আদালতের স্থিতাবস্থা সত্ত্বেও ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ ব্রীজের পাদদেশে প্রতিষ্ঠিত পাকশী রিসোর্ট ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে!

ঈশ্বরদী প্রতিনিধি ॥ শুধুমাত্র রাজনীতির কারণে অত্র অঞ্চলের একমাত্র পর্যটন স্পট ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ ব্রীজের পাদদেশে প্রতিষ্ঠিত পাকশী রিসোর্ট ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

জানা যায়, উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিনোদন কেন্দ্র ঈশ্বরদীর পাকশী রিসোর্ট প্রতিহিংসার শিকার হতে চলেছে। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের পর পর কয়েকটি রায় ও সুনির্দিষ্ট স্থিতাবস্থা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক কারণে এ সমৃদ্ধ শিল্প নিদর্শন ধ্বংসের প্রস্তুতি চলছে। রেলওয়ে পাকশী বিভাগ এটি ভাঙা হবে বলে কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছেন। এ নিয়ে পর্যটক, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

অত্র এলাকার বিশিষ্ট শিল্পপতি আকরাম আলী খান সঞ্জু ও তাদের পরিবার আবদুল মান্ননের কাছ থেকে জমি কিনে তার ওপর ব্যক্তিগত উদ্যোগে অপার সৌন্দর্যমণ্ডিত এবং অনুপম স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শনস্বরূপ বিনোদন কেন্দ্র পাকশী রিসোর্ট প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ৩৩ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ রিসোর্টে শিশুকিশোরসহ সব বয়সের নারী-পুরুষের আনন্দ উপভোগ করার মতো বিভিন্ন ব্যবস্থা আছে। দেশ-বিদেশ থেকে আগত পর্যটকদের জন্য রয়েছে থাকা-খাওয়াসহ সব ধরনের আবাসিক সুবিধাসংবলিত আধুনিক ব্যবস্থা। পাবনা শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে এবং ঈশ্বরদী উপজেলা হেডকোয়ার্টার থেকে ৬ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত পাকশী রিসোর্টের পাশেই রয়েছে পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত শত বছরের পুরনো রেল সেতু ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। এর পাশেই রয়েছে প্রায় এক দশক আগে নির্মিত লালন শাহ সেতু। এ দুই সেতু জোড়া সেতু হিসেবে পরিচিত হওয়ায় নয়নাভিরাম এ দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই প্রচুর পর্যটকের ভিড় জমে পাকশীতে। এছাড়াও পাকশীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে শত বছরের পুরনো বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার বৃক্ষরাজি। দুই সেতুর নিচে পদ্মা নদীর পাড়ে রয়েছে সহজলভ্য ডিঙি নৌকা, যাতে করে অনায়াসে ইচ্ছেমতো ঘুরে ফিরে দেখা যায় পদ্মা নদীর অনুপম সৌন্দর্য। পাকশীতে দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে আসার জন্য রয়েছে সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা। পর্যটনের এ অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সরকারিভাবে পর্যটনের কোনই উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিশিষ্ট শিল্পপতি ও রাজনীতিক আকরাম আলী খান ওরফে সঞ্জু খান কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেন বিনোদন কেন্দ্র পাকশী রিসোর্ট। কিন্তু এই রিসোর্টটি এখন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকারে পরিণত হচ্ছে।

