জনগণ এবং হরতাল

বদরুদ্দীন উমর ॥ বাংলাদেশে কা-জ্ঞানহীন হরতাল প্রায়ই দেখা যায়। বিশেষত এটা দেখা যায় প্রধান বিরোধী দলের ক্ষেত্রে। এখনকার প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার এ ধরনের হরতাল করেছে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগও একইভাবে হরতাল ডেকে এসেছে। প্রায় সব ক্ষেত্রের মতো এ ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বলে কোনো কথা নেই।
HORTAL-9
কথা আছে সরকারি ক্ষমতায় বসে থাকা দল এবং সরকারি ক্ষমতার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দল। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, তার আচরণ ও কথাবার্তা একই প্রকার। আবার বিরোধী দলে যেই থাকুক, তারও কারবার একই রকম। এর থেকে বোঝা যায় শ্রেণীগত ও স্বার্থগতভাবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিক দিয়ে এ দুই দল পরস্পরের কত নিকট। বলা যেতে পারে বাইরের প্রতিযোগিতা, রেষারেষি ও শত্রুতা সত্ত্বেও এরা পরস্পরের পরমাত্মীয়।

হরতাল জনগণের ও যে কোনো রাজনৈতিক দলের একটা গণতান্ত্রিক অধিকার। কাজেই হরতাল হলেই সেটা নিন্দনীয় বা অসমর্থনযোগ্য নয়। হরতাল, ধর্মঘট ইত্যাদি রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দাবি আদায়ের আন্দোলনে একটা স্বীকৃত হাতিয়ার। এ কারণে কোনো সরকার হরতাল ও ধর্মঘট নিষিদ্ধ করলে সেটা এক চরম অগণতান্ত্রিক কাজ। কিন্তু অধিকার যেমন প্রয়োজন, অধিকারের ব্যবহারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতাও তেমনি প্রয়োজন। কোনো গণতান্ত্রিক অধিকারই হরণ করা যেমন সমর্থন করা যায় না, তেমনি কোনো অধিকারেরই অপব্যবহার সমর্থনযোগ্য নয়। বাংলাদেশে হরতাল প্রসঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আছে। পারস্পরিক গালিগালাজ এই চিন্তাভাবনার কোনো বিকল্প নয়। কিন্তু সেটা না হলেও এখন হরতাল বিষয়ে যুক্তিসম্মত আলোচনার পরিবর্তে পারস্পরিক গালিগালাজই যে কোনো হরতালের সময়ই এক প্রচলিত ব্যাপার।

গত ৬ জানুয়ারি বিএনপি বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে এবং এ নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে এক হরতাল আহ্‌বান করেছিল। দেশে ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি জনগণের জীবনে তো বটেই, অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও সংকট বৃদ্ধি করে। জ্বালানি তেল এমন এক প্রয়োজনীয় জিনিস যার মূল্যবৃদ্ধি কৃষি, শিল্পজাত পণ্য থেকে নিয়ে সেবা খাত পর্যন্ত প্রত্যেক ক্ষেত্রে ঘটায়। এ নিয়ে বর্তমান সরকার নিজের চার বছরের মধ্যে চারবার তেলের মূল্যবৃদ্ধি করল। কাজেই দফায় দফায় এই মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে দেশে ব্যাপকভাবে প্রতিবাদ হবে এটিই স্বাভাবিক। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রতিবাদের এক প্রবল হাতিয়ার হচ্ছে হরতাল। কাজেই সরকার কর্তৃক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিএনপি যে হরতাল ৬ জানুয়ারি আহ্‌বান করেছে সেটা স্বাভাবিক। অসুবিধা সত্ত্বেও জনগণের মধ্যে এই হরতালের পক্ষে সমর্থনও ছিল।

কিন্তু এখানেই হরতাল সম্পর্কিত কথার শেষ নয়। কথা আরও আছে। আগেই বলা হয়েছে যে, হরতাল রাজনৈতিক আন্দোলনের এক গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। কিন্তু হরতাল আহ্‌বান ও তা অনুষ্ঠানের গণতান্ত্রিক নিয়মকানুন আছে। বাংলাদেশে একদিকে যেমন অনেক সময় তুচ্ছ ও সামান্য কারণে হরতাল ডেকে হরতালের রাজনৈতিক ধার ভোঁতা করা হয়, তেমনি অন্যদিকে যে কোনো হরতাল কার্যকর করার জন্য যেভাবে বল প্রয়োগ করা হয়, সেটা কোনো প্রশংসাযোগ্য কাজ নয়। এই নিন্দনীয় কাজটিই হরতালের সময় এখন বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াতের দ্বারা নিয়মিতভাবেই অর্থাৎ তাদের ডাকা প্রত্যেকটি হরতালের সময়ই ঘটতে দেখা যাচ্ছে।

