সমুদ্রে ভাসে বিমানবন্দর!

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ বিমান বন্দর সমুদ্রে ভাসে এমন কথা শুনলে সকলেরই আশ্চর্য হওয়ার কথা। কিন্তু ঘটনাটি আসলেও সত্য। ডাঙ্গাতে যেমন প্রতিষ্ঠিত বিমান বন্দর ঠিক তেমনিভাবে সমুদ্রেও একইভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভাসমান বিমান বন্দর।

Floating airport

বিশ্বে প্রতিনিয়তই কিছু না কিছু নতুন কর্মকাণ্ড ঘটে চলেছে। এরকমই এক শিল্পনৈপুণ্যের উদাহরণ হল, জাপানের ক্যানসাই ভাসমান বিমানবন্দর। গত শতকে ছয়ের দশকে জাপানের ক্যানসাই প্রদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। কারণ প্রায়ই তারা জাপানের অন্য অঞ্চলের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ হারাচ্ছিল। তখন এ সমস্যার সমাধানের একটিই মাত্র উপায় ছিল, একটি বড় আকারের বিমানবন্দর তৈরি করা। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল জায়গা নিয়ে। জায়গার যে বড় অভাব। প্রথমে ঠিক হল কোবে শহরে বিমানবন্দর তৈরি করা হবে। কিন্তু কোবেবাসীরা জানাল, তাদের বিমানবন্দরের দরকার নেই। এরকম এক পরিস্থিতিতে কোথাও জায়গা না পেয়ে এক অকল্পনীয় সিদ্ধান্ত নিলেন কর্তৃপক্ষ। তারা সমুদ্রের উপরেই ভাসমান বিমানবন্দর তৈরি করবেন বলে ঠিক করেন।

জাপানের একদম দক্ষিণে ওসানা সমুদ্র তীর থেকে কিছুটা দূরে জায়গা ঠিক করা হল। কিন্তু স্থানীয় ধীবররা সেখানেও জায়গা দিতে রাজি হলেন না। তারা জানালেন, সেখানে বিমানবন্দর হলে মাছ ধরতে অসুবিধা হবে। প্রচুর ক্ষতিপূরণ দিয়ে অবশেষে তাদের রাজি করানো হল। ১৯৮৭ সালে শুরু হল এ বিমানবন্দর তৈরির কাজ। সমুদ্রের মধ্যে একটি বিমানবন্দর তৈরি করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। প্রথমে সমুদ্রের মধ্যে পাথর ফেলে দেয়াল তোলা হল। এর জন্য তিনটি পাহাড় থেকে ২১ মিলিয়ন কিউবিক পাথর সংগ্রহ করে প্রায় তিন বছর ধরে ১০ হাজার শ্রমিক এককোটি কর্মঘণ্টা খরচ করে ৮০টি জাহাজের সাহায্যে সমুদ্রের তলা থেকে প্রায় তিরিশ মিটার উঁচুতে জমি গড়ে তুলল। ধীরে ধীরে সেটি একটি দ্বীপের আকৃতি নিল।

এরপর মূল ভূখণ্ড রিনকুর সঙ্গে দ্বীপটিকে যুক্ত করার জন্য তিন কিলোমিটার লম্বা একটি ব্রিজ তৈরি করা হল। এ ব্রিজটিতে মোটরগাড়ি চলার জন্য ছয়টি লেন এবং রেলগাড়ির জন্য দুটি লেন তৈরি হল। এটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল এক কোটি ডলার। অনেকে ভবিষ্যদ্বাণী করতে শুরু করলেন, নির্মাণকাজ শুরু হলেই এ বিপুল ওজন বইতে না পেরে সব জিনিসপত্রের ভারে দ্বীপটি ডুবতে শুরু করবে। বাস্তবে তাই হল। যা আশংকা করা হয়েছিল তার চেয়েও বেশি, অর্থাৎ প্রায় আট মিটার সমুদ্রে ডুবে গেল ক্যানসাই। এরকম যখন পরিস্থিতি অনেকেই তখন ভয় পেয়ে গেলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ হাল ছাড়তে নারাজ।

অনেক হিসাব-নিকাশ করে তারা দেখলেন, বিমানবন্দর তৈরির জিনিসপত্রের ওজন হালকা করতে পারলে এক সময় দ্বীপটির ডুবে যাওয়ার আশংকাও কমে যাবে। এসব কথা ভেবে টার্মিনালে পাতলা ধাতব প্লেট ব্যবহার করা হল। এতে খরচও বেড়ে যাচ্ছিল অনেক। খরচ কমাতে দ্বীপের পরিধি কমিয়ে ফেলার জন্য চাপ দিতে থাকল জাপান সরকার। কিন্তু প্রকল্পের মূল স্থপতি ইতালির রেনজো পিয়ানো তা মানতে রাজি না হওয়ায় দ্বীপের মূল আকৃতি অপরিবর্তিত রেখেই কাজ এগিয়ে যেতে থাকল। চার কিলোমিটার লম্বা ও আড়াই কিলোমিটার চওড়া ভাসমান ক্যানসাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হল ১৯৯৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। সেই থেকে এ বিমানবন্দরে সপ্তাহে আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বিমান ওঠানামা করে ৬১৪টি, মালবাহী বিমান ২০০টি এবং অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলের সংখ্যা ৪৯৩, মহাশূন্য থেকে দেখা যায় এ বিমানবন্দর। বিশ্বের দ্বিতীয় খরচে বিমানবন্দর হল এটি। এখানে এক কাপ কফির দাম ১০ ডলার। তাহলে সহজেই অনুমান করা যায়, অন্যান্য খরচ কেমন হবে!

ক্যানসাই বিমানবন্দরের ডুবে যাওয়ার আশংকা ধীরে ধীরে কমেও এসেছে। ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এর ডুবে যাওয়ার মাত্রা ৫০ সেন্টিমিটার থেকে কমে ৯ সেন্টিমিটারে এসে থেমেছে। বিমানবন্দরটির একেবারে ডুবে যাওয়ার আশংকা প্রায় নেই বললেই চলে। তাই একে আরও বড় করা হয়েছে। ২০০৭ সালে এর দ্বিতীয় রানওয়ে খোলার কথা থাকালেও তা স্থগিত আছে। কর্তৃপক্ষ ঠিক করেছেন, ভবিষ্যতে একে আরও বড় করে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে দেবেন।

প্রায় পৌনে দু’কিলোমিটার লম্বা। এ টার্মিনালটির ছাদ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কোনো সামুদ্রিক ঝড় এর ক্ষতি করতে না পারে। এ পর্যন্ত দুটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলা করেও এর তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি। ১৯৯৪ সালে ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার বেগে একটি টাইফুন বিমানবন্দরটির ওপর দিয়ে বয়ে যায়। ১৯৯৫ সালের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে বিমানবন্দরের একটি কাচও পর্যন্ত ভাঙেনি। অথচ ভূমিকম্পের উৎসস্থল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে ক্যানসাই অবস্থিত। এ বিমানবন্দরের সাফল্য দেখে ২০০১ সালে ‘দ্য আমেরিকান সোসাইটি অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স’ একে ‘সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং মনুমেন্ট অফ দ্য মিলেনিয়াম’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ক্যানসাই বিমানবন্দরের নির্মাণ কৌশল প্রয়োগ করে পরে তৈরি করা হয়েছে নিউ কিতাকুসু, কোবে, চুবু এবং হংকং বিমানবন্দর।

উল্লেখ্য, এ বিমানবন্দরটির টার্মিনাল বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা টার্মিনাল। তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...