অভিভাবকরা শঙ্কিত ॥ ভর্তি নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হবে শিক্ষার্থীদের

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ এইচএসসি শিক্ষার্থীরা এবার ভালো ফলাফল করেছে। তাতে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক সবাই খুশি। কিন্তু সেই খুশি কয়দিন স্থায়ী হয় তা দেখার বিষয়। কারণ শুধু ভালো ফলাফল করলেই হবে না, ভালো ভার্সিটিতে ভর্তির বিষয়টিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান যা অবস্থা তাতে অনেক অভিভাবকরা শঙ্কিত।

এ বছর এইচএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তির ক্ষেত্রে এবারও অপেক্ষা করছে মহাভোগান্তি। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝক্কিতে পড়বে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা। প্রথমসারির বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ধরনের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসন অপ্রতুলতার বিপরীতে ভালো মানের ফলাফলকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই মূলত এই অবস্থার সৃষ্টি হবে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য এই সংকট অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হতো ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিন্ন ভর্তি’র ব্যবস্থা করতে পারলে। কিন্তু কয়েক বছর যাবত চেষ্টা শেষে সরকার শেষ পর্যন্ত হাতগুটিয়ে ফেলেছে।

জানা গেছে সরকারি হিসাব মতে, বর্তমানে দেশে বিভিন্ন ধরনের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসন রয়েছে প্রায় ৮ লাখ। আর এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় বিভিন্ন গ্রেডে মোট পাস করেছে ৭ লাখ ২১ হাজার ৯৭৯ জন। উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর অনেক ক্ষেত্রে মাদ্রাসার আলিম উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাও বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তির জন্য ভিড় করে। এবার মাদ্রাসা থেকে প্রায় ৭৭ হাজার ৩১৬ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। সে হিসাবে আসন সংকট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, কিছু নামসর্বস্ব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের অনীহার কারণে এই সমস্যাকে প্রকট আকার ধারণ করাবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এ অবস্থায় নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যথারীতি ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়বে। আর অনেক প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার্থীর অভাবে কাটাতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও একই কথা বলেছেন। ফলাফলের দিন সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভর্তিতে কোন সংকট হবে না। পর্যাপ্ত আসন রয়েছে। তবে এটা ঠিক যে, শিক্ষার মানের উন্নয়ন ও পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে ভালো মানের প্রতিষ্ঠান বাড়ানো সম্ভব হয়নি। তাই বলা যায়, ভর্তি সংকট নয়, বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে চাপ বেশি থাকবে। তিনি বলেন, সমগোত্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছভিত্তিক ভর্তির একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সেটা আংশিক সফল হওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসনে চলে। তাই এক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্তকে আমাদের স্বাগত জানাতে হয়। তিনি আরও বলেন, ভর্তির ক্ষেত্রে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের পদ্ধতিকেই ভালো বলতে চায়।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, স্বায়ত্তশাসনের জোরে সবকিছু লাগামহীন চলতে পারে কিনা। সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর অনুসরণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একটি ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের দাবি দীর্ঘদিনের। এক্ষেত্রে সমগোত্রীয় যেমন কৃষি, প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছভিত্তিক পরীক্ষা নেয়ার একটি চিন্তাভাবনাও ছিল সরকারের। সে অনুযায়ী প্রায় তিন বছরব্যাপী দেন-দরবারও হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত স্বায়ত্তশাসনের ধুয়া তুলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজি হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সব মেডিকেলের একইদিন অভিন্ন প্রবেশপত্রে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কারণে শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বারবার পরীক্ষা দেয়া, অর্থ ব্যয় করে ফরম কেনা, অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের কলেজে কলেজে দৌড়ানোসহ বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তি ও ঝক্কি হ্রাস পেয়েছে। ওই ধারণার আলোকেই অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষার চিন্তাভাবনা করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অডিট শাখার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেসব অডিট আপত্তি রয়েছে, তারবেশির ভাগই ভর্তি ফরম বিক্রি থেকে লব্ধ আয়ের অস্বচ্ছ ব্যয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোটি কোটি টাকা আয় করে থাকে এই খাতে। আসলে ওই টাকার লোভের পাশাপাশি ভর্তি নিয়ে নানা তেলেসমাতি ও কর্তৃত্ব রয়েছে। সেগুলো হাতছাড়া হওয়ার আশংকায়ই অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে নয় তারা।

