দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো দেশের স্বাস্থ্যঝুঁকি আর কেবল সেই দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষ প্রতিদিন এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করছে, পণ্য ও খাদ্যসামগ্রী আন্তর্জাতিকভাবে পরিবাহিত হচ্ছে।

যে কারণে একটি দেশে নতুন কোনো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে তা অল্প সময়ের মধ্যেই অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা প্রতিটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে International Health Regulations (IHR) আন্তর্জাতিকভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো। এটি দেশগুলোর স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত, মূল্যায়ন, তথ্য জানানোর ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব নির্ধারণ করে। বর্তমানে ১৯৬টি দেশ IHR-এর আওতাভুক্ত।
রোগ দ্রুত শনাক্ত এবং নিয়ন্ত্রণ
কোনো দেশে অজানা বা সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে দ্রুত শনাক্ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। WHO-এর নির্দেশনায় রোগ নজরদারি, পরীক্ষাগার সক্ষমতা, তথ্য সংগ্রহ ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একটি দেশ যদি দ্রুত রোগ শনাক্ত করতে পারে, তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়া সম্ভব হয়।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ায়
একটি মহামারি মোকাবিলায় কোনো দেশ একা সফল হতে পারে না। রোগের তথ্য, গবেষণা, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং ঝুঁকির পূর্বাভাস দ্রুত বিনিময় করা প্রয়োজন। WHO দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যে কারণে কোনো দেশে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিলে অন্য দেশগুলোও আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে পারে।
মহামারির ক্ষতি কমাতে সহায়ক
কোভিড-১৯ বিশ্বকে দেখিয়েছে, একটি সংক্রামক রোগ কীভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং সামাজিক জীবনকে বিপর্যস্ত করতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে WHO ২০২৬ সালে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর জন্য স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা মোকাবিলার সক্ষমতা জোরদারে নতুন কাঠামো প্রকাশ করেছে। এতে প্রস্তুতি, দ্রুত শনাক্তকরণ, সমন্বয় এবং জরুরি প্রতিক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ মোকাবিলা
বর্তমান বিশ্বের আরেকটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)। ওষুধের অপব্যবহার এবং অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে জীবাণু ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে।
WHO-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া প্রতি ছয়টি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রায় একটির ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ দেখা গেছে। তাই দেশগুলোর জন্য সঠিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, নজরদারি এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা জরুরি।
শুধু নির্দেশনা নয়, দায়িত্বও
WHO-এর নির্দেশনা অনুসরণ মানে অন্ধভাবে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা নয়; বরং বৈজ্ঞানিক তথ্য, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি এবং নিজ দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। IHR অনুযায়ী, দেশগুলোর নিজস্ব স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত, মূল্যায়ন এবং মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি সম্পর্কে WHO-কে অবহিত করার দায়িত্ব রয়েছে।
একটি দেশের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা এখন আর শুধু জাতীয় বিষয় নয়- এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তারও অংশ। WHO-এর বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করলে রোগের বিস্তার দ্রুত শনাক্ত করা, মহামারি প্রতিরোধ, জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ ও মানুষের জীবন রক্ষা করা সহজ হয়। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রতিটি দেশের জন্য শুধু দায়িত্ব নয়, বরং নিজেদের জনগণ এবং বিশ্বের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।
>>>>>>>>>>>>>>
ডেঙ্গু প্রতিরোধ করবেন যেভাবে
মশা বাহিত একপ্রকার ভাইরাস জ্বর হলো ডেঙ্গু। এই জ্বর অন্যান্য ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়াজনিত জ্বর থেকে ভিন্ন। অবশ্য এই জ্বর কোনোভাবেই ছোঁয়াচে নয়। এই ভাইরাস জ্বর এককভাবে বা অন্যান্য ভাইরাস (চিকুনগুনিয়া, ইয়েলো ফিভার, বার্মা ফরেস্ট, ফ্লু, রেসপাইরেটরি সিনসাইটিয়াল) এবং ব্যাকটেরিয়া (নিউমোক্কাস)-এর সঙ্গেও হতে পারে।
লক্ষণ ও জ্বরের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গুজ্বরকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে-
১. সাধারণ ডেঙ্গুজ্বর।
২. রক্তপাতসহ ডেঙ্গুজ্বর।
সাধারণ ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রে চোখে পড়ে মূলত নিচের এই লক্ষণগুলো-
১. হঠাৎ করে তীব্র জ্বর ও তা ২ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হওয়া।
২. তীব্র মাথাব্যথা হওয়া।
৩. চোখের পেছনের অংশে ব্যথা হওয়া।
৪. জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি চোখে পড়া।
৫. সম্পূর্ণ শরীরে তীব্র ব্যথা ও সেইসঙ্গে কোমরে ব্যথা।
৬. বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
৭. ত্বকে র্যাশ বা লাল দানা দানা দেখা দেওয়া।
রক্তপাতসহ ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রে :
১. ২ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তীব্র জ্বর সঙ্গে নাক, মুখ বা বমির সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
২. জ্বরের পাশাপাশি বুকে বা পেটে পানি জমে যাওয়া।
এইসব লক্ষণের যে কোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
অপরদিকে
জ্বরের প্রথম ৩ দিন বাড়িতে অপেক্ষা করুন। অপরদিকে সারা শরীর পানি দিয়ে স্পঞ্জ করুন কিছুক্ষণ পরপর। এতে করে জ্বরের মাত্রা কমে আসবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান ও বিশ্রাম নিতে হবে। এরপরেও জ্বর না কমলে বা কিছু সময় পরপর বাড়তে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় বিষয়:
১. বাড়ির আশপাশ যতোটা সম্ভব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে চেষ্টা করুন।
২. ঘরের ভেতরে থাকা ফুলের টব বা ভাঙা প্লাস্টিকের বোতল, ডাবের খোসা, টায়ার অথবা পলিথিন থাকলে তা দ্রুত পরিষ্কার করে ফেলুন ও ফুলের টব থেকে জমে থাকা পানি নিষ্কাশন করুন।
৩. মশা নিধনের জন্য সপ্তাহে অন্তত ৩ বার স্প্রে বা ফগিং করুন।
৪. বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময় মশা নিধনে ব্যবহৃত ক্রিম সঙ্গে রাখতে পারেন।
৫. সন্ধ্যার পর বাড়ির ছোট থেকে বড় সদস্যরা মশারি ব্যবহার করুন।
৬. যেখানে-সেখানে জমে থাকা বৃষ্টির পানি পরিষ্কার করে ফেলুন, কারণ এতে এডিস মশা ডিম পেড়ে থাকে এই সময়।
৭. অপরদিকে মশার প্রকোপ থেকে বাঁচতে মশারির সঙ্গে সঙ্গে ম্যাট ব্যবহার করতে পারেন।
৮. এডিস মশা যেহেতু দিনের বেলা কামড়ায় তাই দিনের বেলায় ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি টানিয়ে ঘুমানোর দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সূত্র: https://dmpnews.org