The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

প্রাণে বাঁচার জন্য কখনও কখনও রাখাল সেজে ঘুরে বেড়াতেন বাগদাদি!

তাকে সারাক্ষণ শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়ে যাওয়ার আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াতো

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ কিভাবে তিনি এতো পপুলার হলেন? কিভাবে তিনি নেতৃত্ব পেলেন? এই প্রশ্ন থাকতে পারে অনেকের মধ্যেই। ইরাকের মসুলে আল নুরি মসজিদে দাঁড়িয়ে একটা মাত্র জ্বালাময়ী ভাষণ দেওয়ার পর তাকে আর থেমে থাকতে হয়নি।

প্রাণে বাঁচার জন্য কখনও কখনও রাখাল সেজে ঘুরে বেড়াতেন বাগদাদি! 1

ওই ভাষণের পরই সাড়া পড়ে গিয়েছিল পুরো বিশ্বে। পরিবার পরিজনদের ছেড়ে সেই সময় তার দলে ভিড়েছিল হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে। কোথাও আবার একাই রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিল অনেকেই। তবে জীবনের শেষ দিনগুলোতে সেই প্রতাপ আর ধরে রাখতে পারেননি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদি।

তাকে সারাক্ষণ শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়ে যাওয়ার আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াতো। তাই মাঝেমধ্যেই মেষপালকের বেশ ধরতেন তিনি। তার সন্দেহ ছিল যে কোনও সময়, যে কোনও দিক হতে আক্রমণ হতে পারে তার ওপর। মানসিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তার খুব কাছের লোকদের প্রতিও অবিশ্বাস জন্মেছিল। বাগদাদির সহযোগীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।

গত ২৬ অক্টোবর সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের বারিশা এলাকায় বাগদাদির গোপন আস্তানায় হানা দিয়েছিলো মার্কিন বাহিনীর অভিজ্ঞ ডেল্টা ও ৭৫তম রেঞ্জার রেজিমেন্ট। হঠাৎ করে এই হামলায় কোণঠাসা হয়ে পড়েন বাগদাদি। তিন সন্তানকে নিয়ে একটি সুড়ঙ্গের মধ্যে আশ্রয় নেন তিনি। সেখানেই আত্মঘাতী জ্যাকেটের বোতাম টিপে তিন সন্তান এবং নিজেকে উড়িয়ে দেন বাগদাদি।

ওই সময় তার কয়েকজন অনুচরও ওই আস্তানাতেই ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন মার্কিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে মারাও যায়। তারপর আত্মসমর্পণও করে কয়েকজন।

বার্তাসংস্থা এপির এক খবরে বলা হয়েছে, আত্মসমর্পণকারী ওই আইএস জঙ্গিরাই মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে বাগদাদির জীবনের শেষ দিনগুলোর ওইসব বর্ণনা দিয়েছেন। মার্কিন যৌথ বাহিনীর লাগাতার হামলার কারণে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল আইএস। তাদের দখলে থাকা একাধিক এলাকা একে একে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। এতে করে নিরাপত্তাহীনতা গ্রাস করেছিল বাগদাদিকে।

ইরাক সীমান্তে পূর্ব সিরিয়ার যেটুকু অংশ তাদের দখলে ছিল, সেখানেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল বাগদাদি। একসময় নিজেকে ইসলামিক স্টেটের ‘খলিফা’ হয়ে উঠার প্রচেষ্টা করলেও, শেষ পর্যন্ত আল-কায়েদাসহ প্রতিদ্বন্দ্বী জঙ্গি সংগঠনগুলো উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ইদলিবেই আস্তানা গাড়ে। হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অন্য কারও সেখানে আসার অনুমতিও ছিল না।

ওই রকম পরিস্থিতিতে ইদলিবের ওই আস্তানায় একটি ইয়াজিদি কিশোরীকে বাগদাদি যৌনদাসী করে রাখে। বিশ্বস্ত অনুচরদের সঙ্গে তিনি কোথাও গেলে, তিনি মেয়েটিকেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন। একবার চারমাসের জন্য তিনি দাশিসাতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

