ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য-পথ্য

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ ডায়াবেটিস রোগীদের অনেক নিয়ম মেনে চলা একান্ত প্রয়োজন। কারণ ডায়াবেটিস হলে একজন মানুষের শরীরের নানা সমস্যা দেখা দেয়। আর তাই তাকে সতর্কভাবে চলাচল করা উচিত। সে বিষয়ে আজকের এই লেখা। আশা করি এই লেখায় অনেকেই উপকৃত হবেন।

Bloodsugar


মাটির নিচের সবজি যেমন- আলু, কি ডায়াবেটিস রোগীরা খেতে পারেন

এ রকম একটা প্রাচীন ধারণা আছে যে, ডায়াবেটিসে মাটির নিচের সবজি খাওয়া যাবে না। অথচ এর সপক্ষে কোনও যুক্তি বা তথ্য পুষ্টিবিজ্ঞানে নেই। কারণ ভাত-রুটির মতো আলু কার্বোহাইড্রেট বা শ্বেতসার জাতীয় খাদ্য। খাদ্যতন্তু, জটিল কার্বোহাইড্রেট ছাড়াও আলুতে থাকে কিছু প্রোটিন ও ভিটামিন (যেমন- নিয়াসিন, থায়ামিন ও রিবোফ্ল্যাভিন)। তাই বরাদ্দকৃত কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে সমপরিমাণ আলু খেতে কোনও বাধা নেই। যেমন কোনও ডায়াবেটিস রোগীর প্রতিদিন ২০০ গ্রাম শ্বেতসার প্রয়োজন হলে তিনি ১৫০ গ্রাম ভাত ও রুটি খেয়ে বাকি ৫০ গ্রাম আলু অনায়াসে খেতে পারেন। কোনও দিন আলু বেশি খেতে চাইলে ভাত ও রুটির পরিমাণও ওই হিসেবে কমাতে হবে। কেউ যদি ভাত ও রুটি কম খেতে না পারেন তাহলে তার ছোট দু-এক টুকরোর বেশি আলু না খাওয়াই উচিত। আলুর মতো মাটির নিচের অন্যান্য সবজি যেমন ওল, কচু
ইত্যাদি হিসাবমতো ডায়াবেটিস রোগীরা খেতে পারেন নির্দ্বিধায়।

ডায়াবেটিসে ভাত না রুটি খাওয়া ভালো

ভাত ও রুটির মধ্যে গুণগত তেমন কোনও পার্থক্য নেই। দুটিই কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য। আর দুটোর ক্যালোরিমূল্যও মোটামুটি সমান। রুটির সুবিধা হলো এতে ডায়েটারি ফাইবার ভাতের তুলনায় বেশি থাকে। রুটি দুবেলা হলে ভালো। রুটি খেতে কষ্ট হলে দুবেলা ভাত কিংবা একবেলা ভাত, একবেলা রুটি খাওয়া যাবে। খেয়াল রাখতে হবে ভাতের পরিমাণ যেন প্রাপ্য কার্বোহাইড্রেটের মাত্রার চেয়ে বেশি না হয়। মনে রাখা উচিত, ভাত বেশি খেলে রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া রান্নার সময় ভাতের মাড় ফেলে দিলে ভাতের পুষ্টিমাণ অনেক কমে যায়।

ডায়াবেটিসে কি ডিম খাওয়া যায়

হ্যাঁ। কুসুম বাদ দিয়ে ডিমের সাদা অংশ খেতে পারেন। রক্তে কোলেস্টেরল স্বাভাবিক মাত্রায় থাকলে সপ্তাহে ২-১ দিন কুসুমসহ ডিম খাওয়া যায়। কুসুমে কোলেস্টেরল থাকে খুব বেশি আর দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণও বেশি থাকার সম্ভাবনা থাকে- যদিও প্রায়ই তাদের ব্লাড সুগার অনিয়ন্ত্রিত থাকে। ডিম খেলে সেদ্ধ করে খাওয়া উচিত, ভেজে বা ওমলেট বানিয়ে নয়। এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে, যারা নিরামিষ খান, তাদের ডিমের বিকল্প হলো দুধ, দই এবং ডাল।

ডায়াবেটিসে চা-কফি কিংবা পেপসি-কোক কি খেতে বাধা আছে

চা-কফিতে বাধা নেই। তবে দিনে দু-তিন কাপের অধিক নয়। দুধও মেশানে যেতে পারে। পেপসি, কোকাকোলা ইত্যাদি পানীয়তে মিষ্টি থাকায় ডায়াবেটিস রোগীদের এগুলো পান করা নিরাপদ নয়।

