১৯৫২ সালের মহান ভাষা সংগ্রামী এখনও যাঁরা জীবিত আছেন…

এম. এইচ. সোহেল ॥ মহান ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ভাষার জন্য এদেশের অকুতয়ভয় ছাত্র-জনতা প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। সে কথা আমরা কি কখনও ভুলতে পারি? না এই স্মৃতি বিজড়িত ভাষা আন্দোলনের কথা আমরা কখনও ভুলতে পারি না।

আজ সেই মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই দিনটি এখন শুধু আমরা নয়, বিশ্বের সবদেশেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তাই এই ভাষা নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। সেই গর্বিত ভাষা আন্দোলনে যাঁরা অকুতভয় সৈনিকের মতো লড়েছেন, তাঁদের সকলের কথা হয়তো আমরা জানিও না। শুধু যে রাজধানীতে এই আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও এই ভাষা নিয়ে সেদিন আন্দোলন হয়েছিল। তাই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও আমাদের ভাষা সৈনিক রয়েছে। অথচ আমরা তাঁদের কোন খোঁজও হয়তো জানি না বা রাখি না। কিন্তু যাঁরা আমাদের মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠিত করতে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তাঁদেরকে স্মরণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব বটে। আজকের মহান এই দিনে আমরা স্মরণ করি ওইসব ভাষা শহীদদের যাঁরা আমাদের দেশের আনাচে-কানাচে এখনও জীবিত আছেন তাঁদেরকে।

বিভিন্ন সময় সেই সব নাম না জানা ভাষা সৈনিকদের নিয়ে কথা-বার্তা হয়। আর তাই সরকারও বিষয়টি নিয়ে সমপ্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি তালিকাও তৈরি হয়েছে। এখানে জীবিত ভাষা সংগ্রামীদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য এটা পাঠানো হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী সারাদেশে জীবিত ভাষা সংগ্রামীর সংখ্যা এখন ৬৮ জন। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি তালিকাটি বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি ফরিদ আহমেদের বেঞ্চে উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা সংক্রান্ত রায় বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন ওই আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আদালত আগামী বছরের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে ভাষা জাদুঘর নির্মাণের কাজ শেষ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর তা বিবেচনা করে সংস্কৃতি সচিব ও পূর্ত সচিবকে অব্যাহতি প্রদান করেছেন।

উল্লেখ্য, হাইকোর্টে পাঠানো তালিকা অনুযায়ী জীবিত ভাষা সংগ্রামীরা হচ্ছেন- রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, আবদুল মতিন, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, অলি আহাদ, রওশন আরা বাচ্চু, ডা. শরফুদ্দিন আহমদ, শিল্পী ইমদাদ হোসেন, শিল্পী মর্তুজা বশীর, ড. সুফিয়া আহমেদ, ড. হালিমা খাতুন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রফেসর রফিকুল ইসলাম, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, প্রফেসর আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক অজর রায়, আহমদ রফিক, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সনজীদা খাতুন, কামাল লোহানী, সাঈদ হায়দার, দেবপ্রিয় বড়-ুয়া, ড. ফারুক আজিজ খান, এম মুজিবুল হক, সাঈদ উদ্দিন আহম্মদ, জিয়াদ আলী, সমীরউদ্দীন আহমদ, তোফাজ্জল হোসেন, খালেদা ফেন্সী খানম, জহরত আরা খানম, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, শিল্পী আমিনুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন আকুঞ্জী, অ্যাডভোকেট আবদুর রাজ্জাক, আবুল হোসেন, সাইফুল ইসলাম (পাবনা), রণেশ মৈত্র (পাবনা), মমতাজ উদ্দিন আহম্মেদ (রাজশাহী), নাদেরা বেগম, প্রতিভা মুৎসুদ্দি, বেগম চেমনআরা, আবদুল গফুর, খোদাদাদ খান, নুরুল হক ভুঁইয়া, সৈয়দ ফজলে আলী, আবদুল লতিফ, মোতাহার হোসেন সুফী (রংপুর), আফজাল হোসেন (রংপুর), কার্জন আলী (গাইবান্ধা), প্রাণেশ সমাদ্দার (ঢাকা), ডা. আলী আছগর (ঢাকা), শাহ তফাজ্জল হোসেন প্রধান (ঢাকা), শাহ তবিবুর রহমান প্রধান (রংপুর), একেএম আজহার উদ্দিন (বরিশাল), আনিসুল হক পেয়ারা (রংপুর), নিলুফার আহমদ ডলি (রংপুর, বর্তমানে ঢাকায়), রওশন জাহান হোসেন (ঢাকা), রওশন আরা চৌধুরী (ঢাকা), ড. জাহানারা বেগম (রাজশাহী, বর্তমানে ঢাকায়), হাসান ইমাম টুটুল (গাইবান্ধা), শাহ আবদুর রাজ্জাক (রংপুর), ডা. এম ইসমাইল (ঢাকা), চৌধুরী হারুনুর রশিদ (চট্টগ্রাম), একেএম রফিকুল্লাহ চৌধুরী (চট্টগ্রাম), অধ্যাপক আবুল কাসেম, শাহেদ আলী, মমতাজ বেগম (নারায়ণগঞ্জ) ও একরামুল হক (রাজশাহী)।