জানা গেছে, পাকশী রিসোর্টের জমির মূল মালিক আবদুল মান্নানের ছেলে আজম খান জানান, ১৯৪১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ের অধিগ্রহণকৃত অপ্রয়োজনীয় ৫০ একর জমি পাবনা কালেক্টর নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করেন। সেই নিলাম থেকে খবির উদ্দিন ২৯ দশমিক ৮৪ একর এবং ভগবান দাস ২০ দশমিক ৯৬ একর জমি কেনেন। এদের দু’জনের কাছ থেকে আবদুল মান্নান খান ১১ দশমিক ০৬ একর জমি কিনে নেন। বাকি জমি স্থানীয় ফুরফুরা শরিফে দান অথবা বিক্রি করেন। ফুরফুরা শরিফ ওই জমির খারিজ খাজনা সম্পন্ন করলেও আবদুল মান্নানের জমি ’৭৫ সালে ভুল করে আরএস রেকর্ডে রেলের অন্তর্ভুক্ত হয়। ’৭৬ সালে আবদুল মান্নান রেকর্ড সংশোধনের জন্য মামলা করেন এবং ডিগ্রিপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে ওই আবদুল মান্নানের কাছ থেকে শিল্পপতি আকরাম আলী খান সঞ্জু ও তার পরিবার কিছু জমি কিনে নেন এবং কিছু জমিতে আবদুল মান্নানের আত্মীয়স্বজন বসবাস করতে থাকেন। এরপরও খাজনা খারিজে জটিলতার কারণে আবদুল মান্নান রেকর্ড সংশোধনের জন্য ২০০৭ সালে পাবনা সাব জজ আদালতে আবারও মামলা করেন এবং মামলায় ডিগ্রিপ্রাপ্ত হন। এ সত্ত্বেও রেলওয়ে বিভিন্ন সময় জমি থেকে উচ্ছেদের নানা হুমকি-ধামকি দিতে থাকলে জমির মূল মালিক আবদুল মান্নানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পাবনা যুগ্ম সাব জজ আদালত আবদুল মান্নানের পক্ষে স্থিতাবস্থা জারি করেন এবং এখনও তা বহাল রয়েছে। পরবর্তীতে রেলওয়ে আপিল করলে আবদুল মান্নান আবারও ডিগ্রি প্রাপ্ত হন। অথচ আদালতের এই একাধিক রায় এবং স্থিতাবস্থা সত্ত্বেও রেলওয়ে পাকশী বিভাগ ১১/১২ সেপ্টেম্বর এটি ভাঙা হবে বলে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছেন। এ নোটিশের পর মূল মালিক আবদুল মান্নানের পক্ষে পাবনা জজকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী হামিদুর রহমান রেলওয়েকে লিগ্যাল নোটিশ দিয়ে আদালত অবমাননা না করার জন্য অনুরোধ করেন। আজম খান আরও জানান, রেলওয়ে তাদের প্রায় দেড় হাজার একর সম্পত্তি বেদখল হওয়ার কথা বললেও এর কোনটি দখলে নেয়ার উদ্যোগ নেয়নি।

এলাকাবাসীদের বক্তব্য

এ বিষয়ে আমরা ঈশ্বরদী তথা আশপাশের বেশ কিছু এলাকার অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। এলাকার মানুষ মনে করে একটি প্রতিষ্ঠান এভাবে আদালতের নির্দেশনা সত্বেও ভেঙ্গে দেওয়া যায় না। তাছাড়া এটি কোন ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়। এটি অত্র এলাকার গর্ব। এলাকার মানুষ মনে করেন, পদ্মা নদীর তীরঘেষে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের কোথাও নেই। এটি শুধু ঈশ্বরদী নয় সমগ্র উত্তরাঞ্চল এমনকি দেশের গৌরব। কারণ আমাদের দেশে যে সব পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে এগুলোর উন্নয়নে বর্তমান সরকার যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন কতিপয় ষড়যন্ত্রকারীর মদদে এমনটি হতে পারে না। ঈশ্বরদীর এক সাংবাদিক জানালেন, সামপ্রতিক সময়ে রেলমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঈশ্বরদীতে এলে তাকে ভুল বুঝিয়ে এহেন কর্ম করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। এলাকার মানুষের তথা দেশের বিনোদনের এই মাধ্যমটি একদিনে গড়ে ওঠেনি। আর তিলে তিলে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটি কারো ব্যক্তি স্বার্থে ভেঙ্গে ফেলা হবে তা কখনও মেনে নেওয়া যায় না বলে এলাকাবাসী মত দিয়েছেন।

যেহেতু সরকারের সঙ্গে মামলা চলছে মামলার রায় এখনও চূড়ান্ত হয়নি এই মামলা চলা অবস্থায় একটি প্রতিষ্ঠানকে এভাবে ভাঙ্গা যায় না। তারপরও সরকার মামলার রায় না হওয়া অবধি এরূপ প্রতিষ্ঠান না ভেঙ্গে পিপির অধিনে নিয়ে পরিচালনা করতে পারেন বলে এলাকাবাসী মনে করেন।

Advertisements
Loading...