অনিশ্চিয়তার জাঁতাকলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প!

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ দেশবাসীর দীর্ঘদিনের সেই স্বপ্ন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প মুখ থুবড়ে মরতে বসেছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পটি সহসাই বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে।

যদিও এ রেললাইনকে ঘিরে স্বপ্নের শেষ নেই চট্টগ্রামবাসীর। শুধুই কি চট্টগ্রামের মানুষ! দেশবাসীর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে এ রেললাইন নিয়ে। আশায় বুক বেঁধেছিলেন ট্রেনে চড়ে পর্যটন শহর কক্সবাজারে যাবেন তারা। দিন যত যাচ্ছে তাদের সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। পত্রিকার একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প হলেও মহাজোট সরকারের বাকি মেয়াদে এ প্রকল্পের কাজ আদৌ শুরু করা যাবে কি-না তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সন্দেহ-সংশয়। এখনও পর্যন্ত অর্থের সংস্থান হয়নি প্রকল্পটির। ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল কক্সবাজারের ঝিলংজা নামক স্থানে রেললাইনটির ভিত্তিফলক উন্মোচন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জানা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নিয়ে অনিশ্চয়তার একমাত্র কারণ অর্থ সংকট। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দরকার সাড়ে ১৮শ’ কোটি টাকা। এডিবি, চীনসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা প্রথম দিকে এ প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও পরে তারা সরে যায়। দাতা না পেলে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে রেললাইনটি করার ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকারও প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে পারছে না। অন্যদিকে কিছু শর্তসাপেক্ষে প্রকল্পটি নিয়ে নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে এডিবি। তবে তারা রেললাইনটি নির্মাণে নতুন সমীক্ষা করার শর্ত দিচ্ছে। যে কারণে রেলপথটির নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের চেয়ে আরও অনেক বেশি সময় লেগে যাবে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পটি জাতীয়ভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ রেললাইন নির্মাণে জোর দিলেও কাজের অগ্রগতি আমাদের হতাশ করেছে। অথচ রেললাইনটি করা গেলে পর্যটন শহর কক্সবাজারের চেহারাই পাল্টে যেত।

জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয় কক্সবাজার-মিয়ানমার রেললাইন প্রকল্প। সিদ্ধান্ত হয় ২০১৪ সালের জুন মাসে ট্রেন চালু হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেললাইনটি নির্মিত হলে নাটকীয় উন্নতি ঘটবে দেশের পূর্বমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থায়। এ রেললাইনের মাধ্যমে যাওয়া যাবে মিয়ানমার, চীনসহ ট্রান্সএশিয়ান রেললাইন লিংকে থাকা ২৭টি দেশে। পাশাপাশি অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটবে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতের শহর কক্সবাজারের।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার, রামু হয়ে মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকা ঘুংধুম পর্যন্ত রেললাইনটির দৈর্ঘ্য হচ্ছে ১২৮ কিলোমিটার। প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে ৪১২ একর। এজন্য ব্যয় হবে সাড়ে ৬শ’ কোটি টাকার বেশি। রেললাইনটি হলে এ রুটে বছরে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ যাত্রী চলাচলের সুযোগ পাবেন।

জানা যায়, রেলওয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ইন চিফ বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণের প্রক্রিয়া। ইঞ্জিনিয়ারিং ইন চিফ মো. খায়রুল আলম বলেন, প্রকল্পটির বর্তমানে যে অবস্থা তাতে এটি আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

অর্থের উৎস নিশ্চিত না করেই ভিত্তিফলক উন্মোচন

অর্থের উৎস নিশ্চিত না করে প্রকল্পের কাজ শুরু করায় অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে এ রেললাইন নির্মাণের কাজ। এশীয় ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও বিশ্বব্যাংক ঋণ সহায়তার আশ্বাস দেওয়ায় ৩ এপ্রিল তড়িঘড়ি করে কক্সবাজারের ঝিলংজায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্পের ভিত্তিফলক স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে দাতারা অর্থায়নের ব্যাপারে আশানুরূপ সাড়া না দেওয়ায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ রেললাইন নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও শুরু করা যায়নি।

