কয়েকটি ব্যতিক্রমি ঘটনা: লুশান পাহাড়, নীল হ্রদসহ আশ্চর্য স্থান

দি ঢাকা টাইমস ডেস্ক ॥ প্রতি সপ্তাহের মতো আজও আমরা বিশ্বের বিভিন্ন মজার মজার খবর আপনাদের সামনে তুলে ধরবো কয়েকটি ব্যতিক্রমি ঘটনা। লুশান পাহাড়, নীল হ্রদসহ আশ্চর্য স্থান।

পাহাড়ের নাম লুশান

চীনের চিয়াংসি প্রদেশের উত্তরাংশের চিউ চিয়াং শহরে লুশান পাহাড় অবস্থিত। এ পাহাড়ের আয়তন ৩০২ বর্গকিলোমিটার। এর প্রধান পর্বত হান ইয়াং। যার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪৭৪ মিটার। বিশাল পাহাড়, উচু জলপ্রপাত, সবুজ গাছ আর মেঘ-সাগর মিলে লুশানের অতি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য গড়ে উঠেছে। লুশানের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। গ্রীষ্মকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে থাকে। আরামদায়ক আবহাওয়া, সতেজ জলবায়ু ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের কারণে লুশান সকলের পছন্দের দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। এখানকার বসন্তকাল স্বপ্নের মতো এবং গ্রীষ্মকাল সবুজ পাতার মতো। গ্রীষ্মকালের লুশান সবচেয়ে আরামদায়ক। শীতকালের লুশান সবচেয়ে সুন্দর। তুষারের উপর দিয়ে হাঁটা যেন তুলোর ওপর দিয়ে হাঁটার মতো মনে হয়। শীতকালে পাহাড়ের ওপরে গাছগুলোতে যে বরফ থাকে তা দেখতে খুব সুন্দর লাগে। লুশানের ভৌগোলিক অবস্থান মিশরের পিরামিড, রহস্যময় বারমুডা দ্বীপপুঞ্জ আর বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত চুমুলাংমা শৃঙ্গের সাথে উত্তর অক্ষাংশের ৩০ ডিগ্রি বরাবর অবস্থিত। বিস্ময়কর প্রাকৃতিক দৃশ্য হিসেবে ২০০৪ সালে লুশান ‘বিশ্বের ভৌগোলিক পার্ক’ হিসেবে মনোনীত হয়। লুশানের উত্তর দিকে রয়েছে চীনের সবচেয়ে দীর্ঘ নদী ছাংচিয়াং নদী এবং পূর্ব দিকে চীনের সবচেয়ে বড় হ্রদ বোইয়াং হ্রদ। ফলে প্রাচীনকাল থেকে এক পাহাড় দিয়ে দুটি নদীকে ভাগ করার কিংবদন্তি রয়েছে। হানপোখো দর্শনীয় স্থানে দাঁড়িয়ে দূর থেকে বোইয়াং হ্রদকে দেখা যায়।

লুশানের আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য আর ছাংচিয়াং নদী ও পোইয়াং হ্রদ এ দুটি জলপথে সুবিধাজনক পরিবহন ব্যবস্থা থাকার কারণে প্রাচীনকাল থেকে লুশান বহু কবি ও লেখক আসতে আকর্ষণ করে আসছে। গত এক হাজার বছরে প্রায় দেড় হাজার লেখক ও সাহিত্যিক লুশানে এসে ১৬ হাজারটিরও বেশি কবিতা ও পাথর ভাস্কর্য সৃষ্টি করেছেন। বলা যায় চীনা জাতির মানসিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে প্রাচীনকাল থেকে লুশান পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৯৬ সালে ইউনেস্কো লুশানকে ‘বিশ্বের সাংস্কৃতিক দর্শনীয় স্থান’ হিসেবে ‘বিশ্ব উত্তরাধিকার তালিকায়’ অন্তর্ভূক্ত করেছে। ১৯ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের মিশনারিরা লুশানে গির্জা নির্মাণ করে সেখান থেকেই ধর্ম প্রচার করেছেন।

তখন থেকে লুশান বিদেশীদের মধ্যে সুপরিচিত হয়ে ওঠে। সে সময় বিভিন্ন দেশের লোকেরা লুশানে নানা শৈলীর স্থাপত্য নির্মাণ করতে শুরু করেন। এটাকে বলা হয় ‘হাজার রাষ্ট্রের স্থাপত্য জাদুঘর’। ১৯৭৮ সালে দু’জন তরুণ-তরুণী লুশানে মিলিত হয়ে প্রেমে পড়ার কাহিনী নিয়ে নির্মিত হয় ‘লুশান প্রেম’ নামের চলচ্চিত্র। এরপর পর থেকে এটি রোমান্টিক পাহাড় হিসেবেও পরিচিতি লাভ করে। গত ৩০ বছরে লুশানের সিনেমা হলে প্রতিদিন এ চলচ্চিত্রটি দেখানো হয়। এ কারণে একই সিনেমা হলে সবচেয়ে বেশি দেখানো সিনেমা হিসেবে এ চলচ্চিত্রটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

