প্রজন্ম চত্ত্বর ॥ ওখানে গেলে ফিরতে ইচ্ছে হয় না

এম. এইচ. সোহেল ॥ শাহবাগের প্রজন্ম চত্ত্বরে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল যেনো জোয়ারের মতো। ওখানে গেলে আর ফিরতে মন চাই না। প্রজন্ম চত্ত্বরে মানুষের ঢল দেখলে মনে হয় এখনও এদেশে অনেক দেশপ্রেমিক আছেন- যারা দেশের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত।
Shahabag-007
৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এক রায়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করলে ফেইস বুকের মাত্র ক’জন ব্লগাররা শাহবাগ চত্ত্বরে সমবেত হয়। এরপর থেকে সেখানে হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হতে থাকে এবং এক সময় লক্ষ লক্ষ জনতা সেখানে দিনরাত কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে সোচ্চার আন্দোলন শুরু করে। যে আন্দোলনে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ব বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশে মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্বতা ঘোষণা করা হয়।

আজ এই আন্দোলনের মাত্রা শুধু শাহবাগে সীমাবদ্ধ নেই। এই আন্দোলন এখন সারাদেশ জুড়ে শুরু হয়েছে। নতুন প্রজন্মরা মনে করে, ৪২ বছর আগে যারা দেশের বিরুদ্ধে কাজ করেছে সেই রাজাকারদের বিচারের রায় একমাত্র ফাঁসি। নতুন প্রজন্ম আরও মনে করে, যারা এদেশের স্বাধীনতার সময় এদেশের বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখেছিল আজ তারাই আবার দেশের সম্পদ নষ্ট করছে। আজ তারাই এদেশের বিচার ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যা খুশি তাই করতে চাচ্ছে। এটা কখনও হতে পারে না। ১৯৭১ সালে লক্ষ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে, লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছিল। আজ কতিপয় জামায়াত-শিবিরের কারণে এদেশের স্বাধীনতা ভুলুণ্ঠিত হতে পারে না। আর তাই আজকের প্রজন্ম এদেশকে রাজাজারমুক্ত দেশ হিসেবে দেখতে চাই।
Shahabag-008
আজ এই দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে একাত্বতা ঘোষণা করেছে। আইন সংশোধনের মাধ্যমে বিচার ত্বরান্বিত ও সঠিক বিচারের ব্যবস্থা নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আজ শাহবাগ চত্ত্বর ‘প্রজন্ম চত্ত্বর’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন প্রজন্মরা এদেশের স্বাধীনতা যাতে ভুলুণ্ঠিত না হয়, সেজন শপথ গ্রহণ করেছেন। তাদের সঙ্গে এদেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ সকল গণমাধ্যম আজ একাত্ম হয়ে কাজ করছে। দেশের বেসরকারি চ্যানেলগুলো প্রজন্ম চত্ত্বর থেকে দিনরাত সরাসরি খবরের মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে। আজ এদেশের সকল মানুষ উজ্জ্বীবিত হয়েছে তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলনে। সেখানে শিশু, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র-ছাত্রীরা স্লোগানে স্লোগানে পুরো চত্ত্বর এলাকা মুখরিত করে রেখেছে। ওখানে বাস্তবে গেলে দেখা যায়, কি উদ্বীপ্ত সে চত্ত্বর। সেও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবি করে স্লোগান দিচ্ছেন, কেওবা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি করে স্লোগান দিচ্ছেন আবার কেও কবিতা আবৃত্তি করে এলাকাটি গরম করে রেখেছেন। ওখানে গেলে মনে হয় সেই একাত্তরের রণাঙ্গনে আছি। কবি শামসুর রাহমান সেই কবিতার ‘স্বাধীনতা তুমি পতাকা স্লোভিত ঝাঁঝাঁলো মিছিল…’ কথা মনে পড়ে যায়। আজ হয়তো কবি বেঁচে থাকলে না যানি কত কবিতায় রচনা করতেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বেঁচে থাকলে আজ হয়তো আরেক বিদ্রোহী কবিতার আবির্ভাব ঘটাতেন।

এমন অনেক কথায় মনে পড়ে যায় প্রজন্ম চত্ত্বরে গেলে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অনেক ছোট ছিলাম। কিন্তু অনেক কিছুই আমার মনে আছে। ছোট থাকার কারণে সেদিন স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিতে পারিনি। আজ ২০১৩ সালের নতুন প্রজন্ম সেই সুযোগ করে দিয়েছে। তাইতো প্রজন্ম চত্ত্বরে গেলে সত্যিই বার বার মনে হয় “এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়”, সত্যিই ওখানে গেলে আর ফিরতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় ওদের সঙ্গে দিন-রাত্রি পার করি। স্লোগানে স্লোগানে ভরে তুলি পুরো জাতিকে। জাতিকে উদ্বীপ্ত করতে নতুন প্রজন্মরা আজ সত্যিই আর এক ইতিহাস করতে যাচ্ছেন। আর তাই সেই ইতিহাসের স্বাক্ষী আমিও হতে চাই। এমন শান্তিপূর্ণ সহবস্থান শুধু এ জাতি নয়, বিশ্ববাসীকেও অবাক করেছে। বাঙালিরা লড়তে যানে এবং বীরের মতো সংগ্রাম করে তার অধিকার আদায় করতে যেমন যানে। ঠিক তেমনি অধিকার আদায় করতে রাস্তায় নেমে পড়তেও দ্বিধা করে না তা বিশ্ববাসীকে বাঙালিরা দেখিয়েছে।

Advertisements
Loading...