হওয়াটাও খুব একটা সোজা কথা নয়। সেখানে সামান্য ফার্নিচারের দোকানির ছেলে হয়ে জোকো উইদোদো হয়ে যান সে দেশের সপ্তম প্রেসিডেন্ট।

তাঁর ইতিহাস একেবারে পরিষ্কার। ২০০৫ সাল হতে ২০১২ সাল পর্যন্ত সুরাকার্তার মেয়র ছিলেন তিনি। মেয়রের পদে লড়ার সময় তাঁর সম্পদ ও আসবাবপত্রের ব্যবসায়ী হওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। তবে তিনি জনসাধারণের সঙ্গে মজবুত সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। মেয়র হওয়ার পর তিনি নিজ শহরকে যুগোপযোগী করার জন্য ইউরোপীয় উন্নয়ন কাঠামো নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এই উদ্যোগের প্রথম কাজ হিসেবে সবাইকে তাক লাগান দুর্লভ জিনিসের মার্কেট এবং গৃহস্থালি দ্রব্যের মার্কেট বা নতুন প্রথাগত মার্কেট তৈরি করার মাধ্যমে। সুরাকার্তার প্রধান সড়কের পাশাপাশি ৭ কিমি দীর্ঘ সড়ক এবং তিন মিটার চওড়া ফুটপাথ নির্মাণ করেন তিনি। শহরের পার্ক সংস্কার, রাস্তার পাশের গাছ সংরক্ষণ ও শহরকে সংস্কৃতি এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন তিনি। ২০১২ হতে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাকার্তার গভর্নরও ছিলেন। জাকার্তার গভর্নর থাকাকালীন জোকো ব্লুসুকান নামক নীতি অনুসরণ করেন তিনি।

তিনি এর মাধ্যমে নিয়মিত জাকার্তাব্যাপী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিশেষত দরিদ্র এলাকায় ভ্রমণ করতেন। সফরে তাঁকে সাধারণ পোশাকেই দেখা যেতো। তিনি এই সময় বিভিন্ন বাজার ও সরু গলিতে হেঁটে বাসিন্দাদের বিভিন্ন সমস্যা যেমন খাদ্যের মূল্য, আবাসন সমস্যা, স্থানীয় বন্যা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এসব নানা বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে যে, তাঁর এসব কর্মপ্রণালি জাকার্তা এবং ইন্দোনেশিয়ার অনত্র জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করে। ২০১৪ সালের এপ্রিল এবং জুন মাসে জোকো লেলাং জাবাতান নামক একটি আমলাতান্ত্রিক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করেন। এই প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক সরকারি কর্মচারী যোগ্যতা পূরণ এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সাপেক্ষে নির্দিষ্ট পদ লাভের সুযোগ পেতেন। এরপর ২০১৪ সালের ২২ জুলাই নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর নাম ঘোষিত হয়।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি প্রশংসনীয় অনেক কাজই করেন। ২০১৫ সালের প্রথম চতুর্ভাগে জিডিপি ৪.৯২% বৃদ্ধি পায়। মাদক এবং দুর্নীতির ক্ষেত্রে দেশটির প্রচলিত আইন ও তার নির্দেশে এই ধরনের অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় কঠোরভাবে। তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়লেও দেশের স্বার্থে যে কোনো নীতি গ্রহণ করেন তিনি। সার্বভৌমত্ব রক্ষা, ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকদের সুরক্ষা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতি বৃদ্ধি হলো তাঁর মূলনীতি।

ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন জোকো উইদোদো। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ২১ জুন ১৯৬১ সালে। জোকো উইদোদো জাভানিজ বংশোদ্ভূত। নাম পরিবর্তনের পূর্বে তাঁকে মুলয়ুন ডাকা হতো। বাবা নোতো মিহার্জো এবং মা সুজিয়াতমির চার সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন জোকো। তাঁর দাদা বোয়য়োলালির এক ছোট গ্রাম হতে এসে কারানগানায়ারে বসত গড়েন। তাঁর বাবা সেখান থেকে জাভায় চলে যান। অসচ্ছল নাগরিকদের স্কুল বলে পরিচিত স্টেট প্রাইমারি স্কুল ১১১, তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় টিরটুয়ুসুতে।