নীল হ্রদ : বান্দ-এ আমীর

আকাশের রঙে পানির রঙ নীল হয়। কিন্তু আফগানিস্থানের বামইয়ান (Bamyan) শহরে অবস্থিত ৬টি হ্রদের পানি এতটাই গাঢ় নীল, যেন পানিতে নীল মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। বামইয়ান শহরটি একসময় বেশি পরিচিত ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মূর্তির কারণে, যা ২০০১ সালে তালেবান সরকার কর্তৃক ধ্বংস করে দেয়া হয়। তবে বামইয়ান শহরটি এখনও এ নীল হ্রদগুলোর জন্য সুপরিচিত হয়ে আছে। হ্রদগুলো বাহিমিয়ান শহর হকে ৭৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ইকাওলাং শহরের কাছাকাছি হিন্দুকুশ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত। ৬টি হ্রদকে একসঙ্গে বান্দ-এ আমীর (Band-e Amir) বলা হয়। তবে এদের ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। যথা : বান্দ-এ গোলামান, বান্দ-এ কাম্বার, বান্দ-এ হাইবাত, বান্দ-এ পনির, বান্দ-এ পুদিনা, বান্দ-এ যুলফাকার। এদের মধ্যে বান্দ-এ হাইবাত সবচেয়ে বেশি গভীর, ১৫০ মিটারের মতো। সীমাহীন মরুভূমি ও পাথুরে পর্বতময় দেশের মাঝে হঠাৎ এ সুন্দর নীল হ্রদগুলো যে কাউকে অবাক করে দেবে। হ্রদগুলোর চারদিকের পাহাড়গুলোর চূড়া চুনাপাথরের, যা গোলাপি রঙের। এর চারপাশের গোলাপি পাহাড় ও বান্দ-এ আমীরের গাঢ় নীল রঙ মরুভূমির প্রকৃতিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রার সৌন্দর্য, যা দর্শককে বিমোহিত করে। বান্দ-এ আমীর তথা হ্রদ ৬টির পানি এতটা নীল হওয়ার কারণ এতে রয়েছে অত্যধিক মাত্রায় কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং ক্যালসিয়াম কার্বনেট। শুষ্ক মৌসুমে আশপাশের পর্বত থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশ্রিত পানি এসব হ্রদে বিদ্যমান চুনাপাথরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম কার্বনেট তৈরি করে, যার ফলে এ হ্রদের পানি অত্যাধিক নীল বর্ণ ধারণ করে। বান্দ-এ আমীর ২৩০ বর্গমাইলব্যাপী বিস্তৃত। আফগান সরকার বান্দ-এ আমীরকে ১৯৬০ সালে তাদের উদ্যান করে নিলেও ২০০৮ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করেনি। পরে ২০০৯ সালে সরকার প্রথম এটিকে তাদের জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে এবং এটিই আফগানিস্তানের প্রথম ও একমাত্র জাতীয় উদ্যান। একই বছরে বান্দ-এ আমীর টঘঊঝঈঙ-এর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ফুল থেকে আইসক্রিম

আইসক্রিম সবার কাছেই বেশ প্রিয়। বিশেষ করে ছোট ছেলেমেয়েরা আইসক্রিম পেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। গ্রীষ্মকালে প্রায় সব দেশেই আইসক্রিমের চাহিদা ব্যাপক বেড়ে যায়। তবে দুধে অ্যালার্জিজনিত কারণে অনেকেই এর স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন না। এই লোভনীয় খাদ্যটি থেকে যাতে কেউ বঞ্চিত না হয় সেজন্য চলছে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। গবেষকরা এবার লিউপিন নামক ফুল থেকে আইসক্রিম তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। জার্মানির ফ্রাউয়েনহোফার ইন্সটিটিউটের গবেষকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বের করেছেন, লিউপিন থেকে বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে এক ধরনের প্রোটিন বের করা যায়। আর এই প্রোটিন ল্যাকটোস, গ্লুটেন ও কোলেস্টেরল মু্‌ক্ত। এই দিকটিতে দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় আইসক্রিম প্রেমীদেরও। আর তাই গড়ে তোলা হয় ছোট এক আইসক্রিম প্রস্তুত কারখানা। সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী এই আইসক্রিম কারখানাটির নাম ‘প্রোলিউপিন’ এই কারখানার উৎপাদনের দায়িত্বে রয়েছেন গেয়ারহার্ড ক্লোট। গেয়ারহার্ড ক্লোট দুধের প্রোটিন ও শর্করার বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করতে থাকেন এবং বিকল্প হিসেবে নজরে পড়ে সয়াবিন। কিন্তু এটি অধিকাংশ মানুষের প্রিয় না হওয়ায় তারা বিকল্প রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করে। বছর খানেক আগে লিউপিন থেকে তৈরি প্রথম আইসক্রিম বাজারে আসে। সম্পূর্ণভাবে উদ্ভিদ থেকে তৈরি, ল্যাকটোস ও কোলেস্টেরোলমুক্ত এই আসক্রিম। এতে শর্করা ও তেলের ভাগও কম। ভোক্তারা এই আইসক্রিম সাদরে গ্রহণ করেছেন। কারণ যারা দুধের ল্যাকটোস হজম করতে পারেন না তারা সহজেই এটি গ্রহন করেন। তাছাড়া স্বাদ ও গন্ধে এই আইসক্রিম অবিকল দুধের আইসক্রিমের মতোই। এই লিউপিন ফুল এবং বীজ প্রাচীনকালেও ব্যবহূত হতো খাদ্য হিসাবে। দক্ষিণ অ্যামেরিকার ইনকা সভ্যতাতেও লিউপিনের বীজ রোদে শুকিয়ে খাওয়া হতো। রোমানরা সার হিসাবে ব্যবহার করত এই উদ্ভিদকে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে লিউপিনের বীজ দিয়ে স্ন্যাকস তৈরি করা হয় এখনও। জার্মানিতে এই উদ্ভিদটিকে এতদিন বিশেষ করে পশুখাদ্য হিসাবে কাজে লাগানো হতো। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে মানুষের খাদ্য হিসাবেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিউপিন।