ইউজিসির অর্থ দফতর সূত্রে জানা গেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি ফরম বিক্রি বাবদ যে কোটি কোটি টাকা আয় হয়, তা ডিউটি আর পরীক্ষার ব্যয় নির্বাহের নামে প্রকারান্তরে লুটপাট হয়। এক ঘণ্টার ডিউটি করে অনেকে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। এর বাইরে আবেদনপত্র নিরীক্ষা, খাতা দেখাসহ নানা ছলছুতোয় পয়সা নেয়ার রেকর্ড তো রয়েছে। কিন্তু কতিপয় ব্যক্তির সুবিধা জিইয়ে রাখতে গিয়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থী-অভিভাবকের অসহনীয় ভোগান্তি চলছে। তাদের এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটতে হয়। একবার ফরম কিনতে যেতে হয়। আরেকবার পরীক্ষার জন্য। আবার জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক ফরম বিতরণ করা হয়। সেখানে অর্থের দণ্ডির বাইরে বার বার পরীক্ষা দিতে হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসবই পয়সা হাতিয়ে নেয়ার এক একটা কৌশল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের প্রশ্ন, সরকার কি তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে জিম্মি। স্বায়ত্তশাসন আর আইন কি দেশের জনগণের স্বার্থে নয়। পটুয়াখালীর দুমকির জনতা কলেজ থেকে এবার এইচএসসি উত্তীর্ণ এক শিক্ষর্থী জানান, ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য ভোগান্তি আর ব্যয়ের চিন্তায় তার ঘুম আসছে না। আরেক অভিভাবক বিউটি বেগম বলেন, টেলিভিশনে দেখলাম শিক্ষামন্ত্রী স্বায়ত্বশাসনের দোহাই দিয়ে জনগণের ভোগান্তি হ্রাসের বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন। তাহলে ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থ বরাদ্দ দেয়াও বন্ধ করে দেয়া হোক।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মোট আসনের মধ্যে প্রায় ৪ লাখই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রয়েছে। এই ৪ লাখের মধ্যে প্রায় ২ লাখ পাস কোর্স এবং ১ লাখ ৭৬ হাজার অনার্সের। ২০০৮ সালের ডিগ্রি পরীক্ষায় প্রথম বর্ষে মাত্র ৯০ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়। অর্থাৎ পাস কোর্সে গড়ে প্রতিবছর কমপক্ষে ১ লাখ আসন খালি থাকে। মূলত দীর্ঘ সেশন জট, দু’বছরের পরিবর্তে ৩ বছরের কোর্স এবং লেখাপড়ার নিম্নমানের কারণে এই পাসকোর্স এখন আর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আকর্ষণ করতে পারছে না।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, অনার্স ও ডিগ্রি কলেজ, বুয়েট, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮ লাখ আসন রয়েছে। আর এবার কেবল এইচএসসিতে সর্বমোট উত্তীর্ণ হয়েছে ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৯৪০ জন। উত্তীর্ণদের মধ্যে জিপিএ-৫ বা সব বিষয়ে ৮০ থেকে ১০০ নম্বর পেয়েছে ৫১ হাজার ৪৬৯ জন। এছাড়া জিপিএ-৪ থেকে ৫-এর মধ্যে পেয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৪ জন, জিপিএ-৩ দশমিক ৫ থেকে ৪-এর মধ্যে পেয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৩৩১ জন, জিপিএ-৩ থেকে ৩ দশমিক ৫-এর মধ্যে পেয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ১১২ জন, জিপিএ-২ থেকে ৩-এর মধ্যে পেয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৪১৯ জন। বাকিরা জিপিএ-১ থেকে ২-এর মধ্যে পেয়েছে। এর বাইরে মাদ্রাসা বোর্ডের জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৭ হাজার ৭৩, এবং জিপিএ-৫-এর নিচে জিপিএ-৩.৫০ প্রাপ্ত প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর অনেকেই অনার্স বা ডিগ্রি পড়ার জন্য ভিড় করতে পারে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই অবস্থায় ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, সিলেট শাহজালাল, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কয়েকটি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, টেকনোলজি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত পুরনো ১৯টি কলেজ বাদে বাকিগুলোর আকর্ষণ ক্ষমতার অভাবের ফলে ভর্তি নিয়ে সংকটই সৃষ্টি হতে পারে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ বছর মেয়াদি ডিগ্রি খোলার কারণে শিক্ষার্থীরা আবার পাস কোর্সে পড়তে অনাগ্রহী। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স কোর্সে বিশেষ করে বেসরকারি অনার্স কলেজে শিক্ষার্থীকে খুব কমই টানতে পারছে। সেক্ষেত্রে সবার লক্ষ্য পাবলিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি।

প্রসঙ্গত, জাতীয় এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বাদে দেশের ২৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৬ হাজার ৮৮৬টি আসন রয়েছে। অনুমোদিত ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ২ লাখ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯টি কলেজে স্নাতকে (সম্মান) ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫টি এবং ১৪৭৪টি কলেজে পাসকোর্সে প্রায় ২ লাখ, কলেজ অব লেদার টেকনোলজি ও কলেজ অব টেক্সটাইল টেকনোলজিতে ৪৫৫টি, ১৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজে ২ হাজার ৩৯৪টি, ৪১টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ৩ হাজার ৫৫টি, সরকারি-বেসরকারি ১৪টি ডেন্টাল কলেজে ৯১০টি এবং ১৬টি ইন্সটিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে (বিএসসি) ১ হাজার ৬৫টি আসন রয়েছে। এর বাইরে সরকার এবার ৮টি নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। এর বাইরে আরও কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত কলেজে অনার্স শ্রেণীতে ভর্তির জন্য ন্যূনতম একটি ভালো ফলাফলের অধিকারী হতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনের জন্য এসএসসি ও এইচএসসি মিলিয়ে জিপি ৬ থেকে ৭ পেতে হয়। এক্ষেত্রে ভর্তিচ্ছু এসএসসির ফলাফল যদি ভালো হয় আর এইচএসসিতে ভর্তির আবেদনের জন্য কমপক্ষে জিপি-২ ধারীদের ভর্তির যোগ্য ধরা হয়, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ১৪টি সরকারি মেডিকেল কলেজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলো এবং বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেই এবার উত্তীর্ণ সোয়া লাখ শিক্ষার্থীতে পূর্ণ হয়ে যাবে। ফলে বাকি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন সচল রাখার লক্ষ্যে বিদেশ যেতে হবে। সৌজন্যে দৈনিক যুগান্তর।

Advertisements
Loading...