হরতাল কোনো নতুন ব্যাপার নয়। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলেও হরতাল হতো। হরতালের সময় হরতাল আহ্‌বানকারীরা দোকানপাট ও গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখার জন্য পিকেটিং করত। কিন্তু সেই পিকেটিংয়ের সময় দোকান ভাংচুর করা, গাড়িতে আগুন দেওয়া, বাসযাত্রীদের গাড়ি চড়ার জন্য আক্রমণের কোনো ব্যাপার তখন একেবারেই ছিল না। গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা হিসেবে হরতালকে যেমন ব্যবহার করা হতো, তেমনি হরতাল সফল করার ক্ষেত্রেও কাজ করা হতো গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মান্য করে। কারও ওপর জোর-জুলুমের কোনো প্রশ্ন সেখানে থাকত না। সরকার যদি কখনও হরতালকারীদের ওপর আক্রমণ করত, তাহলে পুলিশের সঙ্গে হরতালকারীদের সংঘর্ষ হতো। কিন্তু হরতাল সফল করতে গিয়ে জনগণের ওপর, গাড়ি চলাচল ও দোকানপাট বন্ধ রাস্তার জন্য কোনো জোর-জুলুম, নির্যাতন হতো না। তখনকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে এ ধরনের জোর-জুলুমের কোনো স্থান ছিল না।

এদিক দিয়ে পরিস্থিতির এখন দারুণ অবনতি হয়েছে। হরতাল আহ্‌বান করে জনসমর্থন সংগঠিত করার গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পরিবর্তে এখন জনগণকে ভয় দেখিয়ে হরতাল সফল করার প্রবণতা বৃদ্ধিই শুধু হয়নি, হরতালের আগের দিনই গাড়ি ও লোকজনের ওপর আক্রমণ শুরু হয়ে যায়। যেদিন হরতাল ডাকা হয় তার আগের দিন এ কাজ যেভাবে করা হয় তার মানে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো জনগণের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি করে, চারদিকে ত্রাসের সঞ্চার করে হরতাল সফল করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তুচ্ছ কারণে হরতাল দেওয়ার ফলে হরতাল সফল করার জন্য এ কাজ করতে হয়। হরতালের পক্ষে জনগণের প্রয়োজনীয় সমর্থন না থাকার সম্ভাবনা হিসাব করেই এভাবে ত্রাস সৃষ্টির প্রয়োজন হরতাল আহ্‌বানকারীদের মধ্যে দেখা দেয়।

সরকারের কোনো নীতি বা কাজের প্রতিবাদে হরতাল আহ্‌বান করলে সরকারও বসে থাকে না। তারাও এখন আগে থেকেই প্রবলভাবে ধরপাকড় ও মারপিটের মাধ্যমে হরতাল বন্ধের জন্য রাস্তায় নামে। জনগণের ওপর তাদেরও কোনো আস্থা নেই। কোনো ধরনের বিরোধিতা সহ্য করতে তারা প্রস্তুত নয়। যে কোনো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ দমন করতে শক্তিপ্রয়োগে তাদের কোনো দ্বিধা নেই। কাজেই হরতাল চলতে থাকার সময়ে তারা হরতালকারীদের সশস্ত্রভাবে আক্রমণ করে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরাও হাতের কাছে যা থাকে তাই নিয়ে বিরোধীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের এই আক্রমণের পাল্টা হিসেবেও হরতালকারীরা শুধু পুলিশের বিরুদ্ধে নয়, এলোপাতাড়িভাবে জনগণের বিভিন্ন অংশের ওপরও বিক্ষিপ্তভাবে আক্রমণ করে। বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে অবস্থা তাতে এদিক দিয়ে অবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা সামান্য।

৬ জানুয়ারি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির জন্য যে হরতাল বিএনপি ডেকেছিল সেটা অনুমোদনযোগ্য। তেলের মূল্যবৃদ্ধি হলে কী হয়, এ নিয়ে জনজীবনে এবং অর্থনীতি ক্ষেত্রে কী ঘটে এসব বিষয় সাধারণভাবে জানা। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার কিছু নেই। এই বৃদ্ধির ফলে জনগণের খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, যাতায়াত ইত্যাদির ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। শিল্পের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ কারণে এই হরতালের পক্ষে জনসমর্থন আগের হরতালগুলোর থেকে বেশি ছিল। পিকেটিংয়ের প্রয়োজনও বেশি ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও পিকেটিংয়ের নামে যেভাবে কিছু গাড়ি পোড়ানো ও মারপিটের ঘটনা ঘটেছে তা অনুমোদনযোগ্য নয়। অন্যদিকে পুলিশও তাদের রুটিন কাজ হিসেবে রাস্তায় নিরীহ লোকদের যেভাবে নির্মমভাবে লাটিপেটা করেছে তার মধ্যে তাদের ফ্যাসিস্ট চরিত্রের প্রতিফলনই তারা ঘটিয়েছে।
# বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
(সমকাল এর এই লেখাটি আমরা প্রচার করলাম। কারণ জনগণকে নিয়েই দেশ, সেই দেশ ও দেশের জনগণ যদি বার বার নিষ্পেশিত হয় তাহলে বলার কিছুই থাকে না। বিবেকের সেই তাড়না থেকেই লেখাটি জনগণের সামনে তুলে ধরা হলো)।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...