গুয়েতেমালার গর্ত

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ গুয়েতেমালা যার রাজধানী গুয়েতেমালা সিটি। আর দেশটির রাজধানীতেই রয়েছে বিশাল দুটি গর্ত। একটি গর্ত ৩৩০ ফুট গভীর। ২০০৭ সালে হঠাৎ করেই কয়েকটি বিল্ডিং নিয়ে শহরের একটি আবাসিক এলাকার একটি অংশ ধসে পড়ে। ভূ-তাত্ত্বিকদের মতে গুয়েতেমালা সিটির নিচ দিয়ে বয়ে গেছে একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি যার নাম পাকায়া (Pacaya)। এ দুঘর্টনায় তিন জনের বেশি লোক মারা যায়নি। এখনও আগ্নেয়গিরির কারণে সৃষ্ট এ বিশাল গর্তটির পাশে শহরের জীবনযাত্রা চলছে। তবে ২০১০ সালের ২৯ মে সৃষ্টি হয় ১৮ মিটার (৬০ ফুট) ব্যাসের আরেকটি গর্তের। এর গভীরতা ২০০ ফুট বা ৬০ মিটার। তবে এটি পাকায়া আগ্নেয়গিরির জন্য নয়, এর সৃষ্টির জন্য কারণ ২০১০ সালে সৃষ্ট সমুদ্র ঝড় হ্যারিকেন আগাথার (Agatha) জন্য গর্তটি সৃষ্টি হয়েছে। আগের গর্তটি থেকে ২ কিলোমিটার দূরে। এ হ্যারিকেনের কারণে গুয়েতেমালা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল এল সালভাদরে ৩ মিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত ঘটেছিল। তাই মাটি নরম হয়ে তিনতলা বিল্ডিংসহ জায়গাটি ধসে যায়। যদিও এ দুঘর্টনায় কেউ মারা যায়নি তবে হ্যারিকেন ঝড়ে সরকারি হিসাব মতে ১২৩ জন মারা গিয়েছিল এবং ৫৯ জন নিখোঁজ ছিল। বিশাল এ গর্ত দুটি গুয়েতেমালা দেশের দুটি ভয়ংকর সময়ের ইতিহাস বহন করে চলছে।

টেবল মাউন্টেন

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের এক রহস্যময় পর্বত, যার নাম টেবল মাউন্টেন। এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০৮৬ মিটার বা ৩৫৬৩ ফুট। কেপটাউনের সুউচ্চ পর্বতগুলোর মাঝে এটি অন্যতম। এর সর্বোচ্চ চূড়া দুটি। একটির নাম ডেভিল পার্ক ও অপরটির নাম সিংহের মাথা। এ চূড়া দুটি প্রায়ই মেঘে ঢেকে যায়। পর্বতটি মেঘে ঢেকে যায় বলে স্থানীয়রা এ মেঘকে ‘পাহাড়ের জামা’ বলে। পর্বতটি মেঘের জামা পরলেও মাঝে মধ্যে সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ে পর্বতটির গায়ে, যা পর্বতটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। টেবল মাউন্টেন কেপটাউনে খুবই জনপ্রিয়। এ পর্বত নিয়ে স্থানীয়ভাবে ঐতিহাসিক রূপকথা রয়েছে। তা হল যে কয়টি পর্বত নিয়ে এটি গঠিত তার প্রত্যেকটি থেকে আগুনের ফুলকির মতো বের হয়। যদি কেউ সেটা দেখতে যায় তাহলে কাছে গিয়ে সে আর দেখতে পায় না। জনশ্রুতি রয়েছে, মানুষের পায়ের আওয়াজ পেলে এ আগুনের ফুলকি বন্ধ হয়ে যায়। পর্বত মাউন্টেনকে নিয়ে এ গল্প সত্য বা মিথ্যা যা-ই হোক এটি সারা বিশ্বে সুপরিচিত একটি পর্বত। এটি গেট ওয়ে অব সাউথ আফ্রিকা নামে পরিচিত। সম্প্রতি পর্বতটি প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।

Advertisements
Loading...