১২ বছর বয়সে বাবার আসবাবপত্রের দোকানে কাজ শুরু করেন। মাধ্যমিক পার হতেই তিনবার অকৃতকার্য হন। প্রাথমিকের ধাপ শেষে স্টেট জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি হন তিনি। তারপর স্টেট সিনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় নিম্ন সারির একটি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। আসবাবপত্রের দোকানে কাজ করতে করতে কাঠ আর তৈরি আসবাবপত্রের ওপর আগ্রহ জন্মে তার। এরপর অনেক অর্থকষ্টের মধ্যদিয়েও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। যুগজাকার্তার গাদজাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্টি অনুষদ হতে গ্র্যাজুয়েশন করেন ১৯৮৫ সালে। সেখানেই তিনি প্লাইউড ব্যবহারের ওপর গবেষণা শুরু করেন। জোকো ও তাঁর স্ত্রী ইরিয়ানার তিনটি সন্তান রয়েছে।

খুব সাধারণ পরিবার হতে উঠে এসেও জিতে নিয়েছেন সম্মানজনক সর্বোচ্চ একটি অবস্থান। আস্থা গড়েছেন মানুষের হৃদয়ে। শুধু মানুষের ভালোবাসা নয়, কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন অনেক পুরস্কারও। দেশীয় সম্মাননা হিসেবে পেয়েছেন বিনতাং জাসা উতামা-২০১১, বিনতাং রিপাবলিক ইন্দোনেশিয়া আদিপুরনা-২০১৪। তাঁর অর্জনের ঝুলিতে রয়েছে বিদেশি অনেক সম্মাননাও। ব্রুনাই হতে পেয়েছেন দারজাহ কেরাবাত লাইলা উতামা ইয়াং আমাত দিহুরমাতি-২০১৫। সৌদি আরব তাকে অর্ডার অব আবদুল আজিজ আল সৌদ-২০১৫ পদকও দিয়েছে।

২০০৮ সালে টেম্পু ম্যাগাজিন কর্তৃক সে বছরের শীর্ষ দশ মেয়রের অন্যতম হিসেবে পুরস্কার পান তিনি। ২০১২ সালে অপরাধপ্রবণ শহর হতে শিল্প, সংস্কৃতি এবং পর্যটক আকর্ষণের শহরে রূপান্তর কৃতিত্বে বিশ্ব মেয়র পুরস্কারের জন্য তৃতীয় স্থান লাভ করেন তিনি। ২০১৩ সালে ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন কর্তৃক সে বছরের নেতৃস্থানীয় বিশ্ব চিন্তাবিদের অন্যতম হন তিনি। সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে লন্ডনভিত্তিক দ্য সিটি মেয়রস ফাউন্ডেশন কর্তৃক গ্লোবাল মেয়র অব দ্য মান্থ হিসেবে মনোনয়ন লাভও করেন। ২০১৪ সালে ফরচুন ম্যাগাজিন কর্তৃক বিশ্বের ৫০ জন বড় নেতার তালিকায় তাঁর নাম স্থান পায়। রাজনৈতিক এই নেতা শুধু দেশ ও মানুষ নিয়েই সব ভাবনার রাজ্য পেতে বসেন তা নয়, তিনি বড়সড় মাপের একজন সংগীতপ্রেমীও। তাও যেনতেন সংগীত নয়, হেভি মেটাল ব্যান্ড।

সে হিসেবে বলা যায় যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন উইদোদো হেভি মেটাল সংগীতের একজন একনিষ্ঠ ভক্তও বটে। তিনি সফর করছেন বাংলাদেশ। শনিবার বিকাল ৪টা ৩৫ মিনিটে ইন্দোনেশিয়া হতে একটি বিশেষ ফ্লাইটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে নামলে উইদোদোকে অভ্যর্থনা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং তার স্ত্রী রাশিদা খানম। বাংলাদেশের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্ক সব সময় খুবই ভালো। একটি মুসলিম দেশ হিসেবে আমাদের পক্ষ হতে অনেক অনেক অভিনন্দন ও মোবারকবাদ রইলো।

Advertisements
Loading...