সেইসময় দাশিসাতেই নিজের শ্বশুরবাড়িতে ওই মেয়েটিকে রাখার বন্দোবস্ত করে দেন। অভিযোগ রয়েছে, মাঝে মধ্যেই সেখানে গিয়ে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করে আসতেন এই আইএস নেতা। গত মে মাসে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক বাহিনী ওই কিশোরীকে উদ্ধার করে।

বার্তাসংস্থা এপিকে দেওয়া স্বাক্ষাৎকারে ওই কিশোরী বলেন, ২০১৭ সালে একবার ইদলিব ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন বাগদাদি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩টি গাড়ির ব্যবস্থাও করা হয়। স্ত্রী, নিরাপত্তারক্ষী ও ওই কিশোরীকে নিয়ে তাতে চেপে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন বাগদাদি।

তবে মার্কিন বাহিনীর হামলা করতে পারে ভেবে মাঝ রাস্তা থেকে আবার ফিরে যান। এরপর ২০১৮ সালের বসন্তের সময় ওই কিশোরীকে অন্য একজন পুরুষের হাতে তুলে দেন বাগদাদি। এই ঘটনার পর হতে আর কখনও দেখা হয়নি তাদের মধ্যে। কেবলমাত্র একবার তাকে একটি গহনা উপহার পাঠিয়েছিলেন আইএসের এই নেতা।

সংবাদ মাধ্যমের খবরে জানা যায়, গত সপ্তাহে সৌদি আরবের একটি রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল আল-আরাবিয়াকে সাক্ষাৎকার দেন বাগদাদির একজন আত্মীয় মোহাম্মদ আলী সাজিদ। তিনি বলেন, মৃত্যুর আগে কয়েক মাস সর্বদা উৎকণ্ঠায় ভুগেছেন বাগদাদি। নিজের নিরাপত্তা নিয়েও আগের চেয়ে অনেক বেশি খুঁতখুঁতে হয়ে উঠেন তিনি।

মোহাম্মদ আলী সাজিদ আরও বলেন, রাতের অন্ধকার ছাড়া কখনও বাইরে বের হতেন না। একান্তই বের হতে হলে কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে, নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে বের হতেন। সেইসময় তাকে ‘হাজি’ বা ‘শেখ’ বলেই ডাকতো তার নিরাপত্তারক্ষীরা। এমনকি নিজের অনুচরদের প্রতিও অবিশ্বাস জন্মেছিল বাগদাদির। যে কোনও মুহূর্তে যে কেও বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে বা আইএস জঙ্গি সেজে কেও বাইরে থেকে দলে ঢুকে পড়তে পারে বলেও সর্বদা আতঙ্কে ভুগতেন বাগদাদি।

মোহাম্মদ আলী সাজিদ আরও বলেন, এজন্য সর্বদা নিজের সঙ্গে আত্মঘাতী জ্যাকেট কিংবা বেল্ট রাখতেন বাগদাদি। এমনকি ঘুমানোর সময়ও তিনি বিছানায় আত্মঘাতী বেল্ট রাখতেন, যাতে করে কোনোভাবেই শত্রুপক্ষের হাতে ধরা না পরেন। নজরদারি এড়াতে মাঝেমধ্যেই মেষপালকের ছদ্মবেশও নিতেন এই আইএস নেতা বাগদাদি। নিজে মোবাইল ব্যবহার না করলেও তার সহযোগীদের মধ্যে অবশ্য কেও কেও মোবাইল ফোন ব্যবহার করতো।

মোহাম্মদ আলী সাজিদ দাবি করেছেন যে, সারাক্ষণ উৎকণ্ঠায় ভুগতেন এই আইএস নেতা বাগদাদি। তার ডায়াবেটিসের সমস্যাও আচমকা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। সেজন্য সারাক্ষণ ব্লাড সুগারের ওপর নজর রাখতে হতো তাকে। তাকে নিতে হতো ইনসুলিনও। তবে এতো কিছুর পরও শেষরক্ষা হয়নি এই জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদির। মার্কিন বাহিনীর অভিযানের কারণে শেষ পর্যন্ত জীবন দিতে করতে হয়েছে তাকে।

Loading...