কেনো গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন

দেশের প্রধান স্বাস্থ্যনিবাস, পর্যটন কেন্দ্র ও ফিশিং সেন্টার হচ্ছে কক্সবাজার। বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র তীরবর্তী বেলাভূমিও রয়েছে এখানেই। সারা বছর বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটক ভিড় করেন কক্সবাজারে। এছাড়া মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাও রয়েছে এ শহর ঘেঁষেই। সীমান্তপথে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের পণ্যসামগ্রী আমদানি-রফতানির একমাত্র পথও এটি। এসব গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার এক লাইন বিশিষ্ট রেলপথ সম্প্রারণের উদ্যোগ নেয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেললাইনটি স্থাপিত হলে দেশের পূর্বমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থ্‌থায় ব্যাপক অগ্রগতি হবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করতে পারবে ট্রান্সএশিয়ান রেললাইন করিডোরে।

আট বছরে ব্যয় বেড়েছে সাড়ে চারশ’ কোটি টাকা!

আট বছরে এ প্রকল্পে খরচ বেড়েছে সাড়ে চারশ’ কোটি টাকারও বেশি। ২০০১-০২ অর্থবছরে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্ত ঘুংধুম পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণে যে সমীক্ষা চালানো হয় তাতে ওই প্রকল্পে ১২৮ কিলোমিটার রেললাইন স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। সে সময় প্রকল্প বাস্তবায়ন না করায় বর্তমানে এ প্রকল্প ব্যয় এসে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৮ বছর দেরিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় সরকারকে বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে ৪৫৫ কোটি টাকা।

রেললাইন সম্প্রসারণে পাঁচ সমীক্ষা

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের রেল যোগাযোগ স্থাপনের জন্য উনিশ শতকের আগে থেকেই প্রচেষ্টা শুরু হয়। তৎকালীন বার্মা রেলওয়ে চট্টগ্রামের সঙ্গে মিয়ানমারের মধ্যে রেল রুট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ১০৪ বছরে এ রেললাইন স্থাপনে সমীক্ষা চালানো হয় পাঁচবার। ১৮৯০ সালে তারা একটি সার্ভেও করেন। এতে বার্মা থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত এ রেললাইন নির্মাণের উদ্যোগের কথা উল্লেখ রয়েছে। বার্মা রেলওয়ে ১৯০৮ থেকে ১৯০৯ পর্যন্ত এ ব্যাপারে কারিগরি সমীক্ষা চালায়। আবার ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত আরেক দফা সমীক্ষা হয়। ওই সমীক্ষায় চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে আকিয়াব (বার্মা) পর্যন্ত এক লাইন বিশিষ্ট রেললাইন স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়। ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অর্থায়নে করা হয়। ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অর্থায়নে পূর্ব বাংলা রেলওয়ে কৃষিজাত পণ্য, পর্যটন ও লবণ আনা-নেওয়ার গুরুত্ব বিবেচনায় দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের জন্য সার্ভে চালায়। সে সময় জাপান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সার্ভিস (জেআরটিএস) এ সার্ভে করেন। সবশেষে কানাডিয়ান কনসালট্যান্ট সংস্থা কানারেইল যে জরিপ চালায় সে সমীক্ষার অনুকরণেই তৈরি করা হয় এ প্রকল্পের সারপত্র। সূত্র: দৈনিক সমকাল।

উল্লেখ্য, ২০০১-০২ অর্থবছরে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু থেকে আরেকটি লাইন ঘুংধুম পর্যন্ত সম্প্রসারণের জন্য সমীক্ষা চালানো হয়। সাড়ে ৩ কোটি টাকার চুক্তিতে কানাডিয়ান কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান কানারেইল এ সমীক্ষা চালায়।

চট্টগ্রামসহ দেশবাসীর আবেদন, প্রকল্পটি যাতে যথা সময়ে অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায় সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

Advertisements
Loading...