একজন ডায়াবেটিস রোগী প্রতিদিন কতটুকু তেল খেতে পারেন

৪ থেকে ৬ চামচ (২০ থেকে ৩০ মিলিলিটার)। যত কম ভোজ্যতেলের রান্নাকৃত খাবার খাওয়া যাবে তত শরীরের জন্য ভালো। কারণ তেলে থাকে প্রচুর পরিমাণ ক্যালরি (১ গ্রাম তেলে ৯ কিলোক্যালরি) যা বেশি খেলে মুটিয়ে যেতে পারে শরীর, হতে পারে উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগসহ নানা অসুখ। ডায়াবেটিস রোগীরা খেতে পারেন সরষে বা রেপসিডের তেল।

ইনসুলিন ব্যবহারে যা জানা প্রয়োজন ঃ

ইনসুলিন ব্যবহারকারীদের কোন কোন বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা নেয়া উচিত

যারা ইনসুলিন নেন তাদের ৫টি বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকতে হয়। যেমন প্রথমত, ইনসুলিন সংরক্ষণ সঠিকভাবে করতে হবে। তা না হলে এর কর্মক্ষমতা কমে যাবে। সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজ উত্তম। তবে ডিপ ফ্রিজে কোনোভাবেই ইনসুলিন রাখা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, ইনসুলিন বোতল বা পেন ব্যবহারের সময় জোরে ঝাঁকুনি দেয়া যাবে না। বরং দুই হাতের তালুতে নিয়ে কয়েকবার ঘুরিয়ে নিতে হবে, বিশেষ করে প্রিমিক্সড ইনসুলিন কিংবা প্রিমিক্সড এনালগের ক্ষেত্রে।
তৃতীয়ত, ইনসুলিন সিরিঞ্জ ব্যবহারের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, এটা ৪০ আইইউ না ১০০ আইইউ পরিমাপের। কারণ ইনসুলিন বোতল ও সিরিঞ্জ অবশ্যই একই পরিমাপের হতে হবে।
চতুর্থত, হাইপোগ্লাইসেমিয়ার উপসর্গ ও করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে। চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার হাতের কাছে রাখতে হবে। পঞ্চমত, কখনও বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া, জ্বর হলে ওই দিনও ইনসুলিন নিতে হবে।

ইনজেকশন দেয়ার আগে ও পরে স্পিরিট ব্যবহার কি করতেই হবে

না, তেমন বাধ্যবাধকতা নেই।
ইনসুলিন কোথায় রাখতে হবে

বেশ কিছু স্থানে আমরা ইনসুলিন রাখতে পারি। যেমন- ফ্রিজে ২-৮০ সেলসিয়াস বা ৩৬-৩৮০ ফারেনহাইট তাপমাত্রায়। ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায়- প্রায় দেড় মাস পর্যন্ত রাখা যেতে পারে। হাতব্যাগে- গাড়ি, ট্রেন বা বিমানে ভ্রমণের সময়।

ইনসুলিন কোথায় রাখা যাবে না

বেশ কিছু স্থানে আমাদের ইনসুলিন রাখা উচিত নয়।
যেমন-ফ্রিজের ফ্রিজারে (যেখানে বরফ জমে)।
রোদ বা অধিক গরম আবহাওয়ায়।
রান্নার ওভেন, জ্বলন্ত স্টোভ বা চুলার কাছে।
স্যুটকেস বা ব্রিফকেসে।

কখন ইনসুলিন ব্যবহার করতে হয়

ডায়াবেটিস চিকিৎসার ৩টি মূলমন্ত্র সঠিকভাবে মেনে চললে টাইপ টু ডায়াবেটিসে ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে; কিন্তু টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসে ইনসুলিনই হচ্ছে একমাত্র চিকিৎসা। কারণ এসব রোগীর অগ্নাশয় থেকে ইনসুলিন তৈরিই হয় না। ফলে বাইরে থেকে ইনসুলিন প্রয়োগ করে অগ্নাশয়ের ইনসুলিন শরীরে যেসব কাজ করত তা সম্পন্ন করানো হয়। এছড়া শরীরের বিশেষ কিছু অবস্থায় সাময়িকভাবে ইনসুলিন দিয়ে চিকিৎসা করা জরুরি হয়ে পড়ে। যেমন- গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে।

