সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম পদত্যাগ করেছেন

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক পদে ইস্তফা দিয়েছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার ইউরোপ থেকে দেশে ফেরার একদিন পর বৃহস্পতিবার তার হাতে পদত্যাগপত্র তুলে দেন আশরাফ। পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিপর্যয়ের দায় কাঁধে নিয়ে তার এই পদত্যাগ বলে আওয়ামী লীগ সূত্র নিশ্চিত করেছে। খবর দৈনিক যুগান্তরের

S. Asraful islam

সূত্র জানায়, পদত্যাগের আগে ও পরে এ নিয়ে ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে কথা বলেন সৈয়দ আশরাফ। শুভাকাক্সক্ষীরা তাকে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের অনুরোধ জানালেও তিনি তা করেননি। তিনি তার ঘনিষ্ঠজনদের বলেছেন, দলের ভরাডুবির জন্য যদিও এককভাবে কেউ দায়ী নয় কিন্তু কাউকে না কাউকে এর দায় নিতে হবে। আর দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার ওপরই এ দায় বর্তায়। তাই তিনি পদত্যাগ করেছেন। সূত্র জানায়, পদত্যাগপত্রেও এসব কথা বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেই পরাজিত হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থীরা। হারের অন্যতম কারণ হিসেবে দলীয় কোন্দল এবং ক্ষমতাবানদের সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের দ্বন্দ্ব উঠে আসে। এরপর গত ছয় জুলাই গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে প্রচারণার পরও হেরে যায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী। এ জন্যও অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দায়ী করা হয়। পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেই দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা ছিল না। বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তার পদত্যাগেরও দাবি ওঠে। দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বাইরে থাকায় বিক্ষুব্ধরা চুপ করে থাকলেও তিনি ফেরা মাত্রই তারা আবার সোচ্চার হয়ে ওঠেন। একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ হাসিনার কাছে আশরাফের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেন। দলের ভেতরে-বাইরে নেতাকর্মীরা আশরাফের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে আগে থেকেই বিক্ষুব্ধ ছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার দলীয় সভানেত্রীর সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে দেখা করতে যান আশরাফ। সেখানে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। সূত্রের দাবি, তখনই আশরাফ পদত্যাগপত্র জমা দেন।

সৈয়দ আশরাফের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের রয়েছে একরাশ অভিযোগ। তাকে ফোন করলে তিনি ফোন ধরেন না। এমনকি দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফোন আশরাফ ধরেননি বলে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে উলেস্নখ করেছিলেন শেখ হাসিনা। গণমাধ্যম কর্মীদেরও তার বিরুদ্ধে একই অভিযোগ। তিনি ফোন ধরেন না কোনো বিষয়ে মন্তব্যও দেন না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং মুখপাত্র হলেও তার কাছ থেকে অধিকাংশ ইস্যুতে দলের বক্তব্য পাওয়া যায় না। দলের নেতাকর্মীদের অভিযোগের মাত্রা আরও অনেক বেশি। বিপদে-আপদে সাধারণ সম্পাদককে পাশে না পাওয়া, দলীয় ও সাংগঠনিক কাজে নিষ্ক্রিয় থাকা, এমনকি দিনের পর দিন তার বাসায় গিয়ে তার সাক্ষাৎ না পেয়ে ফিরে আসার বেদনা রয়েছে অনেক নেতাকর্মীর মনে। তাছাড়া স্থানীয় সরকার, পলস্নী উন্নয়ন ও সমবায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হলেও তিনি অফিস করেন না বললেই চলে। এ নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

দলের সাধারণ সম্পাদকের পদত্যাগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউলস্নাহর কাছে ফোনে জানতে চাইলে এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে মন্তব্য করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, পদত্যাগের কথা তিনি সাংবাদিকদের কাছেই শুনেছেন। এরপর কয়েকবার আশরাফকে ফোন করেছেন। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। তবে, শনিবার দুপুরে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে দলে যে পরিবর্তন দরকার তাই করা হবে। যত শক্ত সিদ্ধান্তই নিতে হোক দলীয় সভানেত্রী তা নেবেন। শেখ হাসিনা দল পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের জন্য দৃঢ় মনোভাব পোষণ করছেন বলে জানান জাফরউলস্নাহ। আগামী দু’একদিনের মধ্যেই এসব পরিবর্তন হবে বলে তিনি উলেস্নখ করেন। এ সময় বিশেষ সম্মেলনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে জাফরউলস্নাহ বলেন, নেতাকর্মীদের দাবি মেটানো হবে।

দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ যুগান্তরের কাছে দাবি করেন, এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।

প্রসঙ্গত আওয়ামী লীগের ২০০৯ সালের ২৪ জুলাইয়ের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এর আগে এক-এগারোর সময় ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন তিনি। শেখ হাসিনা মুক্তি আন্দোলন বেগবান করেন। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিলস্নুর রহমানের সঙ্গে মিলে দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করেন, দলকে সুসংগঠিত করেন। সর্বোপরি শেখ হাসিনাকে জেল থেকে মুক্ত করতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নজরকাড়া ভূমিকা পালন করে নিরংকুুশ বিজয় অর্জনে অবদান রাখেন। এরপর ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর দলের সর্বশেষ সম্মেলনেও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সৈয়দ আশরাফ।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। তবে দলের প্রভাবশালী একটি অংশ আশরাফকে সরিয়ে দিতে চান।

আশরাফের পূর্বসূরি প্রয়াত আবদুল জলিলেরও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেষের সময়গুলো সুখকর ছিল না। তিনি এক-এগারোর শেষ দিকে জেল থেকে মুক্ত হলেও আর দায়িত্ব ফিরে পাননি। পরে ২০০৯-এর সম্মেলনে তার স্থলে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সৈয়দ আশরাফ।

আবদুল জলিল ২৬ ডিসেম্বর ২০০২-এ দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর আগে জিলস্নুর রহমান দুইবার এবং সাজেদা চৌধুরী একবার শেখ হাসিনার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সৌজন্যে: দৈনিক যুগান্তর

Advertisements
Loading...