গোলাপি চিংড়ি, কাচসদৃশ মাছসহ কয়েকটি আশ্চর্য কাহিনী

দি ঢাকা টাইমস ডেস্ক ॥ প্রতি সপ্তাহের মতো আজও আমরা বিশ্বের বিভিন্ন মজার মজার খবর আপনাদের সামনে তুলে ধরবো- আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।


গোলাপি চিংড়ি

গোলাপি চিংড়ি একটি নতুন আবিষ্কার। এর আগে কখনও এ প্রজাতির চিংড়ির দেখা মেলেনি। সাম্প্রতিককালে কেপ কিন্ডো শহরের কাছে আর্কটিক মহাসাগরে পাওয়া গেছে এ বিস্ময়কর চিংড়ি। আমাদের সুপরিচিত প্রশান্ত, আটলান্টিক বা ভারত মহাসাগরে এখনও এমন প্রাণীর অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। কেপ কিন্ডো শহরটি রাশিয়ার জনবহুল এলাকা থেকে অনেক দূরে আর্কটিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত। এ জায়গায় রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা প্রতিষ্ঠা করেছেন সমুদ্র গবেষণাগার- White Sea Biological Station সেখানকার তাপমাত্রা মাত্র ২ ডিগ্রি, যা কখনও মাইনাস ৩০ ডিগ্রিতে পৌঁছে। সবসময় সমুদ্রের ওপরে পড়ে মোটা বরফের স্তর, যার ওপর দিয়ে অনায়াসে গাড়ি চালানো যায়। এমন হিম সাগরের গভীরে সদর্পে বিচরণ করছে এই আজব প্রাণীটি। সেখানে কাজ করতে গিয়ে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী আলেকজান্ডার সেমেনভের ক্যামেরায় প্রথম ধরা পড়ে অদ্ভুত এ জীবটি। এর সৌন্দর্য, স্বচ্ছতা ও গায়ের রঙ দেখে তিনি এর নাম দেন Pink Skeleton Shrimp বা গোলাপি কংকাল চিংড়ি। আর্কটিকের এই বরফাচ্ছাদিত হিম সাগরে তিনি আরও ১৪ প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান পান, যা পৃথিবীর আর কোন সাগরের প্রাণীর সঙ্গে মিল নেই। এদের মধ্যে সাগর দেবদূত নামের বিস্ময়কর প্রাণীও রয়েছে।

কাচসদৃশ মাছ

অ্যাফিয়া গোত্রের গোবিডাই পরিবারভুক্ত ছোট এ মাছটির নাম ট্রান্সপারেন্ট গোবি। ঠিক যেন ছোট ছোট কাচের টুকরায় পুঁতির মতো দুটি চোখ বসিয়ে দেয়া হয়েছে, আর কাচটি জীবিত হয়ে উঠেছে। মাছটি কাচের মতো এতই স্বচ্ছ যে, এর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দেখা যায়। তাই এর এমন নাম। তবে এর বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাফিয়া মাইনুটা। জানার বিষয় হল, স্বচ্ছ এ মাছটি অ্যাফিয়া গোত্রের একমাত্র মাছ। আটলান্টিক মহাসাগরে নরওয়ের ঞৎড়হফযবরস উপকূল থেকে উত্তর আফ্রিকার মরক্কো উপকূল, কৃষ্ণসাগর, ভূমধ্যসাগর এবং পূর্ব ইউরোপের আজভ সাগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাস করে এ মাছটি। এসব অঞ্চলে সমুদ্রতীরবর্তী ০ থেকে ৯৭ মিটার পর্যন্ত বালু এবং কর্দমাক্ত পরিবেশে বাস করে এরা- যেখানে পানির তাপমাত্রা থাকতে হবে ১৩ ডিগ্রী থেকে ১৬ ডিগ্রী সে, স্পেনে বিশেষ করে আন্দালুসিয়ান, কাতালনিয়ান এবং ভেলেনসিয়ান খাদ্যতালিকায় রয়েছে এ মাছ। আন্দালুসিয়ায় ডিম ও মরিচের গুঁড়াসহ এই মাছ ভেজে পরিবেশন করা হয়। এ খাবারের নাম চ্যানকুয়েটস। যখন এ মাছ পাওয়া না যায় তখন কিংবা বেশি দামের কারণে এ মাছ চাইনিজ নুডলস ফিশ নামক খাবার দ্বারা পরিবেশন করা হয়। স্পেনে চাইনিজ নুডলস ফিশকে চ্যানকুয়েটস চীনো বলা হয়। কিন্তু ইদানিং এ মাছের অসাধারণ গঠনের জন্য এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, একে খাবারের চেয়ে অ্যাকুরিয়ামে রাখার চাহিদা বেড়ে গেছে। অনেকে এর সঠিক নাম না জানলেও এ মাছ বর্তমানে গ্লাস ফিশ নামে বেশ পরিচিত। শান্ত স্বভাবের এই স্বচ্ছ গোবি মাছগুলো আকারে ১ ইঞ্চি থেকে ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। ক্ষুদ্র কেঁচো এদের প্রিয় ও প্রধান খাদ্য। এ ছাড়া এরা অতি ক্ষুদ্রাকৃতির চিংড়ি ও কিছু সামুদ্রিক প্লাঙ্কটন খেয়ে জীবনধারণ করে থাকে।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফ গুহা