ডায়াবেটিস রোগী হঠাৎ কোনও কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে গেলে। যেমন হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, লিভার বা কিডনি সমস্যা ইত্যাদি হলে। ডায়াবেটিস রোগীকে কোনও অপারেশনের প্রয়োজন হলে। ব্লাড সুগার অত্যধিক হওয়ার ফলে অজ্ঞান হয়ে পড়লে।

ব্লাড সুগার স্বাভাবিকের চেয়ে অধিক হলে ইনসুলিন দিয়ে চিকিৎসা শুরু করা ভালো। এতে অগ্নাশয়ের বেটা কোষগুলো দীর্ঘদিন সুস্থ থাকে। ফলে যেখানে ৮-১০ বছর পর আপনার ইনসুলিন লাগত তখন হয়তো আরও কয়েক বছর পর আপনার ইনসুলিন লাগবে। এর কারণ হল রক্তের গ্লুকোজ অধিক থাকলে প্রথম দিকে ইনসুলিন দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে- অসুস্থ অগ্নাশয়কে বিশ্রাম দেয়া। কারণ রক্তের গ্লুকোজ অধিক থাকার অর্থ হল শরীরের অগ্নাশয় অসুস্থ। আর মুখে খাওয়ার ওষুধগুলো নিজেরা ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না বরং তারা অসুস্থ অগ্নাশয় থেকে চুইয়ে চুইয়ে ইনসুলিন বের করে। ফলে এ সময় ট্যাবলেট খেলে অগ্নাশয় আরও অসুস্থ হয়। অর্থাৎ অসুস্থ ঘোড়াকে চাবুক মেরে মেরে দৌড়াতে বাধ্য করলে ঘোড়ার এক সময় যা পরিণতি হয়, খাবার ট্যাবলেটও এক্ষেত্রে অগ্নাশয়ের প্রতি চাবুকের ভূমিকা পালন করে থাকে।

ডায়াবেটিসজনিত শারীরিক অক্ষমতা প্রতিরোধে পরামর্শ

ডায়াবেটিস রোগীর মাংসপেশির কর্মক্ষমতা আস্তে আস্তে কমে আসে, পাশাপাশি ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথি হলে হাত ও পায়ের মাংশপেশি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগী হাঁটাহাঁটি ও হাতের কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। শরীরের প্রায় প্রতিটি হাড় ও জোড়া আক্রান্ত হয়। জোড়ার ভেতর বিভিন্ন ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অকেজো হয়ে পড়ে। এতে জোড়ায় ব্যথা হবে, ফুলে যাবে, হাঁটা-চলাফেরা, কাজকর্মে ব্যথা তীব্র থেকে তিব্রতর হয়। রোগী নামাজ, গোসল, জামাকাপড় পরিধান করতে, টয়লেট ব্যবহার করতে দৈনন্দিন কাজকর্মে মারাত্মক অসুবিধার সম্মুখীন হয়। অনেক সময় মাংসপেশির অসাড়তা, হাড় ও জোড়ার ক্ষতি হওয়ার ফলে রোগী পড়ে গিয়ে হাড় ও জোড়া ভেঙে যায়। দীর্ঘদিন রোগ ভোগের কারণে রোগী একপর্যায়ে পঙ্গুত্ববরণ করে বা জীবনাশংক ঘটে।

তাই ডায়াবেটিসের কারণে শরীরের বিভিন্ন অসাড়তা, হাড় ও জোড়ার ব্যথায় ব্যথানাশক ওষুধ মোটেও খাওয়া উচিত নয়। এতে করে হূদরোগ, স্ট্রোক ও স্ট্রোকজনিত প্যারালাইসিস কিডনি অকেজো হওয়া, গ্যাস্ট্রিক, আলসার ইত্যাদি মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াবিহীন অত্যন্ত আধুনিক চিকিৎসা। রোগী একজন বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা নিলে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠবেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীর শারীরিক অক্ষমতায় পরিমাণ নির্ণয় করে বিভিন্ন থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ, ইলেকট্রো মেগনেটিক রেডিয়েশন, ম্যানুয়েল ও ম্যাকানিক্যাল থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা দিলে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ থাকবে। সে ক্ষেত্রে যেখানে সেখানে ফিজিওথেরাপি নেয়া উচিত নয়। এতে রোগীর সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে। দেখেশুনে সঠিক ফিজিওথেরাপি সেন্টারে চিকিৎসা নিলে অবশ্যই রোগী সুস্থ থাকবে।

# ডা. মোঃ সফিউল্যাহ্‌ প্রধান
ডিপিআরসি হাসপাতাল, ২৯ প্রবাল হাউজিং, রিং রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

Advertisements
Loading...