আলোচনা-সমালোচনা : জামায়াত নিষিদ্ধে পাঁচ অপশন

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার জন্য যুতসই উপায় খুঁজছে সরকার। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার উপায় হিসেবে সরকারের সামনে মোট পাঁচটি অপশন রয়েছে। এগুলোর যেকোনো একটি উপায়েই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার জন্য সরকার পরিকল্পনা করেছে। খবর দৈনিক আমাদের সময়।
Shahabag-014
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার জন্য কী কী উপায় আছে তা ইতোমধ্যে বের করা হয়েছে। এ পর্যন্ত বের হয়ে আসা পাঁচটি অপশনের মধ্যে যেটি অনুসরণ করলে ভবিষ্যতে সমস্যা হবে না সেই অপশন ধরেই কাজ করা হবে।

গোলাম আজম ও নিজামীর মামলার রায়ের অপেক্ষা

জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার জন্য প্রথম অপশন হিসেবে সরকারের সামনে রয়েছে গোলাম আজম ও নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মামলার রায়। সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস (সংশোধন) আইন ২০১৩-তে নতুন করে ব্যক্তির পাশাপাশি দল ও সংগঠনের বিচার করার বিধান রাখা হয়েছে। ওই বিধান অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকালে যেসব সংঘটনের নেতাদের বিশেষ করে দলের প্রধানের ও সংগঠকের বিচার করছেন সেই অপরাধীর বিচারের সময়ে আদালত চাইলে ওই ব্যক্তির রায়ের সঙ্গে দল ও সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। এই জন্য ওই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে পারেন।

এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, এখন নতুন আইনবলে ট্রাইব্যুনাল যদি জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম কিংবা বর্তমান আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের রায়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা জামায়াত ইসলামী সংগঠনকে দিয়েও এই ধরনের অপরাধ সংগঠিত করেছেন এই অভিযোগ এনে রায় দিতে পারেন। আমরা অপেক্ষা করব এই দুজনের বিচারের রায় হওয়া পর্যন্ত, আদালত কী ধরনের রায় দেন। এই দুজনের একজনের রায়ে বিচারক জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে দিলে আমাদেরকে কোনো কিছুই করতে হবে না। ওই রায় হওয়ার পর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে এবং আপিলেও একই রায় বহাল থাকলে তা কার্যকর হয়ে যাবে। তবে এটা একটু সময় লাগবে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে হলে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন জামায়াত তাদের কোনো ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে না।

গোলাম আজমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলে অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট এম কে রহমান বলেন, গোলাম আযমের মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হলেই এই মামলা রায়ের জন্য নির্ধারিত থাকবে। এই মামলার কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নিজামীর মামলা এখনও বাকি আছে। যুক্তিতর্ক পর্যায়ে না এগোনো পর্যন্ত মামলার অগ্রগতি বিশেষ হয় না।

রিট নিষ্পত্তি

দ্বিতীয় অপশন হিসেবে সরকারের সামনে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী নিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট। ওই রিটের শুনানি হতে পারে সহসাই। ওই রিটের শুনানিতে আদালত যদি জামায়াতের নিষিদ্ধকরণের রায় দেয় তাহলে সরকারের জন্য সবচেয়ে কম সময়ে ও সহজেই এটি হবে। এই ব্যাপারে আইনমন্ত্রী বলেন, হাইকোর্টে শুনানির জন্য অপেক্ষমান রিটটি শুনানি হলে সেখানে এটি নিষ্পত্তি হবে। আর নিষ্পত্তি হয়ে গেলে আদালত যদি তাদেরকে সকল কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে তাহলে এই জন্য সরকারকে কিছুই করতে হবে না। কেবল রায়টি কার্যকর করলেই হবে। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে জামায়াত নিষিদ্ধ হলে এটা হবে দ্রুততম সময়ে ও ঝামেলা ছাড়াই।

তিনি বলেন, আদালতের মাধ্যমে জামায়াত নিষিদ্ধ হলে পরবর্তীতে কোনো সমস্যা থাকবে না। কিন্তু সংসদে বিল এনে নিষিদ্ধ করলে পরে আবার বিল সংশোধন করে তাদের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। এই কারণে আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টি সরকার প্রাধান্য দিচ্ছে।