ইসরিসেনওয়েল্ট একটি জার্মান শব্দ, যার ইংরেজি অর্থ দাঁড়ায় ডড়ৎষফ ড়ভ ঃযব ওপব রেধহঃং অর্থাৎ বরফ দৈত্যের বিশ্ব। মূলত এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বরফ গুহার নাম। অস্ট্রিয়ার সালজবার্গ (ঝধষুনঁৎম) শহর থেকে ৪০ কিলিমিটার দক্ষিণে ওয়েরফেন শহরের হচকোজেল পর্বতে অবস্থিত এই প্রাকৃতিক গুহাটি। হিমায়িত চুনাপাথরের বৃহৎ এই গুহাটির দৈর্ঘ্য ৪২ কিমি. এবং প্রতি বছর এটা দেখার জন্য এখানে ভিড় করেন প্রায় ২ লাখ পর্যটক। টারশিয়ারি যুগে গঠিত এই গুহাটি যদিও দৈর্ঘ্যে ৪২ কিলোমিটার কিন্তু পর্যটকদের মাত্র ১ কিলোমিটার ঢোকার অনুমতি দেয়া হয়। গুহাটির প্রথম ১ কিলোমিটার বরফে আচ্ছাদিত থাকলেও এর পরবর্তী অংশ শুধুই চুনাপাথরে ঘেরা। সালযাচ নামের নদীর পানি প্রবাহের কারণে ইসরিসেনওয়েল্ট গুহাটি গঠিত হয়েছে। এই নদী থেকে উপচে পড়া পানি শীতকালে জমে গিয়ে বরফের আকার ধারণ করার কারণে গুহাটির প্রবেশ মুখ বরফে আচ্ছাদিত থাকে। ১৮৭৯ সালের দিকে এই গুহাটির প্রথম সন্ধান পান প্রকৃতি বিজ্ঞানী এনটন পোজেল্ট। এই সময় তিনি এই গুহাটির মাত্র ২০০ মিটার খনন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর আগে পাথরে ঢাকা এই গুহাটি স্থানীয়দের কাছে নরকের দরজা নামে পরিচিত ছিল। ১৮৮০ সালে এই গুহাকে নিয়ে তার একটি লেখা মাউন্টেনিয়ারিং নামক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। কিন্তু লেখাটি তেমন সাড়া ফেলেনি। তেমন কারও নজরেই আসেনি। যারা আর্টিকেলটি পড়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন হলেন গুহা বিশেষজ্ঞ আলেকজান্ডার ভন মরক। তার নেতৃত্বে ১৯১২ সাল থেকে এই গুহায় দফায় দফায় অভিযান শুরু হয়। কিন্তু ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি নিহত হলে অভিযান কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়লেও এই গুহা খননের কাজ কখনই থেমে থাকেনি। গুহাটির প্রথম অংশটির নাম আবিষ্কারকের নামানুসারে রাখা হয়েছে পোজেল্ট হল। এখানে গুহার চাতালে দাঁড়ানো সুচালো পাথরের স্ট্যালাগমাইটগুলোর নাম দেয়া হয়েছে পোজেল্ট টাওয়ার। এগুলো পার হয়ে যাওয়ার পর চোখে পড়বে ২৫ মিটার উচ্চতার বিশালাকার একটি বরফের বাঁধ। এর পরের অংশের নাম হাইমিরস ক্যাসেল। অস্ট্রিয়ার মিথোলজি (স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চল) অনুযায়ী হাইমির হলেন হরুরের স্বামী, যারা দু’জনেই রাক্ষস। যাদের বাস এ গুহাতে ছিল। এখানে ওপর থেকে ঝোলানো স্ট্যালাগমাইটগুলোর নাম ঋৎরমমধ’ং ঠবরষ বা ফ্রিগার অবগুণ্ঠন। বর্তমানে এই গুহাটি অস্ট্রিয়ার জাতীয় বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। আগে এটি সালজবার্গ গুহা আবিষ্কারকরণ সংস্থার মালিকানায় ছিল। প্রতি বছর ১ মে থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত এই গুহাটি পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়া হয়। গুহাটিতে প্রবেশের জন্য অবশ্য গরম কাপড় সঙ্গে রাখতে হয় এবং বর্তমানে কোন ছবি তোলার অনুমতি দেয়া হয় না।

