এবার নিবন্ধনের আওতায় আসছে মোবাইল হ্যান্ডসেট!

অবৈধভাবে আমদানি এবং নকল মোবাইল হ্যান্ডসেট চিহ্নিত করার জন্য সেইসব সেটগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হচ্ছে

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ সিম নিবন্ধনের বিষয়টি এতোদিন মানুষের কাছে বেশ জটিল মনে হলেও এখন তা খুব সহজ বলেই মনে হচ্ছে। এবার নিবন্ধনের আওতায় আসছে মোবাইল হ্যান্ডসেট!

বিটিআরসি জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রতিটি মোবাইল হ্যান্ডসেটকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। ক্রয়কৃত প্রতিটি হ্যান্ড সেটই নিবন্ধন করতে হবে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি হ্যান্ডসেটই নিবন্ধনের আওতায় আনার কথা বলেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি।

বাংলাদেশে বছরে ২৫ হতে ৩০ ভাগ মোবাইল হ্যান্ডসেট নানা অসাধু উপায়ে সরকারি কর ফাঁকি দিয়ে দেশের বাজারে চলে আসে। এতে করে প্রতিবছর ৮শ হতে ১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হতে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

সে কারণে অবৈধভাবে আমদানি এবং নকল মোবাইল হ্যান্ডসেট চিহ্নিত করা ও বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে যতোগুলো রেডিও ডিভাইস অর্থাৎ মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবহৃত হবে সেইসব সেটগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। এতে করে গ্রাহকদের সিমের মতোই তাদের হ্যান্ড সেটটিও নিবন্ধিত থাকবে।

বিটিআরসি স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিম পারভেজ সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, এটি প্রবর্তন করা হলে অবৈধভাবে আমদানি, চুরি এবং নকল হ্যান্ডসেট প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে, সেইসঙ্গে গ্রাহকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যাবে। আবার মোবাইল ফোনের হিসাবও রাখা যাবে। শেষ কথা হলো সরকারি রাজস্বের ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব হবে।

জানানো হয়েছে যে, মূলত ৩টি ধাপে এই প্রক্রিয়াটি শুরু করা হবে :

প্রথম ধাপ : বৈধ ফোন চিনে রাখা

প্রথমত: বাংলাদেশে বর্তমানে যতোগুলো হ্যান্ডসেট বৈধভাবে আমদানি করা হচ্ছে এবং স্থানীয়ভাবে যেসব মোবাইলগুলো অ্যাসেমব্লিং করা হচ্ছে কিংবা উৎপাদিত হচ্ছে সেগুলোর ১৫ ডিজিটের স্বতন্ত্র আইএমইআই নম্বর নিয়ে একটি বৈধ ফোনের ডাটাবেজ তৈরি হবে।

এতেকরে একজন মানুষ যখন মোবাইল ফোন কিনতে যাবেন তখন তারা সেই সেটটির আইএমইআই নম্বর দিয়ে খুব সহজেই জানতে পারবেন যে তাদের সেটটি বৈধ নাকি অবৈধ।

দ্বিতীয় ধাপ : হ্যান্ডসেট কীভাবে নিবন্ধন করবেন?

দ্বিতীয় ধাপ হলো বিটিআরসি তাদের ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্ট্রার (ইআইআর) খসড়া নির্দেশনা- অর্থাৎ ইআইআর তৈরি করবে। যার আওতায় দেশের প্রতিটি সক্রিয় সেটকে নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

ইতিমধ্যে বিশ্বের বড় বড় কোম্পানির ইআইআর যাচাই করে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য ২৪ পাতার একটি প্রতিবেদনও তৈরি করেছে বিটিআরসি। ইতিমধ্যেই এই প্রতিবেদনটি যাচাইয়ের জন্য মোবাইল অপারেটরগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে।

সেখানে যদি কোনো সংশোধনের প্রয়োজন পড়ে তাহলে সেটা সম্পন্ন করে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ওই প্রতিবেদনটি বিটিআরসি কমিশনে পাঠানো হবে।

খসড়া নির্দেশনাটিকে চূড়ান্ত হলে প্রত্যেক অপারেটরকেই তাদের নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা প্রতিটি সক্রিয় হ্যান্ড-সেটের ডাটাবেজ তৈরির সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। তবে গ্রাহকদের হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের জন্য কোথাও যেতে হবেনা। তারা নিজেদের নিবন্ধিত সিমটি সেটে সক্রিয় করলেই তখন সেটটি ওই নামে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধন হয়ে যাবে।

তবে ওই সেটে যদি দ্বিতীয় সিম ব্যবহার করতে হয় সেক্ষেত্রেও সেটিও অবশ্যই একই নামে নিবন্ধিত সিম হতে হবে।

তাছাড়া কারও যদি একাধিক সেট থেকে থাকে তাহলে তিনি দ্বিতীয় সেটটিতে যে নামের সিমটি সক্রিয় করবেন, সেই নামেই তার দ্বিতীয় সেটটি নিবন্ধিত হয়ে যাবে। তখন ওই সেটে অন্য নামের কোনো সিম চলবেনা বা ব্যবহার করা যাবে না। অর্থাৎ একটি সেট কেবলমাত্র একজনের নামেই নিবন্ধিত হবে। এভাবে একেকটি অপারেটরের পৃথক ডাটাবেজ সম্পন্ন হবে।

আপনার হ্যান্ডসেটটি কোন ক্যাটাগরির তা বুঝবেন কীভাবে?