সংসদে বিল এনে জামায়াতকে নিষিদ্ধকরণ বিল পাস

তৃতীয় অপশন হচ্ছে বিল পাস করে নিষিদ্ধকরণ। সরকারের নেতাদের বেশ কয়েকজন বলেছেন সংসদে বিল এনে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হবে। ভবিষ্যতে জামায়াত যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে না পারে সেই ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতোমধ্যে বিল ওঠানোর জন্য প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও শহীদ মিনারে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন সরকারি দলের দুই নেতা। এই ব্যাপারে আইনমন্ত্রী বলেন, সংসদে বিল এনে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা যায়। তবে এখনও এই ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। আর সংসদে বিল তোলা হবে এমন কোনো প্রক্রিয়াও আমরা এখনও শুরু করিনি। তিনি বলেন, সংসদে বিল এনে তাদেরকে নিষিদ্ধ করতে হলে এটা আবার মন্ত্রিপরিষদে পাস হতে হবে। সংসদে বিল পাস করিয়ে নিষিদ্ধ করলেও পরে আবার দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের মাধ্যমে বিল পাস করে তাদেরকে আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করার সুযোগ দেয়া হলে তখন আর কোনো লাভ হবে না।

নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নিষিদ্ধকরণ

চতুর্থ অপশন- জামায়াতকে দল হিসেবে নিষিদ্ধকরণ এবং তারা যেন কোনো ধরনের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারবে। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিধান রেখে কোনো রাজনৈতিক দল কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। সংবিধানের সঙ্গে তাদের গঠনতন্ত্রে যে সব বিরোধিতা ও সংঘর্ষ রয়েছে ওই সব সাংঘর্ষিক বিষয়কে উল্লেখ করে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন কয়েকদফা জামায়াতকে নোটিস করেছে। জামায়াত এর পরে তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধন করেছে। এগুলো সংশোধন করার পরও এখনও সন্তুষ্ট নয় নির্বাচন কমিশন।

আইনমন্ত্রী বলেন, জামায়াতে ইসলামী যতবারই গঠনতন্ত্র সংশোধন করুক না কেন কোনো লাভ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না নির্বাচন কমিশন তাদের গঠনতন্ত্রের সংশোধনীতে সন্তুষ্ট না হবে। তারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়টি বিবেচনা করে জামায়তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। তাদের নিবন্ধন বাতিল করতে পারে। এটা করা হলে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। সেই হিসাবে নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারবে। তিনি বলেন, রিটের নিষ্পত্তির মাধ্যমে কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মধ্য দিয়ে যদি জামায়াত নিষিদ্ধ হয় তাহলে সবচেয়ে ভালো হয়। কারণ সর্বোচ্চ আদালতের রায়ই হবে সবচেয়ে বড়।

সন্ত্রাস বিরোধী আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ

সরকারের সামনে পাঁচ নম্বর অপশন হিসেবে রয়েছে- সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯-এর মাধ্যমে সরকার জামায়াত নিষিদ্ধ করতে পারে। জামায়াতের বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও পতকা পোড়ানো, শহীদ মিনারে হামলা, পুলিশ বাহিনীর উপর হামলাসহ তারা যেসব কর্মকাণ্ড করছে ও এতে সহায়তা দিচ্ছে এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে। বিশেষ করে ২২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার তাদের সহায়তায় সারাদেশে যেসব কর্মকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। সন্ত্রাস দমন আইন অনুযায়ী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে এমন সংগঠন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে না। তা ছাড়াও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করার জন্য তাদের অঙ্গসংগঠন শিবিরকে অর্থ সহায়তা প্রদানসহ এই ধরনের কাজে লিপ্ত অন্য সব দলের সহায়তা দেয়ার অভিযোগেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকার চাইলে তা করতে পারে।

এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী বলেন, এই আইনটিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এটিও একটি অপশন বিবেচনা করা হচ্ছে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

জামায়াতে ইসলামীকেই কেবল নিষিদ্ধ করা হবে, না কি অন্য কোনো ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী বলেন, এটা নির্বাচন কমিশন দেখবে। তারা দেখবে কোন কোন দল নির্বাচনে অংশ নেবে। নির্বাচনে অংশ নেয়া সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবে। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কর্মকাণ্ড ও দল কোনোভাবেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। তবে সামপ্রতিক সময় জামায়াত নিষিদ্ধে প্রশ্নে ক্ষমতাসীন দলীয় এক সাংসদ সংসদে বলেছেন, ‘ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নয়, আমরা শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ করবো।’

কেও কেও মনে করছেন, সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে এই সংগঠনটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর আন্ডার গ্রাউন্ডে যেতে পারে এবং জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে পারে। এতে দেশের পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারের মধ্যে কী ধরনের আশঙ্কা রয়েছে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, এটা যারা বলছেন তারাই বলতে পারবেন। তবে তাদেরকে নিষিদ্ধ করলে কী ধরনের কর্মকাণ্ড করতে পারেন এর চেয়ে এখন বিবেচনা করা হচ্ছে- জামায়ত নিষিদ্ধকরণের বিষয়টি। পরে কী হবে, তারা কী করবে- এটা নিয়ে এখন আমি বলতে পারব না। তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করলে সেই ভাবে ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন।

Advertisements
Loading...