জানা যায়, পরিবেশ ও মনবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষায় আট দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন হাইকোর্ট।

৮ দফা নির্দেশনা হচ্ছে :
১. ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিরক্ষার জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষা ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় কোন ভবঘুরে যেন ঘোরাফেরা বা অসামাজিক কার্যকলাপ করতে না পারে সে জন্য পাহারার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ নিরাপত্তা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য তিনজন নিরাপত্তা রক্ষী নিয়োগ দিতে তথ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়।
২. কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মূল বেদিতে কোন মিটিং, মিছিল, পদচারণা, আমরণ ধর্মঘট বা সমাবেশ করা যাবে না। তবে বেদির পাদদেশে মিটিং-সমাবেশ করার বিষয়ে কোন বাধা-নিষেধ থাকছে না। একই সঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে তিনজন নিরাপত্তা কর্মী ও তিনজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগের নির্দেশ দেয়া হয়।
৩. ভাষা আন্দোলনের শহীদদের মরণোত্তর জাতীয় পদক ও জীবিত ভাষাসৈনিকদের জাতীয় পদক দেয়ার নির্দেশ।
৪. জীবিত ভাষাসৈনিকদের কেউ আর্থিক সাহায্যের আবেদন জানালে তা দেয়ার ও চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ।
৫. বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
৬. কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে একটি লাইব্রেরি ও ভাষা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের জানার জন্য এ জাদুঘরে ভাষা আন্দোলনের তথ্য সংবলিত গ্রন্থপঞ্জিকা (ব্রুশিয়ার) সংরক্ষণ করতে হবে।
৭. ভাষাসৈনিকদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন এবং ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে এ তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে হবে এবং
৮. সব রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ভাষাসৈনিকদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে ও সাধ্যমতো তাদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এ রায় দেয়ার পর অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনকে প্রধান করে গঠিত একটি কমিটি ভাষা সৈনিকদের তালিকা প্রণয়ন করে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি সংগঠনটির সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী ওই রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করায় আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করেন। ওই দিন আদালত সাংস্কৃতিক সচিবকে তলব করেন। পাশপাশি পূর্ত সচিবকে শহীদ মিনারের মর্যাদা রক্ষায় নির্দেশনা অনুযায়ী দুটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি সংস্কৃতি সচিব ও পূর্ত সচিব আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

এ ব্যাপারে রিটকারীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ জানান, সংস্কৃতি সচিব আদালতে হাজির হয়েছিলেন। এছাড়া সংস্কৃতি সচিব ও পূর্ত সচিব আদালতে রায় বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী তারা ভাষা সংগ্রামীদের তালিকা তৈরি, নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ, সাইনবোর্ড লাগানোসহ বেশ কিছু নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছেন। তবে লাইব্রেরি ও ভাষা জাদুঘর নির্মাণ করা হয়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আগামী বছরের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ভাষা জাদুঘর নির্মাণের কাজ শেষ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

দীর্ঘ সময় পর হলেও আমরা হয়তো রায়গুলোর বাস্তবায়ন দেখতে যাচ্ছি। আমরা আশা করছি দেশের জন্য, দেশের মানুষের মুখের ভাষা তথা মাতৃভাষার জন্য যাঁরা অকাতরে জীবন উৎসর্গ করেছেন, উপরোক্ত নির্দেশনা পালনের মাধ্যমে আমরা তাঁদের প্রতি কিঞ্চিত শ্রদ্ধা জানাতে সক্ষম হবো।

Advertisements
Loading...