হুয়াং কুও শু জলপ্রপাত

বিখ্যাত জলপ্রপাত ‘হুয়াং কুও শু’ দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের কুইচৌতে অবস্থিত। চীনের স্থানীয় এক ধরনের বৃক্ষ ‘হুয়াং কুও শু’ নামানুসারে এই জলপ্রপাতটির নামকরণ করা হয়েছে। অন্য জলপ্রপাতের দৃশ্যের চেয়ে পর্যটকরা উপরে, নিচে, বামে, ডানে, সামনে ও পেছনে এই ছয়টি দিক থেকেই হুয়াং কুও শু জলপ্রপাতের সবসময়কার পরিবর্তিত দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। ঠিক এই অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যের কারণেই বিশ্বের বিখ্যাত জলপ্রপাতগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে সুন্দর ও মনোহর জলপ্রপাত বলে পরিচিত। হুয়াং কুও শু জলপ্রপাতকে কেন্দ্র হিসেবে এখানে বিভিন্ন আকারের আরও ১৮টি জলপ্রপাত রয়েছে। ফলে এ স্থানটি একটি বিরাট জলপ্রপাতের ‘পরিবারে’ পরিণত হয়েছে। এর সমন্বিত নাম হল ‘৯ পর্যায়ের ১৮ জলপ্রপাত’, সুন্দর এ দৃশ্য গ্রেট ওয়ার্ল্ড গিনিস সদর দফতর বিশ্বের বৃহত্তম জলপ্রপাত গ্রুপ বাছাই করার পাশাপাশি বিশ্ব গিনিস রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। হুয়াং কুও শু জলপ্রপাতটি খুবই দৃষ্টিনন্দন। এটি ১০১ মিটার চওড়া এবং ৭৭.৮ মিটার উঁচু। সারা বছরের চার ঋতুতেই এতে স্রোতের ধারা অব্যাহত থাকে। হুয়াং কুও শু দর্শনীয় স্থানে সারি সারি নীল পাহাড় ও বিস্ময়কর সব পাথর দাঁড়িয়ে রয়েছে। নদীর স্বচ্ছ পানি মাঝে মাঝে পাহাড়গুলো দিয়ে বয়ে যায়। কখনও কখনও ভূমির নিচের প্রান্ত ছুঁয়ে যায়। ফলে এক একটি ভূগর্ভস্থ নদীর সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৫ সালে হুয়াং কুও শু দর্শনীয় স্থান ‘চীনের জাতীয় ভূগোল’ ম্যাগাজিনের ‘চীনের শ্রেষ্ঠ জায়গা’র তালিকায়, পিপলস ডেইলি পত্রিকার ‘চীনের দর্শনীয় স্থানের পর্যটকদের ১০টি পছন্দের’ তালিকায় এবং ‘ইউরোপীয় পর্যটকদের জন্য চীনের ১০টি সবচেয়ে ভালো লাগা দৃশ্যাবলী’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে চীনের জাতীয় পর্যটন ব্যুরো হুয়াং কুও শুকে চীনের প্রথম দফা শীর্ষ পর্যায়ের দর্শনীয় পর্যটন স্থান নির্বাচন করেছে। বর্তমানে হুয়াং কুও শু দর্শনীয় স্থান তার বৈশিষ্ট্যময় সুন্দর দৃশ্যের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার পর্যটককে আকর্ষণ করছে।