এই ডাটাবেজকে ব্ল্যাক, হোয়াইট ও গ্রে- এই ৩টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হবে। খসড়া নির্দেশনায় ‘হোয়াইট’ বলতে বোঝানো হয়েছে, বৈধভাবে আমদানি করা ও দেশে বৈধভাবে তৈরি হ্যান্ডসেটগুলো। অর্থাৎ যে সেটগুলো বিটিআরসির নিবন্ধিত।

‘গ্রে’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে মূলত ক্লোন, অনুমোদনহীন নকল, অবৈধভাবে আমদানি হয়ে আসা সেটগুলোকে। এই সেটগুলো অবৈধ হলেও এবারের মতো সেগুলোকে অনুমোদন দেওয়া হবে।

যারা ইতিমধ্যে এগুলো ব্যবহার করছেন বা দেশের বাইরে থেকে আনিয়েছেন তাদেরকে একটি সময় বেঁধে দেওয়া হবে যেনো তারমধ্যেই তারা নিবন্ধিত সিম দিয়ে সেটটিকে সক্রিয় করে নিতে পারেন।

অপরদিকে চুরি যাওয়া হ্যান্ড-সেটের আইএমইআই, মেয়াদ উত্তীর্ণ আইএমইআই যুক্ত সেট কিংবা নকল আইএমইআই সম্পন্ন হ্যান্ডসেটগুলোকে ‘ব্ল্যাক’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যখন পূর্ণাঙ্গভাবে ডাটাবেজ তৈরি হয়ে যাবে তখন সম্পন্ন করা হবে সর্বশেষ অর্থাৎ তৃতীয় ধাপের কার্যাদি।

তৃতীয় ধাপ : কমন সার্ভার

তৃতীয় ধাপের ক্ষেত্রে সরকার একটি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচিত করবে যারা বিটিআরসির জন্য এই কেন্দ্রীয় প্লাটফর্ম কিংবা কমন সার্ভার তৈরি করবে।

যেখানে প্রতিটি অপারেটরের ডাটাবেজগুলো সিঙ্ক্রোনাইজ হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশে সক্রিয় প্রতিটি হ্যান্ডসেট কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসা হবে। তখন এটির নাম হবে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্ট্রার- এনইআইআর।

এতেকরে ইআইআর এর নতুন কোনো ডেটা সংযুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি অটোমেটিকভাবে এনইআইআরে চলে আসবে।

সেট বিক্রি করতে গেলে বা হারিয়ে গেলে আপনি কী করবেন?

কেও যদি কখনও তার নিবন্ধিত সেট অন্য কাওকে দিতে চান বা বিক্রি করতে চান সেক্ষেত্রে সেটটিকে পুন:নিবন্ধন করতে হবে।এক্ষেত্রে নিজের নাম অনিবন্ধিত করে যার কাছে সেট দেবেন তার নামে হ্যান্ডসেটটি পুনরায় নিবন্ধিত করতে হবে। সেটি কিভাবে করা হবে তা কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়ে জানিয়ে দেবে। তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা মোবাইল ফোন অপারেটরদের এই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

যদি কখনও আপনার ফোন হারিয়ে যায় বা চুরি যায় সেক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানটি আমার পরিচয় শনাক্ত করে ফোনটি লক করে দিতে পারবে। যেনো আপনার ফোনটি আর কেও কোথাও ব্যবহার করতে না পারে।

ব্যতিক্রম বিষয়:

তবে কর্পোরেট সিম এবং সেটের ক্ষেত্রে নিয়ম কিছুটা ভিন্ন রয়েছে। যেমন আপনার অফিস যদি আপনাকে একটি সিম এবং হ্যান্ডসেট দেয়। সেক্ষেত্রে আপনার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর দিয়ে ওই সেটটি তখন আগে নিজের নামে নিবন্ধন করে নিতে হবে। তারপর সেটিতে কোম্পানির সিম ব্যবহার করা যাবে।

আবার সরকার চাইলে তাদের বিশেষ নির্দেশনা বিশিষ্ট তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের হ্যান্ডসেট ব্যবস্থাপনার বাইরেও রাখতে পারবে। মূলত পুরো প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত হওয়ার পর বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলে জানানো হয়েছে।

Advertisements
Loading...