১০০ বছর পূর্ণ করেছে বৃহত্তম রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ দেশের তথা এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম রেল সেতু হিসেবে খ্যাত পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রীজ ১০০ বছর পূর্ণ করেছে। নির্মাণের পর ওয়ারেন্টি ছিল ১০০ বছরের তা ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। এটি এখন শুধুই কালের স্বাক্ষী হিসেবে আমাদের দেশের গর্ব হয়ে আছে।
Hardinge Bridge
এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মার ওপর ১২৩ বছর আগে ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারত উপমহাদেশের রেল যোগাযোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পদ্মা নদীর ওপর রেল সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করে। বিশেষ করে ভারতের দার্জিলিং ও পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে যাতায়াতের সুবিধার্থে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া ও পাবনা জেলার সীমারেখায় পদ্মা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করে।

সেতু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে ও নামফলকে ১৯১২ সালে স্থাপিত দেখে জানা যায়, ২০১২ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ১০০ বছর পার করল। ওই সময় পদ্মা নদীর পূর্বতীর বর্তমান কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা গোলাপনগর সাঁড়াঘাট। অপর দিকে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার সাঁড়াঘাট ছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ নদীবন্দর। যেখানে দেশি-বিদেশি বড় বড় স্টিমার, লঞ্চ, বার্জ, মহাজনী নৌকা ইত্যাদি ভিড়তো সাঁড়াবন্দরের ১৬টি ঘাটে। এ অবস্থায় প্রমত্তা পদ্মাগর্ভে বহু লঞ্চ, স্টিমার ডুবে প্রাণহানি ও মালামালের ক্ষতি হয়। বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দার্জিলিং ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে দেশি-বিদেশি পর্যটক যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের সুবিধার্থে ভাতের কাঠিহার থেকে রেলপথ আমিনগাঁ আমনুরা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে অবিভক্ত ভারত সরকার তখন পদ্মা নদীর ওপর ব্রিজ তৈরির প্রস্তাব পেশ করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৯ সালের ব্রিজ তৈরির সেই প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে ১৯০২ সাল থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত চার বছর ধরে ব্যাপক স্টাডি করে ম্যাচ এফ জে স্প্র্‌িরং একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করে। দীর্ঘ জরিপের পর সাঁড়াঘাটের দক্ষিণে ব্রিজ নির্মাণের সম্ভাব্যতার তথ্য সরকারের কাছে সরবরাহ করে এবং ১৯০৭ সালে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মধ্যবর্তী পদ্মা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। ১৯০৮ সালে ব্রিজ নির্মাণের মঞ্জুরি লাভের পর ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট উইলিয়াম গেইলসকে ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ হিসেবে, ব্রিজের মূল নকশা প্রণয়নের জন্য স্যার এস এম বেনডেলেগকে ও প্রকল্প প্রণয়নের জন্য স্যার ফ্রান্সিস স্প্রিং এবং ঠিকাদার হিসেবে ব্রেইথ ওয়াইট অ্যান্ড কার্ককে দায়িত্ব দেয়া হয়।

এরপর শুরু হয় কূপ খনন, বসানো হয় ১৫টি স্প্যান যার প্রতিটি বিয়ারিং টু বিয়ারিং এর দৈর্ঘ্য ৩৪৫ ফুট দেড় ইঞ্চি এবং উচ্চতা ৫২ ফুট। প্রতিটি স্প্যানের ওজন ১ হাজার ২৫০ টন। রেল লাইনসহ ১ হাজার ৩০০ টন, এছাড়াও দু’পাশে ল্যান্ড স্প্যান রয়েছে যার দূরত্ব ৭৫ ফুট। ব্রিজটির মোট দৈর্ঘ্য ৫ হাজার ৮৯৪ ফুট (১ মাইলের কিছু বেশি), ব্রিজ নির্মাণে মোট ইটের গাঁথুনি ২ লাখ ৯৯ হাজার টন, ইস্পাত ৩০ লাখ টন, সাধারণ সিমেন্ট ১ লাখ ৭০ হাজার ড্রাম এবং কিলডসিমেন্ট (বিশেষ আঠাযুক্ত) লাগানো হয় ১২ লাখ ড্রাম। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১ হাজার গজ ভাটি থেকে ৬ কিলোমিটার উজান পর্যন্ত ১৬ কোটি ঘন ফুট মাটি ও ২ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার ঘনফুট পাথর ব্যবহার করে গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হয়। প্রায় ৩ কিলোমিটার প্রস্থ নদীর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা-পাবনার পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণ স্থলে দু’পাশে বাঁধ দিয়ে ১ দশমিক ৮১ কিলোমিটার নদী সংকুচিত করা হয় এবং হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণের সময় ব্রিজটির অ্যালাইনমেন্টে নদীর পানির বহন ক্ষমতা দাঁড়ায় ২৫ লাখ ঘনফুট। তথ্যসূত্র: দৈনিক আমার দেশ।

১৯১২ সালের আগে শ্রমিক সংখ্যা কম থাকলেও ১ ফেব্রুয়ারি ১৯১২ থেকে প্রকল্পটিতে কর্মীসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় তখন থেকে ২৪ হাজার ৪ শত শ্রমিক যারা দীর্ঘ ৫ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে ১৯১৪ সালের শেষের দিকে ব্রিজটির কাজ শেষ করে। ১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে ডাউন লাইন দিয়ে প্রথমে মালগাড়ি (ট্রেন) চালানো হয়। ২ মাস পর ৪ মার্চ ডবল লাইন দিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করে। সেই সময় ব্রিজটির ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচলের জন্য উদ্বোধন করেন, তৎকালীন ভাইস রয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। তার নামানুসার ব্রিজটির নামকরণ হয় লর্ড ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’।