সুন্দর জলাভূমি নামুসিলাই

নামুসিলাই চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের চাং উ জেলার উত্তরপূর্বাঞ্চল ও কেরচিন মরুভূমির দক্ষিণ দিকে অবস্থিত অর্ধেক বালি ও খরা অঞ্চল। পরবর্তী সময় এ অঞ্চলে একটি প্রাকৃতিক জলাভূমি সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে নির্মিত হয়েছে। এটি নামুসিলাই প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকা নামেই পরিচিত। স্থানীয় অঞ্চলের অধিবাসীরা একে লিয়ানহুয়া পাও বলে ডাকে। আঞ্চলিক ভাষায় পাওজি’র অর্থ হল ছোট হ্রদ। এই হ্রদটির আয়তন খুব বড় নয়। তবে এটি হচ্ছে কেরচিন মরুভূমির কেন্দ্রীয় স্থান। শেনইয়াং শহর থেকে ৫-৬ ঘণ্টার গাড়ি করে চাংউ জেলার হৌমা গ্রামে নামুসিলাই প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকার পৌছা যায়। হৌমা গ্রাম থেকে প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকাটি প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে। এই প্রাকৃতিক এলাকাটি কয়েকটি অংশ নিয়ে গঠিত। কেন্দ্রীয় অঞ্চলে পশুপালন নিষিদ্ধ এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশ সংরক্ষিত। এখানে উদ্ভিদ প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য হচ্ছে হ্রদের পদ্মফুল। এ পদ্মফুল হচ্ছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের উদ্ভিদ, যা কেবল এই হ্রদেই বেঁচে থাকতে পারে। হ্রদের ১০০ একর থেকে ৬০০ একর এলাকা জুড়ে রয়েছে এই পদ্ম। এখনকার জলাভূমিতে অনেক পাখি ও বন্যপ্রাণীর বসবাস করে। ঈগল থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের পাখির বসবাস রয়েছে এই অঞ্চলে। বহু বছরের সংরক্ষণের পরও গ্রীষ্মকালে এখানকার দৃশ্য খুব সুন্দর এবং জীবের বসবসা আগের তুলনায় অনেক বেশি। নিবিড় নলখাগড়া ও পদ্মফুল আর পাখির মিষ্টি কণ্ঠের গান কেরচিন মরুভূমিকে মনোরম করে তোলে। বর্তমানে এখানকার দৃশ্য আরও সুন্দর। এ জলাভূমি হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দরময় স্থান। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তাই এই সৌন্দর্যকে রক্ষা করার জন্য কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...