তখনকার সময় ব্রিজটি তৈরিতে মোট ব্যয় হয় ৩ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪ টাকা। এর মধ্যে স্প্যানের জন্য ১ কোটি ৮০ লাখ ৬ হাজার ৭৯৬ টাকা, ল্যান্ড স্প্যানের জন্য ৫ লাখ ১৯ হাজার ৮৪৯ টাকা, নদীর গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ৯৪ লাখ ৮ হাজার ৩৪৬ টাকা ও দুই পাশের রেল লাইনের জন্য ৭১ লাখ ৫৫ হাজার ১৭৩ টাকা। টাকার মান হিসাব করতে গেলে গ্রামের কয়েকজন দর্শনার্থীর উক্তি শুনে বোঝা যায় ‘ব্রিজটির বড় বড় লোহার গার্ডার দেখে মন্তব্য করেন পাঁচশ’ টাকার নোহাই লেগেছে!’ প্রবাদ আছে ১ টাকায় ১৬ মণ চাল পাওয়া যেত সে সময়।

হার্ডিঞ্জ ব্রীজ কেনো বৈচিত্রময়

বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ সরকারের নির্মিত ব্রিজটির খ্যাতি বিশাল পরিচয় বহন করে। বর্তমান জগতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের চেয়েও লম্বা ব্রিজ ও সেতু অনেক আছে। কিন্তু কিছু কিছু কারণে এ ব্রিজটি অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে বিখ্যাত। প্রথম কারণ হচ্ছে এ ব্রিজের ভিত গভীরতম পানির সর্বনিম্ন সীমা থেকে ১৬০ ফুট বা ১৯২ এমএসএল মার্টির নিচে। এর মধ্যে ১৫ নম্বর স্তম্ভের কুয়া স্থাপিত হয়েছে পানি নিম্নসীমা থেকে ১৫৯ দশমিক ৬০ ফুট নিচে এবং সর্বোচ্চ সীমা থেকে ১৯০ দশমিক ৬০ ফুট অর্থাৎ সমুদ্রের গড় উচ্চতা থেকে ১৪০ ফুট নিচে। সে সময় পৃথিবীতে এ ধরনের ভিত্তির মধ্যে এটাই ছিল গভীরতম। বাদবাকি ১৪টি কুয়া বসানো হয়েছে ১৫০ ফুট মাটির নিচে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এ ব্রিজের জন্য রিভার ট্রেনিং ব্যবস্থা আছে তাও পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। ব্রিজটি অপূর্ব সুন্দর ও আর্কষণীয় হওয়াতে ব্রিটিশ ইন চিফ ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট উইলিয়াম গেইলসকে সাফল্যের পুরস্কারস্বরূপ স্যার উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

একটি গার্ডার ভাঙার কাহিনী

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকহানাদার বাহিনীকে পরাস্থ এবং যোগাযোগশূন্য করার জন্য ব্রিজটির ওপর বোমা বর্ষণ করা হয়। (শোনা যায় ১৯৭১ Harding-2 (1971)সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাস্থ করতে মিত্র বাহিনী অর্থাৎ ভারতীয় বাহিনীই বোমা মেরে ব্রীজটি ভেঙে দিয়েছিল। যে কারণে তার খুব কম সময়ের মধ্যেই দেশ স্বাধীন হয়। দেশ স্বাধীনে সেদিনের সেই ব্রীজ ভাঙার সিদ্ধান্তও ছিল একটি সঠিক সিদ্ধান্ত বলে অনেকেই মনে করেন) এর ফলে পিলারের ওপর থেকে ১২নং স্প্যান (গার্ডার)টির এক প্রান্ত নদীর মাঝে পড়ে যায়। ৯নং স্প্যানটির নিচের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাক বাহিনীকে দক্ষিণ বঙ্গে প্রবেশ না করতে দেয়ার কৌশলগত কারণে পিলারের উপরে এবং গার্ডারের নিচে ডিনামাইন্ড বসিয়ে ওপর থেকে বোমা মেরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আর যে বোমা দ্বারা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ক্ষতিসাধন করা হয় তা এখনও পাকশীর বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজারের কার্যালয়ের সামনে সংরক্ষিত রয়েছে।

পরে ব্রিজটি মেরামত করে ভারতের পূর্ব রেলওয়ে শ্রী এইচকে ব্যানার্জি, চিফ ইঞ্জিনিয়ার শ্রী আরকে এসকে সিংহ রায়, ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার, শ্রী পিসিজি মাঝি, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। এছাড়া বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে ছিলেন রেলওয়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ার আমজাদ আলী, ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ মো. ইমাম উদ্দিন আহমেদ, ডিভিশনাল সুপার এম রহমান প্রমুখ। মেরামত হওয়া গার্ডারটি অন্য গার্ডারগুলো থেকে একটু ভীন্ন (চীকন)।

ব্রিজটি ১৯১২ সালে স্থাপন অনুযায়ী বর্তমান ২০১২ সালে ১০০ বছর পূর্ণ করল। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ১০০ বছরের গ্যারান্টি দিয়েছিল যে, এ সময়ের মধ্যে ব্রিজটির কোনো প্রকার পরিবর্তন ঘটবে না সত্যিই তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বর্তমানে ১০০ বছর পার হলো ব্রিজটির বয়স। এখন এই ঐতিহ্যবাহী রেল ব্রীজটি দেশের জন্য শুধুই কালের স্বাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে। এতো বড় ব্যয়বহুল এবং এতো মজবুত ব্রীজ তৈরি এখন আমাদের কাছে শুধুই দুঃস্বপ্নের মতো।

Advertisements
Loading...